এনবি সংবাদ, লাইফস্টাইল ডেস্ক : চুল আঁচড়াতে গেলেই গোছা গোছা চুল উঠে আসছে? ধীরে ধীরে মাথার ত্বকও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে? এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন অনেকেই। চুল পড়ার সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে। কিন্তু চুল পড়ার কারণ বুঝে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
নিজের জীবনের এমনই এক অভিজ্ঞতা সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন হার্ভার্ড-প্রশিক্ষিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ নীরা নাথন। তাঁর দাবি, একসময় দীর্ঘস্থায়ী চুল পড়ার সমস্যায় মাথার প্রায় অর্ধেক চুল হারিয়েছিলেন তিনি। তবে ধৈর্য ধরে নির্দিষ্ট চিকিৎসা ও পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখতে পান।
চুল পড়া কমাতে এবং নতুন চুলের বৃদ্ধিতে কী কী বিষয় তাঁর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতাই জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। কারণ চুলের বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক চক্র রয়েছে। পুরনো চুল ঝরে গিয়ে তার জায়গায় নতুন চুল তৈরি হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের তুলনায় অনেক বেশি চুল পড়তে শুরু করলে তার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, অপুষ্টি, আয়রন বা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বংশগত কারণ এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যালোপেসিয়ার কারণে চুল পড়তে পারে।
কখনও আবার দীর্ঘদিন ধরে চলা অসুস্থতা বা শরীরের বড় কোনও পরিবর্তনের পরেও সাময়িকভাবে চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। তাই শুধু তেল বা শ্যাম্পু পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
নীরা নাথন জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে তিনি ক্রনিক টেলোজেন এফ্লুভিয়াম এবং অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার সমস্যার মুখোমুখি হন। এর ফলে তাঁর মাথার প্রায় ৫০ শতাংশ চুল ঝরে গিয়েছিল বলে তিনি জানান।
এই পরিস্থিতি যে তাঁর কাছেও মানসিকভাবে সহজ ছিল না, তা তাঁর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নিয়মিত পরিচর্যার দিকে জোর দেন তিনি।
তাঁর অভিজ্ঞতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—চুলের চিকিৎসায় দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় একের পর এক পদ্ধতি বদলে না ফেলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
মাথার ত্বকের স্বাস্থ্য চুলের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। খুশকি বা মাথার ত্বকে প্রদাহের সমস্যা থাকলে তা অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন নীরা নাথন।
নিজের পরিচর্যার ক্ষেত্রে তিনি সপ্তাহে কয়েক দিন খুশকি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত শ্যাম্পু ব্যবহার করতেন বলে জানিয়েছেন। তবে কোন ধরনের শ্যাম্পু কার জন্য উপযুক্ত, তা মাথার ত্বকের সমস্যার ওপর নির্ভর করে।
তাই খুশকি থাকলেই নিজের ইচ্ছেমতো কোনও মেডিকেটেড শ্যাম্পু দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে প্রয়োজন হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চুল পড়ার পাশাপাশি অনেকের চুল ভেঙে যাওয়ার সমস্যাও থাকে। বিশেষ করে চুলের আগা শুষ্ক ও ফেটে গেলে চুলের সামগ্রিক ঘনত্ব কম মনে হতে পারে।
নীরা নাথন চুলের শুষ্কতা ও আগা ফাটার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সপ্তাহে একবার হেয়ার মাস্ক ব্যবহারের কথা বলেছেন। শ্যাম্পু করার পর মাথার ত্বকে নয়, বরং চুলের মাঝামাঝি অংশ থেকে ডগা পর্যন্ত মাস্ক লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে নেওয়া যায়।
তবে হেয়ার মাস্ক চুলের গোড়া থেকে নতুন চুল গজানোর চিকিৎসা নয়। এটি মূলত চুলের শুষ্কতা ও ক্ষতি কমাতে সহায়ক পরিচর্যার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
চুল গজানোর চিকিৎসায় মিনোক্সিডিল বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নীরা নাথন জানিয়েছেন, নিজের ক্ষেত্রে তিনি রাতে মাথার ত্বকে ৫ শতাংশ মিনোক্সিডিল ফোম ব্যবহার করতেন।
তবে তাঁর অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল—মিনোক্সিডিল নিজের ইচ্ছেমতো শুরু না করার পরামর্শ। কারণ চুল পড়ার ধরন, বয়স, লিঙ্গ, মাথার ত্বকের অবস্থা এবং অন্য শারীরিক সমস্যার ওপর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করতে পারে।
কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে মিনোক্সিডিল উপযুক্ত কি না, কী মাত্রায় ব্যবহার করা উচিত এবং কতদিন ব্যবহার করতে হবে—এসব বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
এছাড়া মিনোক্সিডিল ব্যবহারের শুরুতে কিছু মানুষের চুল পড়া সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই চিকিৎসা শুরু করার পর নিজের মতো করে তা বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
চুলের পরিচর্যায় বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিও ব্যবহৃত হচ্ছে। নীরা নাথন জানিয়েছেন, নিজের রুটিনে তিনি এলইডি বা লো-লেভেল লেজার থেরাপির সঙ্গে যুক্ত হেলমেট বা চিরুনি ব্যবহার করেছেন।
এই ধরনের ডিভাইস কিছু ক্ষেত্রে চুলের বৃদ্ধির সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে বাজারে পাওয়া সব ধরনের হেলমেট বা লেজার ডিভাইস সমান কার্যকর বা সবার জন্য উপযুক্ত—এমন দাবি করা যায় না।
তাই এই ধরনের যন্ত্র ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে চুল পড়ার মূল কারণ যদি জানা না থাকে, তাহলে শুধু কোনও ডিভাইস ব্যবহার করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা না করাই ভালো।
নীরা নাথন চুলের পরিচর্যার ক্ষেত্রে মাইক্রোনিডলিং এবং পেপটাইড বা ক্যাফিনযুক্ত সিরামের কথাও উল্লেখ করেছেন।
মাইক্রোনিডলিংয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সূঁচের মাধ্যমে মাথার ত্বকে নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র ক্ষত তৈরি করা হয়। কিছু নির্দিষ্ট চুল পড়ার সমস্যায় এটি চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি নিজে নিজে বাড়িতে করার মতো সাধারণ সৌন্দর্যচর্চা নয়।
ভুল পদ্ধতিতে মাইক্রোনিডলিং করলে মাথার ত্বকে সংক্রমণ, জ্বালা বা অন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত নয়।
একইভাবে কোনও সিরামকে ‘চুল গজানোর নিশ্চিত সমাধান’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। উপাদান, ঘনত্ব এবং ব্যক্তির চুল পড়ার কারণ অনুযায়ী এর কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে।
চুলের স্বাস্থ্যের সঙ্গে শরীরের সামগ্রিক পুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত প্রোটিন না খেলে চুলের বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি।
অনেক সময় শরীরে আয়রন বা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির সঙ্গেও চুল পড়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে চুল পড়ছে বলেই নিজের ইচ্ছায় আয়রন, ভিটামিন ডি বা অন্য কোনও সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করা উচিত নয়।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করে শরীরে কোনও পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে কি না তা জানা যেতে পারে। ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা পূরণ করা যেতে পারে।
চুল পড়ার পাশাপাশি চুল ভেঙে যাওয়াও মাথার চুল পাতলা দেখানোর একটি কারণ হতে পারে। নিয়মিত হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেটনার, কার্লার বা অন্যান্য গরম যন্ত্র ব্যবহার করলে চুলের বাইরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে চুল শুষ্ক, রুক্ষ ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। চুলের ডগা ফেটে গিয়ে সহজেই ভেঙে পড়ে। এতে নতুন চুল না পড়লেও মাথায় চুলের পরিমাণ কম মনে হতে পারে।
এই ধরনের ক্ষতি কমাতে হিট প্রোটেক্ট্যান্ট বা তাপরোধী সিরাম ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন নীরা নাথন। পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগের অভ্যাস কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
চুল পড়ার সমস্যা শুরু হলেই অনেকেই তেল, ঘরোয়া প্যাক কিংবা বিভিন্ন ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহার করতে শুরু করেন। এগুলো চুলের পরিচর্যায় কিছুটা সহায়ক হলেও সব ধরনের চুল পড়ার চিকিৎসা এগুলোর মাধ্যমে সম্ভব নয়।
যদি হরমোনের সমস্যা, অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া, অ্যালোপেসিয়া অ্যারিয়াটা, দীর্ঘস্থায়ী টেলোজেন এফ্লুভিয়াম, পুষ্টির ঘাটতি বা কোনও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চুল পড়ে, তাহলে মূল কারণ চিহ্নিত করা জরুরি।
অর্থাৎ চুল পড়া বন্ধ করার আগে জানতে হবে—কেন চুল পড়ছে।
চুলের চিকিৎসায় ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও চিকিৎসা শুরু করার পর কয়েক দিনেই মাথা ভর্তি নতুন চুল গজিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির চক্র ধীরগতির। তাই চিকিৎসার ফল দেখতে অনেক সময় কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কারও ক্ষেত্রে ফল ভালো হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে চুলের ঘনত্ব পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে নাও আসতে পারে।
নীরা নাথনের অভিজ্ঞতা থেকে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট—চুল পড়ার সমস্যায় নিয়মিত পরিচর্যা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
চুল পড়ার পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গেলে, মাথার নির্দিষ্ট অংশে চুল উঠে গিয়ে ফাঁকা হয়ে গেলে, চুলের সিঁথি ক্রমশ চওড়া হতে থাকলে বা মাথার ত্বক আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে কয়েক মাস ধরে চুল পড়া চলতে থাকলে শুধু প্রসাধনী পরিবর্তন না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াই উপযুক্ত।
প্রয়োজনে চিকিৎসক মাথার ত্বক পরীক্ষা, চুল পড়ার ধরন বিশ্লেষণ এবং কিছু রক্ত পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ খুঁজে দেখতে পারেন।
নীরা নাথনের অভিজ্ঞতা মূলত দেখায়, চুল পড়া মানেই সবসময় স্থায়ীভাবে চুল হারিয়ে ফেলা নয়। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি যে প্রত্যেকের চুল পড়ার কারণ এক নয়।
কেউ হয়তো পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করলেই উপকার পাবেন, কারও প্রয়োজন হতে পারে নির্দিষ্ট ওষুধ, আবার কারও ক্ষেত্রে বংশগত চুল পড়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার হতে পারে।
তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও চিকিৎসকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দেখে একই রুটিন হুবহু অনুসরণ না করে নিজের সমস্যার কারণ জানতে হবে। সঠিক রোগ নির্ণয়, চিকিৎসকের পরামর্শ, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং নিয়মিত চুলের যত্ন—এই চারটি বিষয়ই চুলের স্বাস্থ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, অতিরিক্ত চুল পড়া শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত কারণ খুঁজে বের করা উচিত। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই চুল পড়ার গতি কমানো এবং চুলের বৃদ্ধিকে সহায়তা করা সম্ভব।



