প্রায় ৫০ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার এক বিস্তীর্ণ অরণ্যে হঠাৎ করেই কমতে শুরু করেছিল ব্যাঙের সংখ্যা। একের পর এক প্রজাতির ব্যাঙ যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল প্রকৃতি থেকে। কেন এমন ঘটছিল, তার স্পষ্ট উত্তর খুঁজে পাননি বিজ্ঞানীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘটনা পরিণত হয়েছিল এক রহস্যে। অবশেষে প্রায় পাঁচ দশক পর সেই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলল জঙ্গলে নয়, বরং একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত ব্যাঙের নমুনা থেকে।
ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্যে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। সম্প্রতি স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গবেষকেরা বহু বছর ধরে সংরক্ষিত ব্যাঙের নমুনা পরীক্ষা করে এমন একটি ছত্রাকের সংক্রমণের প্রমাণ পেয়েছেন, যা উভচর প্রাণীদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। গবেষকদের ধারণা, ওই অঞ্চলে ব্যাঙের সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়ার পেছনে এই ছত্রাকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
এই আবিষ্কার শুধু অতীতের একটি পরিবেশগত রহস্যের সমাধানে সাহায্য করছে না, বরং পৃথিবীজুড়ে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানেও নতুন দিশা দেখাচ্ছে।
ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্যে কেন কমছিল ব্যাঙের সংখ্যা?
ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্য পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এই বনাঞ্চলে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী বাস করে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙের জন্য এই অরণ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, এখানকার একাধিক প্রজাতির ব্যাঙের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
প্রকৃতিতে কোনও প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। বন ধ্বংস, জলবায়ুর পরিবর্তন, দূষণ, বাসস্থান হারানো এবং সংক্রামক রোগের মতো বিষয় প্রাণীদের অস্তিত্বের উপর প্রভাব ফেলে। তবে ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্যে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণটি সবচেয়ে বেশি দায়ী ছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন প্রশ্ন ছিল।
ঘটনার সময় বিজ্ঞানীদের হাতে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় রহস্যের সমাধান করা সম্ভব হয়নি। পরে উভচর প্রাণীদের মধ্যে একটি বিশেষ ছত্রাকের সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা বাড়তে থাকে। বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, এই ছত্রাক ব্যাঙের শরীরে মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক প্রাণীর মৃত্যু ঘটাতে পারে।
কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক আগের ঘটনার সঙ্গে ওই ছত্রাকের কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, তা জানার জন্য প্রয়োজন ছিল পুরনো নমুনা পরীক্ষা করা। আর সেই কাজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে জাদুঘরের সংগ্রহ।
জাদুঘরের ৩৭০টিরও বেশি ব্যাঙের নমুনায় মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
অতীতের রহস্যের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনে সংরক্ষিত ব্যাঙের নমুনা পরীক্ষা করেন। তাঁরা মোট ১৭টি প্রজাতির ৩৭০টিরও বেশি ব্যাঙের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। এই নমুনাগুলি বহু বছর ধরে জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল।
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নমুনাগুলির সংগ্রহের সময়কাল। পুরনো ও তুলনামূলক নতুন নমুনার মধ্যে পার্থক্য খতিয়ে দেখে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেন, ঠিক কখন থেকে ব্যাঙের শরীরে ছত্রাকের সংক্রমণের উপস্থিতি দেখা দিতে শুরু করেছিল।
পরীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের আগের নমুনাগুলিতে সংশ্লিষ্ট ছত্রাকের সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ ১৯৮০-এর দশকের নমুনাগুলির অর্ধেকেরও বেশি ব্যাঙের শরীরে সংক্রমণের চিহ্ন মিলেছে।
এই পার্থক্য গবেষকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার সময়কালের সঙ্গে ছত্রাকের সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়ার সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র দেখা যাচ্ছে।
তবে এই ফলাফল থেকে সরাসরি বলা যায় না যে ছত্রাকটিই ওই অঞ্চলে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ ছিল। বরং প্রাপ্ত তথ্য ইঙ্গিত করছে, ওই সময় ছত্রাকের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ব্যাঙের জনসংখ্যার উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যাঙের ত্বকে আক্রমণ করে প্রাণঘাতী ছত্রাক
গবেষণায় যে ছত্রাকের কথা উঠে এসেছে, তার বৈজ্ঞানিক নাম ব্যাট্রাকোকাইট্রিয়াম ডেনড্রোবাটিডিস (Batrachochytrium dendrobatidis)। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি উভচর প্রাণীদের জন্য বিপজ্জনক রোগ সৃষ্টিকারী একটি ছত্রাক হিসেবে পরিচিত। এই ছত্রাকের সংক্রমণে ব্যাঙের শরীরে কাইট্রিডিওমাইকোসিস (Chytridiomycosis) নামের রোগ হতে পারে।
ব্যাঙের ত্বক মানুষের ত্বকের মতো শুধু শরীরের বাইরের আবরণ নয়। তাদের বেঁচে থাকার জন্য ত্বক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্বকের মাধ্যমেই অনেক ব্যাঙ অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের আদান-প্রদান করে। একই সঙ্গে শরীরে জল ও প্রয়োজনীয় লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতেও ত্বক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই অবস্থায় ত্বকে ছত্রাকের সংক্রমণ হলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। গুরুতর সংক্রমণের ফলে ব্যাঙের শরীরে জল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক কাজেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছলে ব্যাঙের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব প্রজাতি এই রোগের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিপুল সংখ্যক প্রাণীর মৃত্যু ঘটতে পারে। তাই ব্যাঙের সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়ার ঘটনা ব্যাখ্যা করতে এই ছত্রাকের ভূমিকা বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৯ সালের আগে সংক্রমণ ছিল না, পরে কেন বাড়ল?
গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, পুরনো নমুনা এবং ১৯৮০-এর দশকের নমুনার মধ্যে সংক্রমণের প্রমাণে স্পষ্ট পার্থক্য। ১৯৭৯ সালের আগের নমুনায় ছত্রাকের উপস্থিতির প্রমাণ না পাওয়া গেলেও পরবর্তী দশকের নমুনাগুলির অর্ধেকেরও বেশি সংক্রমিত ছিল।
এই পরিবর্তন থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ওই সময়ের আশপাশে ছত্রাকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। এর সঙ্গে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার সময়কাল মিলে যাওয়ায় সম্ভাব্য যোগসূত্রটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে পুরনো নমুনায় সংক্রমণের চিহ্ন না পাওয়া মানেই যে সেই সময়ে ছত্রাকটির কোনও অস্তিত্বই ছিল না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। নমুনা সংরক্ষণের পদ্ধতি, সংক্রমণের মাত্রা এবং পরীক্ষার সীমাবদ্ধতাও ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া, কোনও অঞ্চলে প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক পরিবেশগত কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই ছত্রাকের সংক্রমণকে সম্ভাব্য প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও অন্যান্য কারণের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জাদুঘরের নমুনা কীভাবে খুলে দিচ্ছে প্রকৃতির পুরনো রহস্য?
জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাণীর নমুনা সাধারণত গবেষণা, শিক্ষা এবং প্রজাতির পরিচয় নির্ধারণের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগ্রহগুলি অতীতের পরিবেশগত পরিবর্তন বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হয়ে উঠেছে।
ধরা যাক, কোনও অঞ্চলে আজ একটি প্রজাতির প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। বর্তমানের প্রাণীদের পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা রোগের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেন। কিন্তু সেই রোগ ৩০, ৪০ বা ৫০ বছর আগেও ছিল কি না, তা জানা কঠিন হতে পারে। পুরনো নমুনা পরীক্ষা করলে সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্যের ব্যাঙ নিয়ে গবেষণাও তার উদাহরণ। কয়েক দশক আগে সংগ্রহ করা নমুনাগুলি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা অতীতের সংক্রমণের ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন।
এই ধরনের গবেষণায় জাদুঘরের সংগ্রহকে এক অর্থে প্রাকৃতিক ইতিহাসের সংরক্ষিত দলিল বলা যায়। প্রাণীর শরীরে থাকা জীবাণুর চিহ্ন, নমুনা সংগ্রহের সময় এবং স্থান—সব মিলিয়ে অতীতের পরিবেশগত পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিশেষ করে বর্তমানে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার বোঝার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্বজুড়ে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়া কেন উদ্বেগের?
ব্যাঙ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বিভিন্ন পোকামাকড় খায় এবং নিজেরাও পাখি, সাপ ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে। ফলে খাদ্যশৃঙ্খলে তাদের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ব্যাঙের ত্বক পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল। জলদূষণ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, বাসস্থান ধ্বংস এবং সংক্রামক রোগের প্রভাব তাদের উপর দ্রুত পড়তে পারে। সেই কারণে কোনও অঞ্চলে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়া পরিবেশের স্বাস্থ্যের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উভচর প্রাণীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। কোথাও বন ধ্বংস, কোথাও জলবায়ুর পরিবর্তন, আবার কোথাও ছত্রাকের সংক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে সব জায়গায় একই কারণ দায়ী নয়।
ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্য নিয়ে গবেষণা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। কোনও প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার রহস্য বুঝতে হলে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেই চলবে না, অতীতের তথ্যও খতিয়ে দেখতে হবে।
পাঁচ দশক পরেও প্রকৃতির রহস্যের উত্তর মিলছে
প্রায় ৫০ বছর আগে ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্যে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন অমীমাংসিত ছিল। এবার জাদুঘরে সংরক্ষিত ১৭টি প্রজাতির ৩৭০টিরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করে সেই রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেল।
১৯৭৯ সালের আগের নমুনায় ছত্রাকের সংক্রমণের প্রমাণ না পাওয়া এবং ১৯৮০-এর দশকের নমুনার অর্ধেকেরও বেশি ব্যাঙের শরীরে সংক্রমণের চিহ্ন মেলার বিষয়টি গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। তথ্যগুলি ইঙ্গিত করছে, ব্যাট্রাকোকাইট্রিয়াম ডেনড্রোবাটিডিস ছত্রাক ওই অঞ্চলে ব্যাঙের সংখ্যা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
তবে এই আবিষ্কারকে চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ছত্রাকের সংক্রমণ ঠিক কীভাবে ছড়িয়েছিল, কতটা প্রাণহানি ঘটিয়েছিল এবং অন্য পরিবেশগত কারণ কতটা প্রভাব ফেলেছিল, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘটনা দেখিয়ে দিল যে প্রকৃতির বহু রহস্যের উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে অতীতের সংরক্ষিত নমুনার মধ্যেই। যে ব্যাঙগুলি কয়েক দশক ধরে জাদুঘরের তাকেই নিথর হয়ে ছিল, তাদের শরীরের ক্ষুদ্র চিহ্নই আজ বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরছে হারিয়ে যাওয়া এক পরিবেশগত ইতিহাস।



