সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeমেডিকেল জার্নালকংক্রিটের থেকেও শক্ত মানুষের শরীরের এই হাড়, কোথায় রয়েছে জানেন?

কংক্রিটের থেকেও শক্ত মানুষের শরীরের এই হাড়, কোথায় রয়েছে জানেন?

ফিমারের উপরের প্রান্তটি কোমরের কাছে হিপ জয়েন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে। নিচের প্রান্তটি হাঁটুর জয়েন্টের অংশ গঠন করে। ফলে হিপ থেকে হাঁটু পর্যন্ত পায়ের কাঠামোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এই হাড়।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মানবদেহ বাইরে থেকে যতই নাজুক মনে হোক, শরীরের ভেতরে রয়েছে অসাধারণ শক্তিশালী একটি কাঠামো। প্রতিদিন হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি ভাঙা, ভার তোলা কিংবা শরীরের ওজন বহন—সবকিছুর পেছনে হাড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু জানলে অবাক হতে হয়, মানুষের শরীরের এমন একটি হাড় আছে, যা চাপ সহ্য করার ক্ষমতার দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী।

সেটি হল ফিমার বা উরুর হাড়। এটি শুধু মানবদেহের সবচেয়ে লম্বা হাড় নয়, শরীরের সবচেয়ে শক্তিশালী হাড় হিসেবেও পরিচিত। পায়ের উপরের অংশে অবস্থিত এই হাড় শরীরের ওজন বহন এবং হাঁটা-চলার সময় তৈরি হওয়া বিপুল চাপ সামলাতে সাহায্য করে।

তবে ফিমারকে সরাসরি ‘কংক্রিটের চেয়ে চার গুণ শক্ত’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে কিছুটা সরলীকরণ। হাড়ের শক্তি নির্ভর করে কী ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, হাড়ের ঘনত্ব, বয়স, স্বাস্থ্য এবং পরিমাপের পদ্ধতির ওপর। তাই বিভিন্ন উপাদানের শক্তি তুলনা করার সময় নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি বিবেচনা করা জরুরি।

মানুষের উরুর অংশে যে লম্বা হাড়টি রয়েছে, সেটিই ফিমার। এটি শরীরের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ হাড়।

ফিমারের উপরের প্রান্তটি কোমরের কাছে হিপ জয়েন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে। নিচের প্রান্তটি হাঁটুর জয়েন্টের অংশ গঠন করে। ফলে হিপ থেকে হাঁটু পর্যন্ত পায়ের কাঠামোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এই হাড়।

হাঁটার সময় শরীরের ওজনের বড় অংশ ফিমারের ওপর দিয়ে যায়। দৌড়ানো বা লাফানোর সময় চাপ আরও বাড়তে পারে। সেই কারণেই ফিমারের গঠন এমনভাবে তৈরি যে এটি বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক চাপ সহ্য করতে পারে।

ফিমারের শক্তির পেছনে রয়েছে এর বিশেষ গঠন। হাড়কে বাইরে থেকে শক্ত ও একটানা বস্তু মনে হলেও বাস্তবে এর ভেতরে রয়েছে জটিল জৈব কাঠামো।

হাড়ের বাইরের অংশ তুলনামূলকভাবে ঘন ও শক্ত। এর নাম কমপ্যাক্ট বোন। ভেতরের দিকে রয়েছে তুলনামূলক হালকা ও জালিকার মতো অংশ, যাকে স্পঞ্জি বা ট্রাবেকুলার বোন বলা হয়।

এই দুই ধরনের কাঠামো একসঙ্গে হাড়কে শক্তি ও কিছুটা নমনীয়তা দেয়। ফলে হাড় শুধু চাপ সহ্য করে না, বিভিন্ন দিক থেকে আসা বলের বিরুদ্ধেও নিজেকে সামলে রাখতে পারে।

পূর্ণবয়স্ক মানুষের কঙ্কালে সাধারণভাবে ২০৬টি হাড় থাকে। অবশ্য ব্যক্তিভেদে কিছু ছোট হাড়ের সংযুক্তি বা শারীরিক বৈচিত্র্যের কারণে সংখ্যা নিয়ে সামান্য পার্থক্য দেখা যেতে পারে।

এই বিপুল সংখ্যক হাড় একসঙ্গে শরীরের কঙ্কাল তৈরি করে। কঙ্কাল আমাদের শরীরকে আকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে সুরক্ষা দেয় এবং পেশির সঙ্গে মিলিত হয়ে চলাফেরায় সাহায্য করে।

এই ২০৬টি হাড়ের মধ্যে ফিমারের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শরীরের সবচেয়ে বড় হাড় এবং দৈনন্দিন চলাফেরায় প্রচুর যান্ত্রিক চাপ বহন করে।

‘ফিমার কংক্রিটের চেয়েও শক্ত’—এই কথাটি শুনলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, সত্যিই কি জীবন্ত হাড় নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কংক্রিটের চেয়ে শক্ত?

এখানে ‘শক্ত’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। পদার্থবিজ্ঞানে শক্তি মাপার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কোনও বস্তু চাপ সহ্য করতে কতটা সক্ষম, টান সহ্য করতে কতটা সক্ষম, ভাঙতে কত শক্তি প্রয়োজন—এসব আলাদা বৈশিষ্ট্য।

হাড়ের শক্তি নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, এর কম্প্রেসিভ স্ট্রেংথ বা চাপ সহ্য করার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। মানুষের হাড়ের শক্তি তার ওজনের তুলনায় বিশেষভাবে কার্যকর। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে হালকা একটি জৈব কাঠামো হয়েও হাড় যথেষ্ট পরিমাণ চাপ সামলাতে পারে।

তাই জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক লেখায় হাড়কে কংক্রিটের সঙ্গে তুলনা করা হলেও সেটিকে একটি সরল উপমা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। সব ধরনের কংক্রিট এবং সব ধরনের হাড়ের শক্তি এক মাপকাঠিতে তুলনা করা যায় না।

আমরা প্রতিদিন যে কাজগুলো স্বাভাবিকভাবে করি, তার পেছনে ফিমারের বড় ভূমিকা রয়েছে। হাঁটার সময় এক পা সামনে এগিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা—সবকিছুতেই উরুর হাড় ও আশপাশের পেশি একসঙ্গে কাজ করে।

দৌড়ানোর সময় শরীরে তৈরি হওয়া বল আরও বেশি হয়। লাফ দিলে মাটিতে অবতরণের সময় শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফিমার এবং অন্যান্য হাড়, জয়েন্ট, পেশি ও লিগামেন্ট সেই চাপ ভাগ করে নেয়।

এই কারণে ফিমারের শক্তি শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয়। আমাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক চলাফেরার জন্য এর গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফিমার অত্যন্ত শক্ত হলেও এটি অজেয় নয়। প্রচণ্ড আঘাত, সড়ক দুর্ঘটনা, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনও গুরুতর ট্রমার কারণে ফিমার ভেঙে যেতে পারে।

ফিমার ফ্র্যাকচারকে সাধারণত গুরুতর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এই হাড়ের আশপাশে বড় রক্তনালি ও গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু রয়েছে। গুরুতর ফ্র্যাকচারের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ভর করে ফ্র্যাকচারের ধরন, অবস্থান, রোগীর বয়স এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্লেট, স্ক্রু বা অন্য ধরনের ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করে হাড় স্থির করা হয়।

অনেকেই মনে করেন হাড় হল শরীরের একটি শক্ত, নিষ্ক্রিয় কাঠামো। কিন্তু বাস্তবে হাড় জীবন্ত টিস্যু। এর ভেতরে রক্তনালি, কোষ এবং অস্থিমজ্জা রয়েছে।

হাড় নিয়মিতভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করে। পুরনো হাড়ের টিস্যু ভাঙে এবং নতুন টিস্যু তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াকে বোন রিমডেলিং বলা হয়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে বয়সজনিত হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে হাড় তুলনামূলকভাবে ভঙ্গুর হয়ে উঠতে পারে। তাই ফিমার শক্তিশালী হলেও বয়স, পুষ্টি, শারীরিক কার্যকলাপ এবং বিভিন্ন রোগের প্রভাব হাড়ের স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

হাড়ের সুস্থতার সঙ্গে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-র সম্পর্ক রয়েছে। ক্যালসিয়াম হাড়ের গঠনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। অন্যদিকে ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে শুধু ক্যালসিয়াম খেলেই হাড় সবসময় শক্ত থাকবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বয়স, হরমোন, শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণও হাড়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

নিয়মিত ওজন বহনকারী ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখার অংশ হতে পারে।

ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গের কাহিনি অত্যন্ত পরিচিত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীমের সঙ্গে গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের উরুতে আঘাত লাগে এবং তিনি গুরুতরভাবে আহত হন।

‘ঊরুভঙ্গ’ শব্দটি শুনলে আধুনিক শারীরবিদ্যার দৃষ্টিতে ফিমারের কথাও মনে হতে পারে। তবে মহাকাব্যের বর্ণনাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষাগারভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। এটি মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রসঙ্গ।

মানবদেহের শক্তি শুধু ফিমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাড়, পেশি, টেন্ডন, লিগামেন্ট এবং জয়েন্ট—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে শরীরকে চলাফেরার উপযোগী করে তোলে।

ফিমার সেই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শরীরের ওজন বহন করা থেকে শুরু করে হাঁটা, দৌড়ানো ও লাফানোর মতো কাজের সময় এটি প্রচুর যান্ত্রিক চাপ সামলায়।

তাই ‘কংক্রিটের থেকেও শক্ত হাড়’ কথাটি শুনতে যতই অবাক লাগুক, এর পেছনে রয়েছে হাড়ের অসাধারণ জৈবিক গঠন। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে বিষয়টি বোঝার সময় ‘শক্ত’ শব্দটির সুনির্দিষ্ট অর্থ এবং তুলনার মাপকাঠি বিবেচনা করা জরুরি।

মানবদেহ তাই বাইরে থেকে নাজুক মনে হলেও ভেতরে তৈরি হয়েছে অত্যন্ত দক্ষ এক প্রাকৃতিক কাঠামো দিয়ে। আর সেই কাঠামোর অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হল আমাদের উরুর ফিমার হাড়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ