এনবি সংবাদ, অনলাইন : কোনও জিনিসের আসল মূল্য যে সবসময় তার বাহ্যিক চেহারা দেখে বোঝা যায় না, তারই অবিশ্বাস্য উদাহরণ মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রে। প্রায় ৩০ বছর ধরে একটি বাড়ির দরজার চৌকাঠের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল শক্ত একটি ধাতব খণ্ড। বাড়ির মালিকের কাছে সেটি ছিল বাগানে পড়ে থাকা একটি অদ্ভুত পাথর বা ধাতব টুকরো। কিন্তু কয়েক দশক পর জানা গেল, সাধারণ দেখতে সেই বস্তুটি আসলে একটি বিরল উল্কাপিণ্ড।
বিষয়টি আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে যখন বিশেষজ্ঞরা জানান, এই উল্কাপিণ্ডটির সম্ভাব্য মূল্য ১ লাখ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে এর মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে, যদিও প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ভর করবে এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব, শ্রেণিবিন্যাস, সংরক্ষণ এবং সংগ্রাহকদের আগ্রহের ওপর।
ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের এডমোর এলাকায়। প্রায় তিন দশক আগে বাড়ির বাগানে একটি শক্ত বস্তু দেখতে পান ওই বাড়ির মালিক। দেখতে অনেকটা পাথরের মতো হলেও বস্তুটির গঠন ছিল বেশ অস্বাভাবিক। সেটিকে মূল্যবান বা মহাজাগতিক কোনও বস্তু বলে মনে হয়নি তাঁর।
বাগানে পাওয়া বস্তুটি শক্তপোক্ত হওয়ায় তিনি সেটি বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে সেটিকে দরজার চৌকাঠ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। সাধারণ একটি ধাতব টুকরো হিসেবেই সেটি বছরের পর বছর বাড়ির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
এভাবে কেটে যায় প্রায় ৩০ বছর।
তখনও বাড়ির মালিক জানতেন না, তাঁর দরজার নিচে ব্যবহৃত বস্তুটির সঙ্গে পৃথিবীর বাইরের মহাকাশের সম্পর্ক থাকতে পারে।
দীর্ঘ সময় পর ওই ধাতব খণ্ডটি স্থানীয় এক ব্যক্তির নজরে আসে। বস্তুটির চেহারা ও অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য দেখে তাঁর মনে সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি বিষয়টি একজন বিজ্ঞানীর নজরে আনেন।
এরপর শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
বিজ্ঞানীরা বস্তুটির গঠন বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, এটি সাধারণ কোনও পাথর বা পৃথিবীতে তৈরি ধাতব বস্তু নয়। বরং এটি মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এসে পড়া একটি উল্কাপিণ্ডের খণ্ড।
প্রায় ১০ কেজি ওজনের এই বস্তুটির পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ। কারণ উল্কাপিণ্ড শুধু সংগ্রহযোগ্য বস্তু নয়, এগুলো সৌরমণ্ডলের ইতিহাস বোঝার জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক নমুনা।
বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষায় এই উল্কাখণ্ডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লোহা ও নিকেলের উপস্থিতি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বস্তুটির প্রায় ৮৮ শতাংশ লোহা এবং ১২ শতাংশ নিকেল।
এই ধাতব গঠনই বস্তুটির মহাজাগতিক উৎসের বিষয়ে গবেষকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
লোহা-নিকেল সমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে নতুন কিছু নয়। তবে প্রতিটি উল্কাপিণ্ডের রাসায়নিক গঠন, খনিজ বৈশিষ্ট্য ও উৎপত্তির ইতিহাস আলাদা হতে পারে। ফলে কোনও নমুনা পরীক্ষা করে সেটিকে সঠিকভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু দেখতে ধাতব হলেই কোনও বস্তু উল্কাপিণ্ড হয়ে যায় না। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, রাসায়নিক গঠন এবং খনিজ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়।
উল্কাপিণ্ডের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব হলো এগুলো সৌরমণ্ডলের প্রাচীন ইতিহাসের নমুনা বহন করতে পারে।
পৃথিবীসহ সৌরমণ্ডলের গ্রহগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ার অনেক উপাদান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু মহাকাশ থেকে আসা কিছু উল্কাপিণ্ড তুলনামূলকভাবে প্রাচীন উপাদান সংরক্ষণ করে রাখতে পারে।
তাই গবেষণাগারে উল্কাপিণ্ডের রাসায়নিক ও খনিজ গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সৌরমণ্ডনের প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন।
এই কারণেই কয়েক কেজি ওজনের একটি উল্কাখণ্ডও গবেষকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে।
এই ঘটনার সবচেয়ে অবাক করা বিষয় সম্ভবত উল্কাপিণ্ডটির ব্যবহার। সাধারণত মহাকাশ থেকে আসা কোনও বিরল উল্কাপিণ্ড আবিষ্কৃত হলে সেটিকে সংরক্ষণ করা হয়। গবেষণার জন্য সংগ্রহ করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে জাদুঘর বা ব্যক্তিগত সংগ্রহেও জায়গা পায়।
কিন্তু এই নমুনাটি প্রায় ৩০ বছর ধরে ছিল একটি বাড়ির দরজার চৌকাঠে!
অর্থাৎ এত বছর ধরে পরিবারের সদস্যরা যে বস্তুটির ওপর দিয়ে যাতায়াত করেছেন, সেটিই আসলে মহাকাশ থেকে আসা একটি বিরল প্রাকৃতিক নমুনা ছিল বলে পরে জানা যায়।
বাড়ির মালিক যখন সেটি প্রথম বাগান থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, তখন নিশ্চয়ই তিনি ভাবেননি যে কয়েক দশক পর সেটি বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদনে উল্কাপিণ্ডটির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ১ কোটি টাকার কাছাকাছি।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনও উল্কাপিণ্ডের মূল্য নির্ধারণ শুধু তার ওজন দিয়ে হয় না। এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব, বিরলতা, শ্রেণিবিন্যাস, আবিষ্কারের ইতিহাস, সংরক্ষণের অবস্থা এবং সংগ্রাহকদের বাজারে চাহিদা—সবকিছুই দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ১ লাখ ডলারের মূল্যকে নিশ্চিত বিক্রয়মূল্য হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য মূল্যায়ন হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
উল্কাপিণ্ড মূলত মহাকাশের এমন পাথর বা ধাতব বস্তু, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে এসে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায়। মহাকাশে থাকা অবস্থায় এ ধরনের বস্তু সাধারণত উল্কাখণ্ড বা meteoroid হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় ঘর্ষণের কারণে এগুলোর চারপাশে উজ্জ্বল আলোর রেখা তৈরি হতে পারে।
অনেক ছোট বস্তু বায়ুমণ্ডলেই পুড়ে যায়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বড় বা ঘন বস্তুগুলোর কিছু অংশ বেঁচে গিয়ে পৃথিবীর মাটিতে পৌঁছাতে পারে। তখন সেটিই উল্কাপিণ্ড হিসেবে পরিচিত হয়।
তবে বহু উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে পড়ে থাকলেও মানুষ সেগুলো চিনতে পারেন না। কারণ দেখতে অনেক সময় সাধারণ পাথর বা ধাতব খণ্ডের মতোই লাগে।
মিশিগানের এই ঘটনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, বস্তুটির চেহারা দেখে তার গুরুত্ব বোঝা যায়নি। একটি বাগানে পড়ে থাকা শক্ত টুকরো থেকে সেটি হয়ে উঠেছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ নমুনা।
এই ঘটনা আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর মাটিতে পাওয়া অস্বাভাবিক পাথর বা ধাতব বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
কোনও বস্তু দেখতে অদ্ভুত হলেই সেটি উল্কাপিণ্ড নয়। আবার সাধারণ দেখতে কোনও বস্তু যে মূল্যহীন, সেটিও ধরে নেওয়া যায় না।
প্রায় ৩০ বছর ধরে একটি বাড়ির চৌকাঠে ব্যবহৃত ১০ কেজির এই ধাতব খণ্ড তাই এখন শুধুই একটি পুরনো বাড়ির জিনিস নয়। এর মধ্যে হয়তো লুকিয়ে রয়েছে সৌরমণ্ডলের প্রাচীন ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। যে বস্তুটি একসময় বাগান থেকে কুড়িয়ে এনে দরজার নিচে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কাছে হয়ে উঠেছে মহাকাশ থেকে আসা এক বিরল বার্তাবাহক।



