এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মাটির নিচে পড়ে থাকা ছোট্ট একটি পুঁতি। দেখতে সাধারণ হলেও বয়স জানার পরই বদলে গেল পুরো গল্প। প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে এসেছে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ বছরের পুরনো একটি পুঁতি, যা তৈরি হয়েছিল সমুদ্রের ঝিনুকের খোলস দিয়ে। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, পুঁতিটি যেখানে পাওয়া গেছে, সেখান থেকে বর্তমান সমুদ্রতটের দূরত্ব প্রায় ৬৮ কিলোমিটার।
কীভাবে সমুদ্রের ঝিনুক দিয়ে তৈরি একটি অলঙ্কার হাজার হাজার বছর আগে এতটা দূরে স্থলভাগের ভিতরে পৌঁছে গেল? এই প্রশ্নই এখন গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে। তাদের ধারণা, এই ছোট্ট পুঁতি প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বের যোগাযোগ, বিনিময় এবং সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিতে পারে।
সমুদ্রের ঝিনুকের পুঁতি, কিন্তু পাওয়া গেল স্থলভাগে
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খননের সময় এই প্রাচীন পুঁতিটি পাওয়া যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি তৈরি হয়েছিল জায়ান্ট রক স্ক্যালপ ধরনের সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলস থেকে।
রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে পুঁতিটির বয়স প্রায় ৮ হাজার ৫০০ বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত এই ধরনের জায়ান্ট রক স্ক্যালপ ঝিনুকের পুঁতির মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনগুলোর একটি।
পুঁতিটির বয়সের পাশাপাশি এর অবস্থানও গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে এটি উদ্ধার হয়েছে, সেটি সমুদ্রতট থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার দূরে। ফলে পুঁতিটি সেখানে কীভাবে পৌঁছেছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ঝিনুকটির উৎস আরও দক্ষিণে
এই আবিষ্কারের রহস্য আরও গভীর হয়েছে ঝিনুকটির স্বাভাবিক বাসস্থান বিশ্লেষণ করার পর। জায়ান্ট রক স্ক্যালপ সাধারণত ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সামুদ্রিক এলাকায় পাওয়া যায়। বিশেষ করে সান্টা বারবারা এবং তার আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চল এই ধরনের ঝিনুকের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে, প্রাচীন পুঁতিটি পাওয়া গেছে ক্যালিফোর্নিয়ার আরও উত্তরে এবং সমুদ্র থেকে যথেষ্ট দূরের একটি স্থানে।
অর্থাৎ পুঁতিটির যাত্রা শুধু সমুদ্রতট থেকে কয়েক দশক কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ঝিনুকটির সম্ভাব্য উৎস যদি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল হয়ে থাকে, তাহলে পুঁতিটি তৈরি হওয়ার পর বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান আবিষ্কারের জায়গায় পৌঁছেছিল।
কয়েকশো কিলোমিটার দূরেও পৌঁছাতে পারত বস্তু
গবেষকদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, পুঁতিটি একক কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে এতটা পথ পাড়ি দেয়নি। বরং প্রাগৈতিহাসিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বস্তু বিনিময়ের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পৌঁছাতে পারে।
ধরা যাক, উপকূলীয় কোনো গোষ্ঠী ঝিনুকের খোলস দিয়ে পুঁতিটি তৈরি করল। পরে সেটি অন্য কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে বিনিময় হলো। এরপর আরও একটি গোষ্ঠীর হাতে গিয়ে পৌঁছাল। এভাবে একাধিক মানুষের হাতবদলের মাধ্যমে অলঙ্কারটি তার উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক দূরের অঞ্চলে চলে যেতে পারে।
এই সম্ভাবনা সত্য হলে, প্রায় সাড়ে ৮ হাজার বছর আগেও ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক ছিল বলে ধারণা করা যায়।
লিখিত ইতিহাসের আগেই ছিল দূরপাল্লার যোগাযোগ
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সময়কাল। প্রায় ৮ হাজার ৫০০ বছর আগে মানুষের কাছে লিখিত ভাষা বা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। তবুও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মূল্যবান বস্তু আদান-প্রদান হয়ে থাকতে পারে।
এতে প্রাগৈতিহাসিক সমাজ সম্পর্কে প্রচলিত অনেক সরল ধারণা নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। মানুষ যে শুধুমাত্র নিজেদের ছোট গোষ্ঠী বা বসতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এই পুঁতি তার একটি সম্ভাব্য প্রমাণ।
সমুদ্রের কাছ থেকে পাওয়া একটি ঝিনুকের খোলস তখন শুধু অলঙ্কার ছিল না। সেটি হয়ে উঠতে পারত সামাজিক সম্পর্ক, মর্যাদা কিংবা দূরবর্তী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম।
পুঁতির মূল্য শুধু সৌন্দর্যে ছিল না
প্রাচীন সমাজে অলঙ্কারের গুরুত্ব সবসময় তার ব্যবহারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশেষ ধরনের পুঁতি বা সামুদ্রিক খোলস কোনো গোষ্ঠীর কাছে সামাজিক মর্যাদা, পরিচয় কিংবা বিশেষ সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
সমুদ্রের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের কাছে এমন ঝিনুক পাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও স্থলভাগের অনেক দূরের মানুষের কাছে এটি ছিল বিরল বস্তু। ফলে উপকূল থেকে দূরের অঞ্চলে পৌঁছানোর পর এই ধরনের পুঁতির মূল্য আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এই ছোট্ট পুঁতি শুধু একটি অলঙ্কারের টুকরো নয়। এটি প্রাচীন মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
এক পুঁতিতে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বড় গল্প
হাজার হাজার বছর মাটির নিচে পড়ে থাকার পর একটি ছোট্ট ঝিনুকের পুঁতি সামনে এনেছে মানুষের যোগাযোগের এক বিস্ময়কর সম্ভাবনা। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, লিখিত ইতিহাসের অনেক আগেই মানুষ হয়তো দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখত এবং বিভিন্ন মূল্যবান বস্তু এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছাত।
সমুদ্রতট থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার ভিতরে পাওয়া এই ৮ হাজার ৫০০ বছরের পুরনো পুঁতি তাই আকারে ছোট হলেও ঐতিহাসিক গুরুত্বে বিশাল। এটি প্রাগৈতিহাসিক মানুষের চলাচল, সামাজিক সম্পর্ক, সম্পদ বিনিময় এবং দূরপাল্লার যোগাযোগ সম্পর্কে গবেষণার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।
একটি ঝিনুকের খোলস কীভাবে মানুষের হাত ধরে পাহাড়, উপত্যকা ও বিস্তীর্ণ স্থলভাগ পেরিয়ে এত দূরে পৌঁছেছিল—সেই যাত্রার পুরো গল্প হয়তো আর কখনও জানা সম্ভব হবে না। তবে এই ছোট্ট পুঁতিটি অন্তত এটুকু মনে করিয়ে দিচ্ছে, হাজার হাজার বছর আগের মানুষও একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না।



