স্টাফ রিপোর্টার, এনবি সংবাদ : বেনাপোল স্থলবন্দরের বড় আঁচড়া গেট থেকে চোখ যতদূর যায়, দেখা যায় সারি সারি পণ্যবাহী ট্রাক। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খালি ট্রাক এসে অপেক্ষা করছে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য নিয়ে ফেরার জন্য। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। রুট ও গাড়ির ধরনভেদে ট্রাকভাড়া বেড়েছে কয়েক হাজার টাকা। কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া নিয়ে আমদানিকারক ও পরিবহন মালিকদের মধ্যে দর-কষাকষিও চলছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনাপোল থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি ভাড়ার দাবির কথাও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের জান্নাত-আক্তার কার্গো সার্ভিসের ট্রাকচালক তুহিন বেনাপোলে এসেছিলেন গার্মেন্টসের কাঁচামাল নিতে। তাঁর ভাষ্য, মঙ্গলবার ভোরে তিনি বন্দরে পৌঁছালেও নির্ধারিত সময়ে ট্রাক লোড করা সম্ভব হয়নি। কারণ, নতুন ভাড়া নিয়ে তখনও সমঝোতা হয়নি।
পরে আমদানিকারক ট্রাকপ্রতি প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা অতিরিক্ত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে পণ্য বোঝাই করার ব্যবস্থা হয় বলে জানান তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু পরিবহন খরচই বাড়ছে না, পণ্য খালাস ও সরবরাহের সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে আমদানিকারকদের পাশাপাশি সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং পরিবহন ব্যবসায়ীদের ওপরও চাপ বাড়ছে।
বেনাপোল থেকে ঢাকার পথে আগে একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে সেই ভাড়া বেড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম রুটে ভাড়ার বৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য। আগে যেখানে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ রুটেও ভাড়া প্রায় ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকায় উঠেছে।
অর্থাৎ দূরপাল্লার রুটে একেকটি ট্রিপে ব্যবসায়ীদের কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ফেরি ও সেতুর টোল, টায়ার, যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়।
বেনাপোলের অর্পা-অপ্সরা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে ১০ টনের কাভার্ড ভ্যানে বেনাপোল থেকে ঢাকার কাঁচপুরে তৈরি পোশাকের পণ্য পাঠাতে এখন প্রায় ২৪ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
অথচ এর আগে একই ধরনের পরিবহনে ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানেই ভাড়া প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়েছে।
১২ টনের খোলা ট্রাকের ক্ষেত্রেও ভাড়া প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরিবহন ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, শুধু ডিজেলের দাম বৃদ্ধিই নয়, অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়াও ভাড়া সমন্বয়ের অন্যতম কারণ।
ট্রাকভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর বেনাপোলে ২৪৯ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং ১০৬ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর আমদানি হয় ৩১২ ট্রাক এবং রপ্তানি হয় ৩৫ ট্রাক।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর আমদানি কমে দাঁড়ায় ২৪৬ ট্রাকে এবং রপ্তানি নেমে আসে মাত্র ১১ ট্রাকে। ২২ সেপ্টেম্বর আমদানি হয়েছে ১১৫ ট্রাক এবং রপ্তানি হয়েছে ৮০ ট্রাক।
তবে প্রতিদিনের ট্রাকসংখ্যা বিভিন্ন কারণে ওঠানামা করতে পারে। তাই শুধু এই কয়েক দিনের তথ্যের ভিত্তিতে আমদানি-রপ্তানির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না।
বন্দরসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, অনেক ব্যবসায়ী পণ্য আমদানি করলেও প্রয়োজনীয় ট্রাক না পাওয়ায় সেগুলো বন্দর এলাকার শেডে পড়ে থাকছে। এতে কিছুটা ট্রাকজটও তৈরি হয়েছে।
পণ্য দ্রুত সরিয়ে নিতে না পারলে আমদানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সময়মতো কাঁচামাল বা প্রয়োজনীয় পণ্য কারখানা কিংবা বাজারে পৌঁছানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পকারখানার উপকরণ এবং অন্যান্য আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহন বিলম্ব হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেনাপোলের পরিবহন ব্যবসার একটি অংশ বার্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন ব্যবসায়ীদের মধ্যে আগে থেকেই নির্দিষ্ট ভাড়ায় পণ্য পরিবহনের চুক্তি থাকতে পারে।
জ্বালানি ও অন্যান্য পরিবহন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এসব চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরিবহন ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়ছেন। নতুন ভাড়া অনুযায়ী গাড়ি চালালে আগের চুক্তির তুলনায় তাদের খরচ বাড়ছে। আবার চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করলে আমদানিকারকদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তাদের লোকসানেও পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে।
পরিবহন খরচ বাড়লে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হকের বক্তব্য, পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাণিজ্যে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে পরিবহন খরচ বাড়লেই সব পণ্যের খুচরা দাম একই অনুপাতে বাড়বে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। পণ্যের ধরন, আমদানি মূল্য, সরবরাহব্যবস্থা, বাজারে চাহিদা এবং ব্যবসায়ীদের অন্যান্য খরচসহ একাধিক বিষয়ের ওপর চূড়ান্ত দাম নির্ভর করে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজীর বক্তব্য, ডিজেলের দাম বেড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি টায়ার, ট্রাকের যন্ত্রাংশ এবং ফেরি ভাড়ার মতো অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। এসব খরচ বিবেচনায় নিয়ে ট্রাকভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
অন্যদিকে বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান জানিয়েছেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাকে বেনাপোল দিয়ে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কমে গেলে বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে বন্দরের কার্যক্রম ও রাজস্ব আহরণেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
তবে রাজস্ব আদায়ে কী পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বন্দর কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের কারণ হিসেবে পাচার রোধের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা জ্বালানি প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি পাচার ঠেকাতে যশোর সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বেনাপোল, শার্শা ও চৌগাছা সীমান্ত এলাকায় টহল, তল্লাশি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদারের কথা জানিয়েছেন যশোর ৪৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান।
বেনাপোল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হওয়ায় এখানকার পরিবহন পরিস্থিতির সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার বড় অংশ সরাসরি যুক্ত। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ট্রাকভাড়া বাড়া, যানবাহনের সংকট এবং পণ্য সরবরাহে বিলম্ব—এই তিনটি বিষয় এখন ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিবহন খরচ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আমদানিকারকদের ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ভাড়া, আমদানি ব্যয় এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর।
বর্তমানে বেনাপোল বন্দরের ব্যবসায়ীদের মূল উদ্বেগ হলো—বাড়তি ভাড়ার সঙ্গে কীভাবে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রাখা যায় এবং বন্দরে জমে থাকা পণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।



