এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : শাড়ি শুধু একটি পোশাক নয়। ভারতীয় উপমহাদেশের নারীদের কাছে এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়েরও অংশ। উৎসব থেকে বিয়ে, পুজো থেকে নানা সামাজিক অনুষ্ঠান—শাড়ির উপস্থিতি বহু প্রজন্ম ধরে স্বাভাবিক। প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে অনেকে নিয়মিত শাড়ি না পরলেও এই পোশাকের প্রতি ভালোবাসা কমেনি।
কিন্তু এই পরিচিত পোশাককে ঘিরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি বিরল সমস্যার কথা উঠে এসেছে, যা অনেকেরই অজানা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সারি ক্যানসার’ বা আরও নির্দিষ্টভাবে ‘পেটিকোট ক্যানসার’।
তবে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। শাড়ি পরলেই ক্যানসার হয়—এমন কোনো প্রমাণ নেই। চিকিৎসকদের আলোচনার বিষয় হলো দীর্ঘদিন ধরে কোমরে অত্যন্ত শক্ত করে পেটিকোটের দড়ি বাঁধার ফলে ত্বকে তৈরি হওয়া বারবারের ঘর্ষণ, চাপ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। বিরল কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এই ক্ষত ত্বকের ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
শাড়ি সাধারণত পেটিকোটের ওপর পরা হয়। পেটিকোট কোমরে ধরে রাখার জন্য অনেক সময় দড়ি বা ‘নাড়া’ ব্যবহার করা হয়। শাড়ি যাতে ভালোভাবে বসে থাকে, সেজন্য কেউ কেউ এই দড়ি বেশ শক্ত করে বেঁধে রাখেন।
সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গায় অত্যন্ত শক্ত করে দড়ি বাঁধা হয়।
কোমরের ত্বকে তখন ক্রমাগত চাপ পড়তে থাকে। একই সঙ্গে দড়ি ও ত্বকের মধ্যে ঘর্ষণ হয়। গরম ও আর্দ্র পরিবেশে ঘাম জমে গেলে ত্বকের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ত্বকে চুলকানি, রং বদলে যাওয়া, খসখসে ভাব, মোটা হয়ে যাওয়া বা ক্ষত তৈরি হতে পারে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব সমস্যা ক্যানসারে পরিণত হয় না। কিন্তু বিরল ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত ও প্রদাহের জায়গায় স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা (SCC) নামে এক ধরনের ত্বকের ক্যানসার তৈরি হতে পারে। ২০২৪ সালের BMJ Case Reports-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমন দুইটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।
কোমরের এই ধরনের ত্বকের ক্যানসারকে আগে থেকেই চিকিৎসা সাহিত্যে ‘সারি ক্যানসার’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন শক্ত করে শাড়ি বা পেটিকোট পরার সঙ্গে কোমরের ত্বকে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সম্পর্ক লক্ষ্য করা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিবেদনে গবেষকেরা ‘পেটিকোট ক্যানসার’ শব্দটিকে বেশি নির্দিষ্ট বলে মনে করেছেন। কারণ তাঁদের মতে, সমস্যার প্রধান কারণ শাড়ির কাপড় নয়; বরং কোমরে শক্ত করে বাঁধা পেটিকোটের দড়ি।
অর্থাৎ, ‘শাড়ি ক্যানসার’ কথাটি শুনে শাড়িকে সরাসরি ক্যানসারের কারণ মনে করা ঠিক হবে না।
২০২৪ সালে BMJ Case Reports-এ প্রকাশিত গবেষণাটি করেছিলেন ভারতের জওহরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজ, ওয়ার্ধা এবং মধুবনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। তাঁরা দুই নারীর ক্ষেত্রে কোমরের দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের ক্ষত থেকে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা শনাক্ত হওয়ার কথা জানান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি রোগীর বয়স ছিল ৭০ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কোমরে শক্তভাবে শাড়ি পরতেন। প্রথম দিকে তাঁর কোমরের ত্বকে রং হালকা হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা যায়। পরে সেই জায়গায় ক্ষত তৈরি হয় এবং ক্ষতটি দীর্ঘদিনেও ভালো হয়নি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা সেখানে ত্বকের ক্যানসার শনাক্ত করেন।
এখানে বয়সের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অভ্যাসটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বছরের পর বছর একই জায়গায় চাপ ও ঘর্ষণ চলতে থাকায় ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই ধরনের সমস্যা হঠাৎ করে ক্যানসার হিসেবে দেখা দেয় না। তার আগে ত্বকে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
কোমরের নির্দিষ্ট অংশে রং বদলে যাওয়া, সাদা বা কালচে দাগ, ত্বক মোটা বা খসখসে হয়ে যাওয়া, চুলকানি কিংবা বারবার জ্বালা করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিনের ঘর্ষণের কারণে ত্বকে ক্ষতও তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসাবিষয়ক রিপোর্টে এমন ত্বকের সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী ঘর্ষণজনিত ডার্মাটাইটিস বা অন্যান্য চর্মরোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হলো কোনও ক্ষত বা আলসার দীর্ঘদিনেও না শুকানো।
কোমরের এমন কোনও ক্ষত যদি সাধারণ চিকিৎসায় সেরে না ওঠে, বারবার রক্ত বা তরল বের হয়, আকার বাড়তে থাকে কিংবা ত্বকের চেহারা দ্রুত বদলে যায়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মানুষের ত্বক প্রতিনিয়ত নিজেকে মেরামত করে। ত্বকের কোনও অংশ বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হলে সেখানে ক্ষত সারানো এবং নতুন কোষ তৈরির প্রক্রিয়া বারবার চলতে থাকে।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও ক্ষত নিরাময়ের এই পরিবেশ খুব বিরল ক্ষেত্রে কোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থেকে তৈরি হওয়া স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমাকে অনেক সময় Marjolin ulcer-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলা হয়।
তবে এটিও মনে রাখা দরকার, শরীরের কোনও ক্ষত বা ঘর্ষণ হলেই তা ক্যানসারে পরিণত হবে—এমন নয়। ‘পেটিকোট ক্যানসার’ অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।
হ্যাঁ। ‘সারি ক্যানসার’ নিয়ে এর আগেও চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
২০২০ সালে প্রকাশিত একটি কেস রিপোর্টে ৬৮ বছর বয়সী এক নারীর কোমরের কাছে দীর্ঘদিনের ক্ষত থেকে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা শনাক্ত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করা হয়। ওই ক্ষতটি ছিল সেই জায়গায়, যেখানে পেটিকোটের দড়ি বাঁধা হতো।
এরও আগে প্রকাশিত গবেষণাগুলোতে একই ধরনের কোমরের ত্বকের পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ঘর্ষণ এবং বিরল ক্ষেত্রে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, বিষয়টি একেবারে নতুন কোনও রোগ নয়। বরং নতুন করে ‘পেটিকোট ক্যানসার’ শব্দটি ব্যবহার করে এর সম্ভাব্য কারণটিকে আরও নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
না। চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কোনও কারণ নেই যে শাড়ি পরা বন্ধ করতে হবে।
বরং বিষয়টি হলো কোমরে অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া। পেটিকোটের দড়ি খুব শক্ত করে বাঁধার পরিবর্তে কিছুটা ঢিলেঢালা রাখা যেতে পারে। দড়ির বদলে তুলনামূলক চওড়া কোমরবন্ধ ব্যবহার করলে একই জায়গায় চাপ কম কেন্দ্রীভূত হতে পারে। একই জায়গায় প্রতিদিন দীর্ঘ সময় চাপ পড়া এড়ানোও উপকারী হতে পারে।
শাড়ি পরার সময় কোমরের ত্বকে অস্বস্তি, ঘষা লাগা বা ব্যথা হলে সেটিকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
কোমরের ত্বকে সামান্য রং পরিবর্তন বা চুলকানি হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কোনও পরিবর্তন যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে ক্ষত যদি শুকাতে না চায়, বারবার রক্তপাত বা তরল বের হয়, ব্যথা বা দুর্গন্ধ দেখা দেয়, ক্ষত বড় হতে থাকে কিংবা তার চারপাশের ত্বক অস্বাভাবিকভাবে শক্ত বা মোটা হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
কারণ ত্বকের ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য শুধু বাইরে থেকে ক্ষত দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পরীক্ষা এবং বায়োপসি করতে পারেন। ক্যানসার আছে কি না নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বায়োপসি গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনা আসলে শাড়িকে ভয় পাওয়ার গল্প নয়। বরং এটি দীর্ঘদিন একই জায়গায় ত্বকের ওপর অতিরিক্ত চাপ ও ঘর্ষণ চলতে থাকলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তার একটি বিরল উদাহরণ।
চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় শক্ত করে বাঁধা পেটিকোটের দড়ির সঙ্গে কোমরের দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের ক্ষতি এবং বিরল ক্ষেত্রে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে হাতে থাকা প্রমাণ মূলত বিরল কেস রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে। তাই ‘শাড়ি পরলেই ক্যানসার হয়’—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
সবচেয়ে সহজ সতর্কতা হলো, কোমরে পেটিকোটের দড়ি অতিরিক্ত শক্ত করে না বাঁধা এবং ত্বকে দীর্ঘদিনের কোনও পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা না করা।
শাড়ি থাকবে, ঐতিহ্যও থাকবে। শুধু পোশাক পরার সময় শরীরের আরাম এবং ত্বকের স্বাস্থ্যের দিকটিও একটু খেয়াল রাখা জরুরি।



