সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeদেশজুড়েসাতক্ষীরায় শামীমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, জামায়াতের নেতা-কর্মীদের নিয়ে মুখ খুলল পরিবার

সাতক্ষীরায় শামীমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, জামায়াতের নেতা-কর্মীদের নিয়ে মুখ খুলল পরিবার

নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওছিফ রহমান সাগরের অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওকে কেন্দ্র করে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, অডিও ছড়িয়ে দেওয়ার পর একদল মানুষ শামীমের বাড়িতে হামলা চালায় এবং পরে তাঁকে মারধর করে হত্যা করে।

এনবি সংবাদ ডেস্ক : সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একাধিকবার মারধরের শিকার হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। শামীমের পরিবারের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, ঘটনার সূত্রপাতের পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা-কর্মী হামলা ও জনতাকে সংগঠিত করার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ খবর বিবিসি বাংলা অনলাইনের।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর তাঁকে মারধর করা হচ্ছে বলে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাটি নিয়ে নিহতের পরিবারের বক্তব্য, স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের নেতার প্রতিক্রিয়া এবং পুলিশের অবস্থান—সব মিলিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে, অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর কীভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল, কারা জনতাকে সংগঠিত করেছিল এবং হামলার ঘটনায় কারা জড়িত ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শামীমকে মারধর করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়ার পর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান এবং তাঁকে উদ্ধার করেন। কিন্তু পরে রাত সাড়ে আটটার দিকে উত্তেজিত জনতা আবারও তাঁর ওপর হামলা চালায় বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

এরপর শামীমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের সত্যতা, অডিও ক্লিপের উৎস এবং সেটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, সে বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের ফল এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেই কাউকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওছিফ রহমান সাগরের অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওকে কেন্দ্র করে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, অডিও ছড়িয়ে দেওয়ার পর একদল মানুষ শামীমের বাড়িতে হামলা চালায় এবং পরে তাঁকে মারধর করে হত্যা করে।

বিবিসি বাংলাকে সাগর জানান, সোমবার প্রথম দফায় শামীমের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। সেই হামলায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা-কর্মী যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর আরও দাবি, স্থানীয় বাজারে জামায়াতের কার্যালয়ে লোকজন জড়ো হওয়ার পর সেখান থেকে একটি দল তাঁদের বাড়িতে আসে।

তবে পরিবারের এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, শামীমের বাড়িতে পারিবারিক বিরোধের ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর বক্তব্য, মারধরের ঘটনায় এলাকার সাধারণ মানুষ জড়িত ছিলেন। জামায়াতের নেতা-কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছিলেন, এমন অভিযোগ তিনি মানতে চাননি।

ফলে ঘটনার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াহিদুজ্জামান শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। কয়েক বছর আগে বাসে যাতায়াতের সময় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিলেন বলে দাবি তাঁর ভাইয়ের।

সাগরের বক্তব্য, ওই ঘটনার পর শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও শামীমের আচরণে মাঝেমধ্যে পরিবর্তন দেখা যেত। পরিবারের দাবি, তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার কারণে প্রথম সংসার ভেঙে যায়। সেই সংসারে তাঁর আট বছরের একটি ছেলে রয়েছে। পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় সংসারেও সাত মাসের একটি সন্তান রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর ভাই।

পরিবারের আরও দাবি, সোমবার বাড়িতে হামলার ঘটনার পর শামীম বিষপান করেন। তাঁকে স্থানীয় এক চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে পরিবারের বক্তব্য।

তবে শামীমের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে পরিবারের এই বক্তব্যের চিকিৎসাগত নথি বা স্বাধীন নিশ্চিতকরণ এখানে পাওয়া যায়নি। তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রাসঙ্গিক চিকিৎসার তথ্য প্রয়োজন।

পরিবারের বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার বাড়িতে হামলার পর শামীমকে স্থানীয় চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার বিকেলে সেখানেও একদল মানুষ হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু সেখানেও উত্তেজিত জনতার হামলার অভিযোগ সামনে আসে। পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলাকারীরা তাঁকে আবার মারধর করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, একদল মানুষ হাসপাতালে ঢুকে শামীমকে মারধর করে এবং একপর্যায়ে তাঁকে ওয়ার্ড থেকে বাইরে নিয়ে যায়। পরে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এই ঘটনাক্রম হাসপাতালের নিরাপত্তা এবং পুলিশের হেফাজতে থাকা বা চিকিৎসাধীন ব্যক্তির সুরক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাঁকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা বা শারীরিক আক্রমণ চালানো আইনসম্মত বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।

ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, মোঃ ফজলুল হক আমিনী নামে এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভ এবং একাধিক ভিডিওর মাধ্যমে লোকজনকে উত্তেজিত করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে জনতাকে সংগঠিত করার অভিযোগও তুলেছে পরিবার।

পরিবারের দাবি, ওই ব্যক্তি শামীমের মৃত্যুর পরও সামাজিক মাধ্যমে তাঁর ছবি প্রকাশ করেছিলেন। অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ উঠলেই তাঁকে দোষী বলা যায় না। একইভাবে, ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনও ভূমিকা থাকলে সেটিও তদন্তের বাইরে রাখা উচিত নয়।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও অন্যান্য বিষয় পুলিশের নজরে এসেছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পুলিশ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়নি বলে জানানো হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতির কথাও বলা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে মামলা দায়ের হয়েছে কি না কিংবা কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হালনাগাদ পুলিশি তথ্য প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যু শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ ছড়ানো, জনতাকে সংগঠিত করা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিপজ্জনক পরিণতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার। কাউকে দলবদ্ধভাবে মারধর করা, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ওপর হামলা চালানো কিংবা তাঁকে হত্যা করা কোনওভাবেই ন্যায়বিচারের পথ নয়।

এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াত নেতা-কর্মীদের বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও এবং পুলিশের ভূমিকা—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে, প্রথম হামলার পর শামীমকে নিরাপদে রাখা গেল না কেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কীভাবে দ্বিতীয় দফায় হামলা হল এবং অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে পুলিশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার উত্তর তদন্ত থেকেই সামনে আসা উচিত।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ