সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeমেডিকেল জার্নালআর ২৫ বছর বাঁচলেই অমর মানুষ? জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে কী বলছে বিজ্ঞান

আর ২৫ বছর বাঁচলেই অমর মানুষ? জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে কী বলছে বিজ্ঞান

বার্ধক্য নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জেনেটিক্স। আমাদের শরীরের কোষ কীভাবে কাজ করবে, কীভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং বিভিন্ন ক্ষতির সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তার সঙ্গে জিনের সম্পর্ক রয়েছে।

‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’—মাইকেল মধুসূদন দত্তের বহুল পরিচিত এই পংক্তি মানুষের জীবনের সবচেয়ে পুরনো সত্যগুলোর একটির কথা মনে করিয়ে দেয়। জন্মের পর একদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে—এটাই এতদিন মানবজীবনের অবধারিত নিয়ম হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান সেই নিয়মকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিষয়টি এখন আর শুধু কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা বার্ধক্যকে কীভাবে ধীর করা যায়, বয়সজনিত ক্ষয় কীভাবে মেরামত করা যায় এবং মানুষকে আরও দীর্ঘ সময় সুস্থ রাখা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করছেন। এই গবেষণার একটি আলোচিত ধারণার নাম **‘লংজেভিটি এসকেপ ভেলোসিটি’

এই ধারণা অনুযায়ী, একসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন নতুন চিকিৎসা ও পুনরুজ্জীবন প্রযুক্তি মানুষের আয়ু বাড়ানোর পাশাপাশি বয়সজনিত ক্ষতিও ক্রমাগত মেরামত করতে থাকবে। তখন একজন মানুষ এক পর্যায়ের চিকিৎসা নিয়ে যতটা অতিরিক্ত সময় পাবেন, সেই সময়ের মধ্যেই আরও উন্নত চিকিৎসা তৈরি হয়ে যেতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে মানুষ অমর হয়ে যাবে—এমন কোনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ এখন নেই। ২০৫০ সালকে ঘিরে কিছু গবেষক ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা ব্যক্তির পূর্বাভাস রয়েছে, কিন্তু সেগুলো এখনও সম্ভাবনা ও অনুমানের পর্যায়ে।

বার্ধক্য নিয়ে গবেষণায় কয়েকজন বিজ্ঞানী ভবিষ্যতে মানুষের আয়ু নাটকীয়ভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করেন। মার্কিন জেনেটিসিস্ট জর্জ চার্চকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের দিকে ‘লংজেভিটি এসকেপ ভেলোসিটি’র মতো একটি পর্যায়ে পৌঁছানো অসম্ভব বলে তিনি মনে করেন না। অন্যদিকে বার্ধক্য গবেষক অউব্রে দে গ্রে আরও আগের সময়সীমা নিয়ে আশাবাদী পূর্বাভাস দিয়েছেন।

এই ধারণার মূল কথা কিন্তু ‘অমরত্ব’ নয়। বরং লক্ষ্য হলো বার্ধক্যজনিত ক্ষতি এত দ্রুত মেরামত করা, যাতে একজন মানুষের শরীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে না পড়ে।

অর্থাৎ আজকের চিকিৎসায় যেমন কোনও রোগ হলে তার চিকিৎসা করা হয়, ভবিষ্যতের উন্নত প্রযুক্তি হয়তো শরীরে বয়সজনিত ক্ষতি হওয়ার পর তা মেরামত করার পাশাপাশি টিস্যু ও কোষের কার্যক্ষমতাও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।

সহজভাবে বিষয়টি বোঝা যাক।

ধরা যাক, কোনও নতুন চিকিৎসা একজন মানুষের স্বাস্থ্যকর জীবনকাল আরও ১০ বছর বাড়িয়ে দিল। এই অতিরিক্ত ১০ বছরের মধ্যে যদি বিজ্ঞান আরও উন্নত এমন একটি চিকিৎসা তৈরি করতে পারে, যা আবার ১৫ বা ২০ বছর অতিরিক্ত সুস্থ জীবন দিতে সক্ষম, তাহলে আগের চিকিৎসা নেওয়া মানুষটি নতুন প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

এই প্রক্রিয়া যদি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তাহলে বয়স বাড়লেও চিকিৎসাবিজ্ঞান শরীরের ক্ষয়কে ক্রমাগত পুষিয়ে দিতে পারে। এটিই ‘লংজেভিটি এসকেপ ভেলোসিটি’ ধারণার মূল ভাবনা। অউব্রে দে গ্রে দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণার অন্যতম প্রবক্তা।

তবে এটি এখনও একটি ভবিষ্যৎভিত্তিক বৈজ্ঞানিক ধারণা। মানুষের ক্ষেত্রে এটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও প্রমাণিত হয়নি।

বার্ধক্য নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জেনেটিক্স। আমাদের শরীরের কোষ কীভাবে কাজ করবে, কীভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং বিভিন্ন ক্ষতির সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তার সঙ্গে জিনের সম্পর্ক রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন জীবের ওপর গবেষণা করে এমন অনেক জেনেটিক পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন, যেগুলো আয়ু ও বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্রাণীর পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না।

ভবিষ্যতে জিন থেরাপি বা জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বয়সজনিত কিছু ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু মানুষের ‘অমরত্ব’ নিশ্চিত করার মতো কোনও জেনেটিক চিকিৎসা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে নেই।

বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর পুনর্গঠন ক্ষমতা কমতে পারে। স্টেম সেল গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল টিস্যুর পুনর্গঠনে কোষের ব্যবহার নিয়ে সম্ভাবনা খুঁজে দেখা।

একইভাবে জিন থেরাপি নির্দিষ্ট জেনেটিক ত্রুটি বা জৈবিক প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে চিকিৎসার নতুন পথ তৈরি করছে। ভবিষ্যতের বার্ধক্যবিরোধী চিকিৎসায় এই প্রযুক্তিগুলোর ভূমিকা থাকতে পারে বলে গবেষণা চলছে।

কিন্তু স্টেম সেল বা জিন থেরাপি মানেই মানুষ অমর হয়ে যাবে—এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এগুলো অত্যন্ত জটিল গবেষণাক্ষেত্র এবং প্রতিটি প্রযুক্তির কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়।

বার্ধক্য গবেষণায় আরেকটি আলোচিত ক্ষেত্র হলো ন্যানোমেডিসিন। অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাত্রায় তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, কোষের সঙ্গে কাজ করা কিংবা রোগ শনাক্ত করার মতো নানা সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

ভবিষ্যতে ন্যানোপ্রযুক্তি যদি শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্ষতি শনাক্ত ও মেরামতের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘায়ু গবেষণায় তার প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এখানেও একই কথা প্রযোজ্য—সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। গবেষণাগারে সফল কোনও প্রযুক্তি মানুষের শরীরে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক ধাপ পেরোতে হয়।

এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ রয়েছে।

কোনও কোনও ভবিষ্যৎ-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বা গবেষক মনে করেন, আজকের তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যতের এমন চিকিৎসার সুবিধা পেতে পারে, যা তাদের বর্তমান বয়সের তুলনায় অনেক বেশি সময় সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ৪০ বছরের নিচে বয়সি সবাই ২০৫০ সালে পৌঁছালেই অমর হয়ে যাবেন।

বরং যুক্তিটি হলো, যদি আগামী কয়েক দশকে বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চিকিৎসাগত অগ্রগতি ঘটে, তাহলে বর্তমানে জীবিত কিছু মানুষ সেই প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এরপর আরও উন্নত চিকিৎসা তৈরি হলে তাদের জীবনকাল আরও বাড়তে পারে।

এটি একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে খরচ একটি বড় প্রশ্ন। নতুন কোনও জটিল প্রযুক্তি বাজারে আসার শুরুতে সাধারণত গবেষণা, উৎপাদন, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা অবকাঠামোর কারণে খরচ বেশি হতে পারে।

দীর্ঘায়ু প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। যদি ভবিষ্যতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল পুনরুজ্জীবন চিকিৎসা তৈরি হয়, তাহলে শুরুতে তা সীমিত মানুষের নাগালের মধ্যে থাকতে পারে।

তবে প্রযুক্তির দাম সময়ের সঙ্গে কমবে কি না, সেটি এখন নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। একইভাবে ভবিষ্যতে এসব চিকিৎসা সবার জন্য সহজলভ্য হবে কি না, সেটিও নির্ভর করবে প্রযুক্তির সাফল্য, উৎপাদন খরচ, সরকারি নীতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর।

মানুষের আয়ু বাড়ানো আর মানুষকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা এক বিষয় নয়। বিজ্ঞানীদের কাছে তাই ‘হেলথস্প্যান’ বা সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারও জীবন ১০০ বছর পর্যন্ত বাড়লেও যদি দীর্ঘ সময় অসুস্থতা, দুর্বলতা বা অক্ষমতার মধ্যে কাটে, তাহলে সেটিকে কাঙ্ক্ষিত দীর্ঘায়ু বলা কঠিন। তাই আধুনিক বার্ধক্য গবেষণায় বয়সজনিত রোগ ও শারীরিক ক্ষয় কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবেষণায় জেনেটিক ও কোষীয় প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।

মানুষের শরীর অত্যন্ত জটিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে কোষ, টিস্যু, অঙ্গ এবং বিভিন্ন জৈবিক ব্যবস্থায় একসঙ্গে বহু পরিবর্তন ঘটে। শুধু একটি জিন বদলে বা একটি ওষুধ দিয়ে পুরো বার্ধক্য প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া সম্ভব—এমন প্রমাণ নেই।

তার ওপর ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, নিউরোডিজেনারেটিভ রোগসহ অসংখ্য বয়সজনিত সমস্যার সঙ্গে বার্ধক্যের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মানুষকে অনির্দিষ্টকাল সুস্থ রাখার জন্য একসঙ্গে অনেক ধরনের জৈবিক সমস্যা মোকাবিলা করতে হতে পারে।

এই কারণেই ‘অমরত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে বিজ্ঞান মানুষের স্বাভাবিক আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে অনন্ত জীবন দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ধরা যাক, একদিন বিজ্ঞান সত্যিই বার্ধক্যকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলো। তখন প্রশ্ন উঠবে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, সমাজেরও।

মানুষ যদি অনেক বেশি সময় বাঁচে, তাহলে চাকরি, অবসর, বিয়ে, পরিবার, সম্পত্তি, জনসংখ্যা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রজন্মের সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। কে এই চিকিৎসা পাবেন এবং কে পাবেন না, সেটিও হয়ে উঠতে পারে বড় সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্ন।

তবে সেই ভবিষ্যৎ এখনও অনেক দূরের বিষয়।

আজকের বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞানীরা বার্ধক্যকে ধীর করা, বয়সজনিত রোগ কমানো এবং মানুষের সুস্থ জীবনকাল বাড়ানোর নানা পথ নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০৫০ সালকে ঘিরে ‘অমরত্বের’ যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি মূলত সেই গবেষণার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে করা কিছু আশাবাদী পূর্বাভাসের সঙ্গে যুক্ত।

তাই ‘আর ২৫ বছর বাঁচলেই মানুষ অমর হয়ে যাবে’—এটিকে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বলা যায়, আগামী কয়েক দশক বার্ধক্য গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সেই গবেষণা শেষ পর্যন্ত মানুষকে কতটা দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন দিতে পারবে, তার উত্তর দেবে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানই।

তথ্যগত সতর্কতা: মূল লেখার “২০৫০ পর্যন্ত বাঁচলেই অমর হওয়া যাবে” দাবিটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না লিখে সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করেছি। ‘লংজেভিটি এসকেপ ভেলোসিটি’ একটি গবেষণা/ভবিষ্যৎ-প্রযুক্তিভিত্তিক ধারণা; মানুষের অমরত্ব অর্জনের প্রমাণিত চিকিৎসা বর্তমানে নেই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ