এনবি সংবাদ, অনলাইন : চোখের পাতায় একটুখানি কালো কাজল—অনেকের সাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজলের টানে চোখ আরও টানটান, গভীর ও আকর্ষণীয় দেখায়। ভারতীয় উপমহাদেশে তো কাজলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি, পারিবারিক রীতি এবং সৌন্দর্যের ধারণা। শিশুর চোখে কাজলের ফোঁটা দেওয়া থেকে শুরু করে বিয়ের সাজ, উৎসব কিংবা দৈনন্দিন প্রসাধন—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দেখা যায়।
তবে কাজলের ইতিহাস শুধুই সৌন্দর্যচর্চার ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং চোখের সুরক্ষা নিয়ে মানুষের ধারণাও। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরে কাজল ব্যবহার করা হত। শুধু নারী নয়, পুরুষ এবং যোদ্ধারাও চোখে কালো প্রসাধনী ব্যবহার করতেন বলে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মিশরে কাজল ব্যবহারের সঙ্গে শুধু সাজসজ্জা নয়, চোখকে রোদ ও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান থেকে রক্ষা করার বিশ্বাসও যুক্ত ছিল।
কাজলের ইতিহাস বহু হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় চোখ সাজানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কালো পদার্থ ব্যবহার করা হত। এর মধ্যে গ্যালেনা নামে পরিচিত একটি খনিজ পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি মূলত সীসা সালফাইডের একটি প্রাকৃতিক খনিজ।
প্রাচীন মিশরীয়রা এই ধরনের খনিজ গুঁড়ো করে চোখের চারপাশে ব্যবহার করতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং প্রাচীন চিত্রে মিশরীয় নারী-পুরুষের চোখের চারপাশে মোটা কালো রেখার উপস্থিতি তারই প্রমাণ বহন করে।
অনেক ক্ষেত্রে চোখের ওপর এবং নিচে কালো রেখা টেনে দেওয়া হত। সেই সময়ের শিল্পকর্মে রাজপরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চোখেও এমন সাজ দেখা যায়।
প্রাচীন মিশরের পরিবেশ ছিল রুক্ষ। প্রচণ্ড সূর্যালোক, মরুভূমির বালি এবং ধুলোর মতো পরিবেশগত উপাদানের সঙ্গে মানুষকে নিয়মিত মোকাবিলা করতে হত। এই পরিস্থিতিতে চোখকে সুরক্ষিত রাখার জন্য চোখের চারপাশে কালো পদার্থ ব্যবহারের একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল।
বিশেষ করে যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে থাকতে হত। তীব্র রোদ এবং ধুলোবালির মধ্যে চোখে অস্বস্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই কাজলকে চোখের জন্য এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক উপাদান হিসেবে দেখা হত।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ এক বিষয় নয়। তাঁরা কাজলকে চোখের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করতেন বলে ধারণা থাকলেও, সেই সময়ের কাজল যে আধুনিক সানস্ক্রিনের মতো সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি আটকাত, এমন সরল দাবি করা ঠিক নয়।
মিশরীয় সভ্যতায় কাজলকে চোখের চারপাশে ব্যবহারের একটি কারণ ছিল সূর্যের তীব্র আলো থেকে সুরক্ষা পাওয়ার বিশ্বাস। মরুভূমিপ্রধান পরিবেশে দিনের আলো অত্যন্ত উজ্জ্বল হতে পারে। কালো রঙের প্রসাধনী চোখের চারপাশে লাগালে আলো প্রতিফলনের কিছুটা পরিবর্তন ঘটতে পারে—এমন ধারণা থেকেই হয়তো এর ব্যবহার আরও জনপ্রিয় হয়েছিল।
আধুনিক যুগেও খেলোয়াড়দের চোখের নিচে কালো রঙের স্ট্রাইপ ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে তীব্র আলোয় খেলার সময় এমন রঙ ব্যবহার করার উদ্দেশ্য হতে পারে চোখে প্রতিফলিত আলো কমানো। তবে প্রাচীন মিশরীয় কাজল ও আধুনিক স্পোর্টস আই ব্ল্যাককে একই জিনিস হিসেবে দেখা উচিত নয়।
প্রাচীন মানুষ কাজলকে চোখের বিভিন্ন সমস্যা থেকে সুরক্ষার উপায় বলে মনে করতেন। মিশরীয়দের মধ্যেও এমন বিশ্বাস ছিল যে চোখের চারপাশে নির্দিষ্ট ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করলে চোখ ধুলোবালি ও পরিবেশগত সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।
কাজলের কিছু উপাদানের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আধুনিক গবেষণাও হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে প্রাচীন কাজল সবসময় নিরাপদ ছিল বা তা চোখের রোগ প্রতিরোধ করত। বরং ঐতিহাসিক কাজলে ব্যবহৃত কিছু উপাদান আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ক্ষতিকরও হতে পারে।
বিশেষ করে সীসাযুক্ত কাজল নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। প্রাচীন পদ্ধতির কাজল এবং বর্তমানে বাজারে পাওয়া মানসম্মত প্রসাধনীকে এক করে দেখা উচিত নয়।
কাজলকে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের প্রসাধনী ভাবলে ভুল হবে। প্রাচীন মিশরের নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই চোখ সাজানোর এই রীতি প্রচলিত ছিল।
মিশরীয় শিল্পকর্মে দীর্ঘ কালো চোখের রেখা অত্যন্ত পরিচিত একটি বৈশিষ্ট্য। রাজা-রানি থেকে সাধারণ মানুষ—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের চিত্রে চোখের চারপাশে কালো প্রসাধনীর ব্যবহার দেখা যায়।
অর্থাৎ কাজলের ব্যবহার একই সঙ্গে সৌন্দর্য, সামাজিক পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
কাজলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ভারতীয় সংস্কৃতিতে কাজল বা অঞ্জনের ব্যবহার বহু পুরনো। আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্যেও চোখের পরিচর্যার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অঞ্জনের উল্লেখ পাওয়া যায়।
আগেকার দিনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে অঞ্জন বা কাজল তৈরি করার রীতি ছিল। অনেক পরিবারে ঘরেই কাজল তৈরি করা হত। প্রদীপের কালো ধোঁয়া বা কালি সংগ্রহ করে তাতে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে কাজল তৈরির প্রচলন ছিল।
তবে ঐতিহ্যগত ব্যবহার থাকলেও চোখে যে কোনও ঘরোয়া উপাদান প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সতর্কতা মেনে চলা প্রয়োজন।
ভারতে কাজল শুধু প্রসাধনী নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস।
অনেক পরিবারে শিশুর চোখে কাজলের ফোঁটা দেওয়ার রীতি রয়েছে। কোথাও এটি সৌন্দর্যের অংশ, কোথাও আবার নজর লাগা থেকে রক্ষা করার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিয়ের সাজেও কাজলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নববধূর চোখে কাজলের রেখা অনেক সময় সাজকে সম্পূর্ণ করে। আবার বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে উৎসব, নাচ, নাটক ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গেও কাজলের ব্যবহার দেখা যায়।
কাজলের ব্যবহার শুধু ভারত বা প্রাচীন মিশরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলেও চোখে কালো প্রসাধনী ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
আরবি সংস্কৃতিতে কোহল নামে পরিচিত চোখের প্রসাধনীর ব্যবহার বহু পুরনো। বিভিন্ন অঞ্চলে এর সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসও জড়িত।
কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ অনুষ্ঠান বা সামাজিক রীতির অংশ হিসেবেও চোখের প্রসাধনী ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। কোথাও কোথাও মুখে কালো দাগ বা রেখার ব্যবহারও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।
তবে কোন অঞ্চলে কী ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করা হয় এবং তার অর্থ কী—তা সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ভেদে আলাদা।
সময়ের সঙ্গে কাজলের ব্যবহার বদলেছে। একসময় যেখানে এর সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস, চোখের সুরক্ষা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের বিষয় জড়িত ছিল, আধুনিক যুগে সেখানে এটি প্রধানত প্রসাধনীর অংশ।
চোখকে বড় ও আকর্ষণীয় দেখাতে কাজল ব্যবহার করা হয়। কালো রেখা চোখের আকৃতি আরও স্পষ্ট করে তোলে। ফলে সাধারণ সাজেও সামান্য কাজল মুখের অভিব্যক্তি বদলে দিতে পারে।
এই কারণেই প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক মেকআপ কিট—সব জায়গাতেই কাজলের উপস্থিতি দেখা যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রাচীন মিশরীয়রা যে ধরনের খনিজ বা পদার্থ ব্যবহার করতেন, আধুনিক প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহৃত কাজলের উপাদান তার সঙ্গে এক নয়।
প্রাচীন কালে গ্যালেনা বা সীসাযুক্ত উপাদান ব্যবহারের নজির রয়েছে। সীসা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সীসার সংস্পর্শ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
তাই প্রাচীন কাজলের ইতিহাস যতই আকর্ষণীয় হোক, সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে বাড়িতে তৈরি কোনও অজানা উপাদান চোখে ব্যবহার করা নিরাপদ—এমন ধারণা করা উচিত নয়।
একটি ছোট্ট কালো রেখার ইতিহাস যে এত দীর্ঘ হতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। প্রাচীন মিশরের মরুভূমি থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ঘরোয়া সংস্কৃতি, মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্য থেকে আধুনিক মেকআপ—কাজল নানা সময়ে নানা অর্থ বহন করেছে।
কখনও এটি ছিল সৌন্দর্যের অংশ, কখনও সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক, আবার কখনও চোখের সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহ্য। মিশরীয় যোদ্ধাদের চোখ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক প্রসাধনীতে পৌঁছনোর এই দীর্ঘ যাত্রাই কাজলের ইতিহাসকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তাই চোখের পাতায় টানা কয়েক ইঞ্চি কালো রেখার পেছনে শুধু সাজের গল্প নেই। লুকিয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতা, মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং হাজার বছরের জীবনযাত্রার এক বিচিত্র ইতিহাস।



