এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ভারতের এক প্রান্তে অতিবৃষ্টিতে জলমগ্ন জমি, অন্য প্রান্তে আবার বৃষ্টির অভাবে খরার পরিস্থিতি। আবহাওয়ার এই চরম বৈপরীত্যের প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়েছে কৃষিক্ষেত্রে। এবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আগামী রবিশস্যের মরসুম নিয়েও। কৃষি মন্ত্রকের বক্তব্য, এল নিনোর প্রভাবে চলতি বছরের বাকি সময়েও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষাবাদ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বৃষ্টিনির্ভর কৃষি অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অক্টোবর থেকেই শুরু হবে গম, সরষে, ডাল ও বিভিন্ন তৈলবীজের মতো রবিশস্য চাষের প্রস্তুতি। কিন্তু সেই সময়েও আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা কৃষকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি মন্ত্রকের সচিব অতীশ চন্দ্র।
চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বৃষ্টির চিত্র একেবারেই একরকম নয়। কোথাও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও বৃষ্টির ঘাটতিতে তৈরি হয়েছে খরার পরিস্থিতি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষিজমিতে।
মহারাষ্ট্রের পরিস্থিতিই তার বড় উদাহরণ। রাজ্যের মোট ৩৫৮টি তহসিলের মধ্যে ২৬৫টিকে খরাকবলিত ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তহসিলেই বৃষ্টির ঘাটতি কৃষিকাজে প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশে টানা প্রবল বৃষ্টিতে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। অতিবৃষ্টিতে প্রাণহানি, বাড়িঘর ধস এবং জলমগ্নতার পাশাপাশি কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশের কৃষিক্ষেত্রে একই সময়ে দুই বিপরীত আবহাওয়ার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
খারিফ মরসুমের পর অক্টোবর থেকে শুরু হয় রবিশস্য চাষের প্রস্তুতি। এই সময় গম, সরষে, ডাল এবং বিভিন্ন তৈলবীজের মতো ফসলের বীজ বোনা হয়। কিন্তু এ বার সেই চাষের শুরুতেই আবহাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা কৃষি মন্ত্রকের।
কৃষি মন্ত্রকের সচিব অতীশ চন্দ্র জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টির কারণে কিছু রাজ্যে রবিশস্যের মরসুম শুরু হওয়ার সময়ও মাটি অতিরিক্ত ভেজা থাকতে পারে। আবার যেসব এলাকায় খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত আর্দ্রতার অভাবে বীজ বোনা এবং ফসলের প্রাথমিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
অর্থাৎ একদিকে অতিরিক্ত জল, অন্যদিকে জলের অভাব—দুই পরিস্থিতিই রবিশস্য চাষের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কৃষি মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, এবারের চ্যালেঞ্জ শুধু রবিশস্যের বীজ বোনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। ফসল বোনার পর সেটিকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়াও কঠিন হতে পারে।
যেসব অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হয়েছে, সেখানে জমিতে অতিরিক্ত জল থাকলে ফসলের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার খরাপ্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত জল না থাকলে বীজ অঙ্কুরোদ্গম এবং গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
ফলে প্রচলিত কৃষি কৌশলের পাশাপাশি স্থানীয় আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
রবিশস্যের প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত একটি সম্মেলনে কৃষি মন্ত্রকের সচিব এই সম্ভাব্য সমস্যাগুলির কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আসন্ন কৃষি মরসুমে দেশের বেশ কিছু এলাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে যে সমস্ত অঞ্চলে কৃষিকাজ মূলত বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল, সেখানে ঝুঁকি বেশি। বৃষ্টির সময়, পরিমাণ এবং বণ্টনে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে কৃষকের পক্ষে আগে থেকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী কৃষি কৌশল পরিবর্তনের উপর জোর দিয়েছেন তিনি। কোন এলাকায় কখন বীজ বোনা হবে, কোন ফসল বেছে নেওয়া হবে এবং কতটা জল ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয় স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঠিক করার প্রয়োজন হতে পারে।
কৃষি মন্ত্রকের সচিবের বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তাঁর মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতের কোনও দূরবর্তী সমস্যা নয়। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই কৃষিক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে।
আবহাওয়ার ধরনে অনিশ্চয়তা বাড়লে কৃষির উপর তার প্রভাব সরাসরি পড়ে। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা কিংবা বৃষ্টির সময়ের পরিবর্তন—সবকিছুর সঙ্গেই কৃষিকে মানিয়ে নিতে হয়।
বিশেষ করে বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের প্রভাব বেশি হতে পারে। কারণ সেখানে সেচের বিকল্প ব্যবস্থা সবসময় পর্যাপ্ত থাকে না।
দেশে দানাশস্যের উৎপাদন এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক ক্ষেত্রে আমদানির উপর নির্ভর করতে হয় না। তবে ডাল ও তৈলবীজের ক্ষেত্রে এখনও আমদানির প্রয়োজন হয়।
এল নিনোর প্রভাবে এই ফসলগুলির উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শুধু কৃষকের আয় নয়, দেশের খাদ্য সরবরাহ এবং কৃষিপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন বাড়ানো তাই কৃষির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। কিন্তু আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা সেই লক্ষ্য পূরণে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
ভারতে মোট প্রায় **৬৩৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে রবিশস্য চাষ** করা হয়। এর মধ্যে গমের চাষ হয় প্রায় ৩০০ লক্ষ হেক্টর জমিতে। ডাল চাষের আওতায় রয়েছে প্রায় ১৪০ লক্ষ হেক্টর জমি। আর প্রায় ৮৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের তৈলবীজ উৎপাদন করা হয়।
এই বিপুল কৃষিজমির উপর দেশের খাদ্য ও কৃষি অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল। তাই আবহাওয়ার বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে।
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের একটি পর্যায়ক্রমিক জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণ পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া বায়ু উষ্ণ সমুদ্রের জলকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
কিন্তু এল নিনোর সময় এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তখন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জমা থাকা উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ফিরে আসে। এর ফলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়।
এই সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতার পরিবর্তন শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের নানা অঞ্চলের আবহাওয়াতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও আবার শুষ্কতা দেখা দিতে পারে।
‘এল নিনো’ একটি স্প্যানিশ শব্দ। এর অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। বহু বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের মৎস্যজীবীরা নির্দিষ্ট সময়ে সমুদ্রের জলের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা ও স্রোতের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই ঘটনাটির সঙ্গে ‘এল নিনো’ নামটি যুক্ত হয়।
আজ এল নিনো শুধু সমুদ্রবিজ্ঞানের বিষয় নয়। বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া, কৃষি, জলসম্পদ এবং খাদ্য উৎপাদনের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নিয়মিত গবেষণা হয়।
এবার ভারতের কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বরং কোথায় কখন কতটা বৃষ্টি হবে, সেটিও। এক এলাকায় অতিবৃষ্টি আর অন্য এলাকায় খরা হলে একই কৃষি পরিকল্পনা গোটা দেশের জন্য কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রবিশস্যের মরসুম সামনে আসতেই তাই আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর বাড়ছে। কৃষি মন্ত্রকের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অঞ্চলভেদে কৃষি কৌশল বদলানো এবং জল ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৃষ্টির অনিয়ম—এই তিনটি বিষয় আগামী কৃষি মরসুমে ভারতের ফসল উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর থাকবে, অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া রবিশস্যের মরসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত কৃষকদের কতটা স্বস্তি দেয়।



