সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeইতিহাস ও ঐতিহ্যকলম্বাসের ৫০০ বছর আগেই আমেরিকায় ভাইকিংদের পদচিহ্ন! কী বলছে ইতিহাস

কলম্বাসের ৫০০ বছর আগেই আমেরিকায় ভাইকিংদের পদচিহ্ন! কী বলছে ইতিহাস

কলম্বাসের প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে ভাইকিংদের উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর ঘটনা আজ আর কেবল কিংবদন্তির বিষয় নয়। মধ্যযুগীয় নর্স সাগা, গ্রিনল্যান্ডের বসতির ইতিহাস এবং কানাডার ল'আনস অক্স মেডোজের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একসঙ্গে এই অভিযানের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ তুলে ধরে।

এনবি সংবাদ ডেস্ক : ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে বাহামায় পৌঁছেছিলেন। তাঁর সেই সমুদ্রযাত্রা ইউরোপ ও আমেরিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু উত্তর আমেরিকায় প্রথম পৌঁছানো ইউরোপীয় অভিযাত্রী কি সত্যিই কলম্বাস? ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, এর প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগেই উত্তর আমেরিকার উপকূলে পৌঁছেছিলেন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নর্স অভিযাত্রীরা, যাঁদের আমরা সাধারণত ভাইকিং নামে চিনি।

তাঁদের যাত্রায় ছিল না রাজকীয় আয়োজন, ছিল না বিজয়ীর মতো অভ্যর্থনা। বরং আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডকে যাত্রাপথের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে তাঁরা উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপ ও উপকূল ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযানের স্মৃতি টিকে আছে মধ্যযুগীয় আইসল্যান্ডীয় কাহিনি বা সাগায়। পরবর্তী সময়ে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সেই বিবরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে বাস্তব প্রমাণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তবে ভাইকিংদের উত্তর আমেরিকা অভিযানকে কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। দুই অভিযানের উদ্দেশ্য, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী প্রভাব ছিল ভিন্ন। তা সত্ত্বেও কলম্বাসের বহু আগে ইউরোপীয়দের উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর ইতিহাস আজও গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্র।

ভাইকিং কারা, কীভাবে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন?

ভাইকিং বলতে সাধারণত অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে সমুদ্রযাত্রা, বাণিজ্য, অভিযান ও বসতি স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত নর্স জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। তাঁদের আদি আবাস ছিল বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল। তাঁরা দক্ষ নাবিক ছিলেন এবং উত্তর আটলান্টিকের বিস্তীর্ণ জলপথে চলাচলের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।

উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাঁদের যাত্রাপথ ছিল ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার মতো। প্রথমে আইসল্যান্ড, তারপর গ্রিনল্যান্ড এবং সেখান থেকে আরও পশ্চিমে উত্তর আমেরিকার উপকূল। এই পথ তাঁদের কাছে অজানা সমুদ্রের মাঝখানে একটানা দীর্ঘ যাত্রার চেয়ে তুলনামূলকভাবে পরিচিত দ্বীপ ও উপকূল অনুসরণ করার সুযোগ তৈরি করেছিল।

মধ্যযুগীয় নর্স সাগায় এই অভিযানগুলোর বিবরণ পাওয়া যায়। তবে সাগাগুলো ঘটনার বহু পরে লিখিত রূপ পেয়েছে। তাই এগুলোর প্রতিটি বর্ণনাকে সরাসরি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার, লিখিত বিবরণ এবং ভৌগোলিক তথ্য মিলিয়ে গবেষকেরা ভাইকিংদের অভিযানের ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।

আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ড: আমেরিকা অভিযানের পথে দুই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি

ভাইকিংদের উত্তর আটলান্টিক অভিযান বুঝতে হলে প্রথমে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাস জানা প্রয়োজন। নর্স নাবিকেরা নবম শতাব্দীর শেষভাগে আইসল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেন। পরে দশম শতাব্দীতে গ্রিনল্যান্ডেও তাঁদের বসতি গড়ে ওঠে। এই দুই ভূখণ্ড তাঁদের পশ্চিমমুখী অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূল থেকে বর্তমান কানাডার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পৌঁছানোর সুযোগ ছিল। মাঝখানে ছিল বরফশীতল সমুদ্র, কঠিন আবহাওয়া এবং অজানা উপকূলের চ্যালেঞ্জ। তবু অভিজ্ঞ নাবিকেরা দ্বীপ ও উপকূল ধরে এগিয়ে নতুন ভূমি খুঁজতে থাকেন।

নর্স সাগায় উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য কয়েকটি নামের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে হেলুল্যান্ড, মার্কল্যান্ড এবং ভিনল্যান্ড বিশেষভাবে পরিচিত। গবেষকেরা সাধারণত হেলুল্যান্ডকে বর্তমান কানাডার ব্যাফিন দ্বীপের সঙ্গে, মার্কল্যান্ডকে লাব্রাডর অঞ্চলের সঙ্গে এবং ভিনল্যান্ডকে নিউফাউন্ডল্যান্ডসহ উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তবে এসব প্রাচীন নামের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নিয়ে এখনও আলোচনা রয়েছে।

সাগার বর্ণনা অনুসারে, নর্স অভিযাত্রীরা শুধু একটি জায়গায় পৌঁছে ফিরে আসেননি। তাঁরা বিভিন্ন উপকূল ঘুরে দেখেছিলেন, কাঠ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সন্ধান করেছিলেন এবং কোথাও কোথাও সাময়িক বসতি স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।

এরিক দ্য রেডের নির্বাসন কীভাবে বদলে দিল ইতিহাস?

ভাইকিংদের গ্রিনল্যান্ড অভিযানের ইতিহাসে এরিক দ্য রেড একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। নর্স কাহিনি অনুসারে, তিনি আইসল্যান্ডে বসবাস করতেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সংঘাত ও প্রাণঘাতী ঘটনার জেরে তাঁকে নির্বাসনের শাস্তি দেওয়া হয়। সেই নির্বাসনকালেই তিনি পশ্চিমে গ্রিনল্যান্ডের দিকে যাত্রা করেন।

প্রায় ৯৮২ সালের দিকে এরিক গ্রিনল্যান্ডে অভিযান চালান বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পাওয়ার পর তিনি ফিরে এসে অন্যদেরও বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করেন। পরবর্তী সময়ে গ্রিনল্যান্ডে নর্সদের একাধিক বসতি গড়ে ওঠে, যা কয়েক শতাব্দী টিকে ছিল।

গ্রিনল্যান্ডের এই বসতিগুলো শুধু নতুন জীবন গড়ার জায়গা ছিল না; উত্তর আমেরিকার দিকে আরও পশ্চিমে যাওয়ার জন্যও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরিকের ছেলে লেইফ এরিকসনসহ পরবর্তী নর্স অভিযাত্রীরা এই পথ ব্যবহার করেছিলেন বলে সাগায় বর্ণনা পাওয়া যায়।

এরিকের অভিযানের পেছনে শুধু কৌতূহলই কাজ করেছিল, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। নতুন জমি, কাঠ, শিকার এবং বাণিজ্যের সম্ভাবনাও তাঁদের আকৃষ্ট করে থাকতে পারে। গ্রিনল্যান্ডের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সীমাবদ্ধ অঞ্চলে কাঠের মতো উপকরণের গুরুত্ব ছিল বিশেষভাবে বেশি।

লেইফ এরিকসন ও ভিনল্যান্ডের সন্ধান

উত্তর আমেরিকায় নর্স অভিযানের ইতিহাসে লেইফ এরিকসনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

লেইফ এরিকসনকে সাধারণত সেই ভাইকিং অভিযাত্রী হিসেবে স্মরণ করা হয়, যিনি প্রায় এক হাজার বছর আগে উত্তর আমেরিকার উপকূলে পৌঁছেছিলেন। মধ্যযুগীয় নর্স সাগায় তাঁর অভিযানের বিবরণ রয়েছে। তবে এসব কাহিনি ঘটনার অনেক পরে লিখিত হওয়ায় কোন বিবরণ কতটা নির্ভুল, তা যাচাই করতে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের প্রয়োজন হয়েছে।

নর্সরা যে নতুন ভূখণ্ডকে ভিনল্যান্ড নামে চিনত, সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁরা কিছু সময় অবস্থান করেছিলেন বলে কাহিনিগুলোতে বলা হয়েছে। সেখানে কাঠ, মাছ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহের সুযোগ ছিল। গ্রিনল্যান্ডে বসবাসকারী নর্সদের জন্য কাঠ বিশেষভাবে মূল্যবান হতে পারে, কারণ ওই অঞ্চলে বড় গাছের অভাব ছিল।

লেইফের পর অন্য অভিযাত্রীরাও ভিনল্যান্ডের দিকে যাত্রা করেন বলে সাগায় উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে থরফিন কার্লসেফনির নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর অভিযানে পরিবার, সহযাত্রী এবং গৃহপালিত পশুও ছিল বলে কাহিনিতে বর্ণনা করা হয়েছে। এই বিবরণগুলো থেকে ধারণা পাওয়া যায়, কিছু অভিযান নিছক অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ ছিল না; সেখানে বসতি গড়ে তোলার চেষ্টাও হয়েছিল।

তবে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত এবং দূরবর্তী বসতির রসদ সরবরাহের সমস্যা তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান কঠিন করে তুলেছিল বলে গবেষকেরা মনে করেন। ফলে উত্তর আমেরিকায় ভাইকিংদের উপস্থিতি স্থায়ী ও বিস্তৃত উপনিবেশে রূপ নেয়নি।

ল’আনস অক্স মেডোজ: ভাইকিংদের উপস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ

দীর্ঘদিন ধরে ভাইকিংদের ভিনল্যান্ড অভিযান সম্পর্কে জানা যেত মূলত নর্স সাগার মাধ্যমে। এসব কাহিনিতে ইতিহাসের পাশাপাশি কিংবদন্তি ও সাহিত্যিক উপাদানও ছিল। ফলে উত্তর আমেরিকায় ভাইকিংদের উপস্থিতির দাবি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল।

সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ উত্তর মেলে ১৯৬০ সালে। কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপের উত্তরে ল’আনস অক্স মেডোজ এলাকায় নর্স বসতির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। নরওয়ের অভিযাত্রী হেলগে ইনগস্টাড ও প্রত্নতত্ত্ববিদ অ্যান স্টাইন ইনগস্টাডের অনুসন্ধানে এই স্থানটি চিহ্নিত হয়। পরবর্তী খননকাজে সেখানে ঘরবাড়ি, কর্মশালা এবং নর্সদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীর নিদর্শন পাওয়া যায়।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের পাওয়া ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ছিল কাঠ ও মাটির তৈরি ঘরের কাঠামো, লোহা গলানো ও কাজ করার চিহ্ন এবং নৌকা মেরামতের সঙ্গে সম্পর্কিত নিদর্শন। এগুলোর সঙ্গে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের নর্স বসতিগুলোর স্থাপত্য ও উপকরণের মিল রয়েছে। তাই ল’আনস অক্স মেডোজকে উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয়দের প্রাচীনতম পরিচিত বসতিগুলোর একটি এবং ভাইকিংদের উপস্থিতির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, ভাইকিংদের উত্তর আমেরিকা অভিযান কেবল লোককাহিনি ছিল না। অন্তত একটি স্থানে তাঁরা বাস্তবে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তবে এই একটি প্রত্নস্থল থেকে উত্তর আমেরিকার আরও অনেক দূর পর্যন্ত তাঁদের স্থায়ী বসতি ছিল, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

২০২১ সালের গবেষণা কীভাবে ভাইকিংদের সময়কাল নির্ধারণ করল?

ল’আনস অক্স মেডোজের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার পর। গবেষকেরা সেখানে পাওয়া কাঠের নমুনা বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট একটি সাল চিহ্নিত করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, নর্সরা ১০২১ খ্রিস্টাব্দে ওই স্থানে কাঠ কেটেছিল। অর্থাৎ, অন্তত সেই বছর উত্তর আমেরিকায় তাঁদের উপস্থিতি ছিল।

এই সময় নির্ধারণের পদ্ধতিটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষকেরা গাছের বলয় এবং অতীতে ঘটে যাওয়া সৌরঝড়ের ফলে পরিবেশে কার্বন-১৪-এর মাত্রায় সৃষ্ট পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেন। গাছের বলয়ে সেই পরিবর্তনের চিহ্ন শনাক্ত করে কাঠ কাটার সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

এর আগে বসতির বয়স অনুমান করা হতো স্থাপত্যের ধরন, প্রত্নবস্তু এবং মধ্যযুগীয় কাহিনির সঙ্গে তুলনা করে। নতুন গবেষণা নির্দিষ্ট সাল চিহ্নিত করার সুযোগ দেয়। ফলে ভাইকিংদের উত্তর আমেরিকা অভিযানের কালপঞ্জি আরও দৃঢ় ভিত্তি পায়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: ১০২১ সাল হলো ওই প্রত্নস্থলে কাঠ কাটার প্রমাণিত সময়। এটি ভাইকিংদের প্রথম উত্তর আমেরিকা যাত্রার সাল নয়। তাঁরা ঠিক কোন বছর প্রথম সেখানে পৌঁছেছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

ভাইকিংরা কি একাধিকবার উত্তর আমেরিকায় গিয়েছিলেন?

ল’আনস অক্স মেডোজের আবিষ্কার শুধু একটি বসতির অস্তিত্ব প্রমাণ করেনি; এটি আরও বড় একটি প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে। ভাইকিংরা কি কেবল একবার উত্তর আমেরিকায় গিয়েছিলেন, নাকি কয়েক শতাব্দী ধরে মাঝেমধ্যে এই অঞ্চলে যাতায়াত করেছিলেন?

মধ্যযুগীয় সাগায় একাধিক অভিযানের কথা রয়েছে। সেখানে ভিনল্যান্ডে যাওয়া, বসতি স্থাপনের চেষ্টা, সম্পদ সংগ্রহ এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সংঘাতের বিবরণ পাওয়া যায়। কানাডার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী সংস্থা পার্কস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ল’আনস অক্স মেডোজকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে নর্স অভিযাত্রীরা আরও দক্ষিণের অঞ্চল অনুসন্ধান করেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ কাঠ ও অন্যান্য পণ্য সংগ্রহের জন্য একাধিকবার সেখানে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

তবে এই যাতায়াত কত দিন ধরে চলেছিল এবং তাঁরা ঠিক কত দূর দক্ষিণে পৌঁছেছিলেন, তা নিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ভাইকিংদের উপস্থিতির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হলেও ল’আনস অক্স মেডোজই এখন পর্যন্ত তাঁদের বসতির একমাত্র নিশ্চিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।

অর্থাৎ, ভাইকিংরা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন—এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তাঁদের অভিযানের প্রতিটি কাহিনি বা ভৌগোলিক বিবরণ একই মাত্রায় নিশ্চিত নয়।

কলম্বাস কি ভাইকিংদের আবিষ্কারের কথা জানতেন?

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ১৪৯২ সালের সমুদ্রযাত্রা নিয়ে একটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন রয়েছে: তাঁর আগে ইউরোপীয়রা যে পশ্চিমে নতুন ভূমিতে পৌঁছেছিলেন, সে সম্পর্কে কি তিনি জানতেন?

ইতিহাসবিদদের আলোচনায় উত্তর আটলান্টিকের নাবিকদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডে নর্সদের বসতি ছিল এবং উত্তর আমেরিকার সঙ্গে তাদের যোগাযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে। কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে বোঝা যায়, মধ্যযুগের শেষভাগেও উত্তর আটলান্টিকের নাবিকদের মধ্যে পশ্চিমের ভূমি সম্পর্কে ধারণা প্রচলিত থাকতে পারে।

কিন্তু কলম্বাস ব্যক্তিগতভাবে ভাইকিংদের ভিনল্যান্ড অভিযানের বিবরণ জানতেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। তাঁর সমুদ্রযাত্রার পথ নির্বাচন নিয়েও বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। তিনি জেনেশুনে উত্তর আমেরিকার কোনো পরিচিত অঞ্চল এড়িয়ে গিয়েছিলেন—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য নয়।

কলম্বাসের উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম দিকে সমুদ্রপথে এশিয়ার সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলে পৌঁছানো। কিন্তু তিনি যে ভূখণ্ডে পৌঁছেছিলেন, সেটি ইউরোপীয়দের কাছে তাঁর প্রত্যাশিত এশিয়া ছিল না। অন্যদিকে, ভাইকিংদের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল নতুন ভূমি অনুসন্ধান, সম্পদ সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য বসতি স্থাপন। দুই অভিযানের মধ্যে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

কলম্বাস ডে ও ভাইকিংদের ইতিহাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর অক্টোবর মাসে কলম্বাস ডে পালিত হয়। এই দিবসের সঙ্গে ইউরোপীয়দের আমেরিকায় আগমন এবং পরবর্তী ইতিহাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয়দের পৌঁছানোর ইতিহাস কেবল কলম্বাসকে দিয়ে শুরু হয়নি।

লেইফ এরিকসন ও তাঁর সমসাময়িক নর্স অভিযাত্রীরা প্রায় এক হাজার বছর আগে উত্তর আমেরিকার উপকূলে পৌঁছেছিলেন। তাঁদের যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেনি। তবু তাঁদের অভিযানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কম নয়। এটি দেখায়, মধ্যযুগীয় নাবিকেরা সীমিত প্রযুক্তি ও কঠিন পরিবেশের মধ্যেও কত দূর সমুদ্র পাড়ি দিতে পারতেন।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ভাইকিংদের পৌঁছানোর বহু আগে থেকেই উত্তর আমেরিকায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তাই ইউরোপীয়দের কাছে কোনো ভূমির পরিচিতি পাওয়া আর সেই ভূমি প্রথম আবিষ্কার করা এক বিষয় নয়। ভাইকিংরা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন—এটি ইউরোপীয় অভিযানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; কিন্তু মহাদেশটির মানব ইতিহাস তারও বহু হাজার বছর পুরোনো।

ইতিহাসের আড়ালে থাকা এক সমুদ্রযাত্রার উত্তরাধিকার

কলম্বাসের প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে ভাইকিংদের উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর ঘটনা আজ আর কেবল কিংবদন্তির বিষয় নয়। মধ্যযুগীয় নর্স সাগা, গ্রিনল্যান্ডের বসতির ইতিহাস এবং কানাডার ল’আনস অক্স মেডোজের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একসঙ্গে এই অভিযানের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ তুলে ধরে।

তবে গবেষণার কাজ এখনও শেষ হয়নি। ভাইকিংরা ঠিক কত দূর দক্ষিণে গিয়েছিলেন, কতবার উত্তর আমেরিকায় ফিরেছিলেন এবং তাঁদের অভিযানের খবর ইউরোপের অন্য নাবিকদের কাছে কতটা পৌঁছেছিল—এসব প্রশ্নের আরও উত্তর প্রয়োজন।

এতটুকু নিশ্চিত যে, আমেরিকায় ইউরোপীয়দের আগমনের ইতিহাস কলম্বাসের ১৪৯২ সালের সমুদ্রযাত্রার অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। বরফশীতল উত্তর আটলান্টিকের জলপথ ধরে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ড পেরিয়ে যাওয়া ভাইকিংদের সেই অভিযান ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়, যা প্রত্নতত্ত্বের নতুন আবিষ্কারে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ