এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ডাইনোসর নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করা এই বিশালাকার প্রাণীদের জীবাশ্ম যত বেশি আবিষ্কৃত হচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। কখনও বিশাল দেহের তৃণভোজী ডাইনোসর, কখনও ভয়ংকর শিকারি—প্রতিটি আবিষ্কারই বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর নতুন অধ্যায়।
এবার বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে এমন এক ডাইনোসর, যার চেহারা এবং শারীরিক গঠন অন্য অনেক পরিচিত ডাইনোসরের তুলনায় বেশ অস্বাভাবিক। বিশেষ করে এর লম্বা নখ, ছোট ছোট দাঁত এবং শরীরের গঠনের কারণে প্রাণীটি গবেষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। জীবাশ্মটি প্রায় সম্পূর্ণ অবস্থায় উদ্ধার হওয়ায় বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরটির চেহারা ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন।
গবেষকদের হাতে আসা জীবাশ্মটি পশ্চিম চিনের একটি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এই নতুন ডাইনোসরের নাম দিয়েছেন কেরাসরাস চাঙ্গলিয়েনসিস। গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ১২ কোটি বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগে এই ধরনের ডাইনোসর পৃথিবীতে বিচরণ করত।
প্রাগৈতিহাসিক সেই সময়ে পৃথিবীর পরিবেশ আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। বিভিন্ন ধরনের ডাইনোসর স্থলভাগে আধিপত্য বিস্তার করত। সেই বৈচিত্র্যময় ডাইনোসর জগতেরই একটি নতুন সদস্যের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে এই জীবাশ্মে।
নতুন ডাইনোসরটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো তার সামনের পায়ের আঙুল। জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, এর তিনটি আঙুলে ছিল তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত লম্বা নখ। এই নখই ডাইনোসরটির শারীরিক গঠনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
ডাইনোসরের নখ শুধু দেখতে কেমন ছিল, সেটিই গবেষকদের আগ্রহের বিষয় নয়। এর নখ কী কাজে ব্যবহার হতো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জীবাশ্মের হাড়ের গঠন, আঙুলের অবস্থান এবং নখের আকৃতি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রাণীটির জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে শুধু জীবাশ্মের ওপর ভিত্তি করে কোনো প্রাণী ঠিক কীভাবে তার নখ ব্যবহার করত, তা সবসময় নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। নখ শিকার ধরা, আত্মরক্ষা, খাবার সংগ্রহ কিংবা অন্য কোনো আচরণে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। তাই এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এই নতুন ডাইনোসরকে ঘিরে আরেকটি চমক হলো তার সামগ্রিক শারীরিক গঠন। প্রাথমিক বর্ণনায় প্রাণীটির চেহারাকে লোমশ শূকরের মতো দেখতে বলে তুলনা করা হয়েছে। অবশ্য এটি সরাসরি কোনো আধুনিক প্রাণীর সঙ্গে শারীরিকভাবে একই ছিল, এমনটা বোঝায় না। বরং জীবাশ্ম থেকে পাওয়া দেহের আকৃতি বোঝাতে এমন তুলনা ব্যবহার করা হয়েছে।
ডাইনোসর মানেই বিশাল মুখ, ধারালো দাঁত এবং ভয়ংকর শিকারি—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু ডাইনোসরের পৃথিবী ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন প্রজাতির দেহের আকার, খাদ্যাভ্যাস, দাঁত, পা ও নখের গঠন ছিল একে অন্যের থেকে অনেকটাই আলাদা।
এই নতুন আবিষ্কার সেই বৈচিত্র্যের কথাই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
নতুন আবিষ্কৃত ডাইনোসরটির দাঁতও গবেষকদের নজর কেড়েছে। প্রাণীটির দাঁত ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট এবং মুখের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে বসানো ছিল।
দাঁতের আকার ও গঠন দেখে কোনো ডাইনোসরের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন জীবাশ্মবিদেরা। তবে একটি প্রাণী কী খেত, তা নিশ্চিতভাবে জানতে শুধু দাঁতের ওপর নির্ভর করা হয় না। চোয়ালের গঠন, দাঁতের ক্ষয়ের ধরন, দেহের আকৃতি এবং একই সময়ের পরিবেশ সম্পর্কেও তথ্য প্রয়োজন হয়।
এই কারণেই প্রায় সম্পূর্ণ জীবাশ্ম আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে পাওয়া গেলে গবেষকেরা প্রাণীটির গঠন সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে পারেন।
উদ্ধার হওয়া জীবাশ্মের আকার বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন, ডাইনোসরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১১ ফুট ৮ ইঞ্চি। অর্থাৎ এটি প্রায় ১২ ফুট লম্বা একটি প্রাণী ছিল।
আজকের সময়ের তুলনায় এই আকার বড় মনে হলেও ডাইনোসরের জগতে এটি খুব অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য নয়। কারণ পৃথিবীতে এমন বহু ডাইনোসর ছিল যাদের দেহের দৈর্ঘ্য কয়েক মিটার থেকে শুরু করে কয়েক দশক মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তবে এই ডাইনোসরের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু আকার নয়। এর দেহের গঠন, লম্বা নখ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহের কারণ হয়েছে।
ডাইনোসর নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জীবাশ্ম অনেক সময় অসম্পূর্ণ অবস্থায় পাওয়া যায়। কোনো ক্ষেত্রে শুধু দাঁত, কোথাও একটি হাড়, আবার কোথাও শরীরের নির্দিষ্ট অংশ পাওয়া যায়। ফলে সম্পূর্ণ প্রাণীটির চেহারা কেমন ছিল, তা অনুমান করতে বিজ্ঞানীদের নানা তথ্য একত্র করতে হয়।
এই আবিষ্কারের ক্ষেত্রে জীবাশ্মটি তুলনামূলকভাবে প্রায় পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় গবেষকদের জন্য বিষয়টি সহজ হয়েছে। দেহের বিভিন্ন অঙ্গের গঠন একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে প্রাণীটির আকার, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে।
এ ধরনের জীবাশ্ম ভবিষ্যতের গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একটি নতুন প্রজাতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি সেই সময়ের পরিবেশ, প্রাণীদের বৈচিত্র্য এবং বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন সূত্র পাওয়া সম্ভব হয়।
পৃথিবীতে ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল কয়েক কোটি বছর ধরে। এই দীর্ঘ সময়ে তাদের শরীর ও জীবনযাপনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। কোনো প্রজাতি ছিল বিশালাকার তৃণভোজী, কোনোটি ছিল দক্ষ শিকারি, আবার কোনো কোনো প্রজাতির শরীরে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে যা আধুনিক প্রাণীদের সঙ্গে তুলনা করার মতো।
নতুন এই ডাইনোসরের আবিষ্কারও সেই বিবর্তনীয় বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। এর লম্বা নখ, ছোট দাঁত এবং অস্বাভাবিক দেহগঠন বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিশেষ করে এই প্রাণী কী খেত, কীভাবে চলাফেরা করত এবং তার লম্বা নখের প্রধান ব্যবহার কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কার মানেই শুধু একটি নতুন প্রাণীর সন্ধান নয়। এর মাধ্যমে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর পরিবেশ এবং প্রাণীদের জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
পশ্চিম চিনে পাওয়া এই জীবাশ্ম তাই শুধু একটি অদ্ভুত দেখতে ডাইনোসরের গল্প নয়। এটি প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীতে কত বিচিত্র ধরনের প্রাণী বাস করত, তারও একটি নতুন উদাহরণ।
তবে নতুন প্রজাতি নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান থাকতে পারে। জীবাশ্মের বৈশিষ্ট্য, তার বয়স এবং প্রাণীটির সম্ভাব্য জীবনযাপন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করবেন, ততই পরিষ্কার হবে এই অদ্ভুত ডাইনোসরের আসল পরিচয়।
প্রায় সাড়ে ১২ কোটি বছর আগের পৃথিবীতে বিচরণ করা প্রায় ১২ ফুট লম্বা এই প্রাণী আজ আর নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া জীবাশ্ম কোটি কোটি বছর পরেও বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিয়েছে এক বিস্ময়কর অধ্যায়। আর সেই কারণেই ডাইনোসরের নতুন কোনো জীবাশ্ম আবিষ্কার এখনও মানুষের কৌতূহল জাগায়—কারণ প্রতিটি হাড়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে পৃথিবীর সুদূর অতীতের আরেকটি অজানা গল্প।



