এনবি সংবাদ, অনলাইন : প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশিতে সামান্য উষ্ণতা বৃদ্ধি—শুনতে বিষয়টি যতটা সাধারণ, এর প্রভাব ততটাই বিস্তৃত। এল নিনো এমন একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া, যার প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৃষ্টি, তাপমাত্রা, খরা, কৃষি ও সামুদ্রিক পরিবেশে পড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রভাব থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়।
সহজ করে বললে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে এবং তার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের নির্দিষ্ট পরিবর্তন যুক্ত হলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এটি একদিকে যেমন অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াতে পারে, অন্যদিকে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে খরা বা তাপপ্রবাহের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। এল নিনো মানেই বাংলাদেশের আবহাওয়া খারাপ হবে—এমন সরল সমীকরণ নেই। বাংলাদেশের আবহাওয়া নির্ধারণে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, মৌসুমি বায়ু, স্থানীয় নিম্নচাপ এবং আরও অনেক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে।
এল নিনো হল নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহৎ সমুদ্র-বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা।
এই ঘটনাকে বৃহত্তর ENSO বা El Niño-Southern Oscillation ব্যবস্থার উষ্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। ENSO-র অন্য প্রধান পর্যায় হল লা নিনা, যেখানে একই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়।
এল নিনোর প্রভাব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সমুদ্রের তাপমাত্রা বদলে গেলে বাতাসের চলাচল, বায়ুচাপ, মেঘ তৈরি এবং বৃষ্টিপাতের অবস্থানেও পরিবর্তন আসতে পারে। সেই পরিবর্তন টেলিকানেকশন বা দূরবর্তী অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপর প্রভাবের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়।
‘El Niño’ স্প্যানিশ শব্দ। এর অর্থ ‘ছোট ছেলে’ বা ‘শিশু’। দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের জেলেরা বহু আগে থেকেই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণতা লক্ষ্য করতেন।
এই উষ্ণতা অনেক সময় বড়দিনের কাছাকাছি সময়ে স্পষ্ট হওয়ায় এর সঙ্গে ‘শিশু যিশু’-র সম্পর্ক তৈরি হয়। সেখান থেকেই ‘El Niño’ নামটির প্রচলন।
বর্তমানে এটি আবহাওয়া ও জলবায়ুবিজ্ঞানের একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ।
এল নিনো বোঝার জন্য প্রথমে স্বাভাবিক অবস্থার প্রশান্ত মহাসাগরকে বুঝতে হবে।
সাধারণ পরিস্থিতিতে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বাণিজ্য বায়ু বা Trade Winds প্রবাহিত হয়। এই বাতাস সমুদ্রের ওপরের উষ্ণ জলকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঠেলে দেয়।
ফলে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি এলাকায় উষ্ণ জল বেশি জমা হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের কাছে গভীর সমুদ্র থেকে ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জল উপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় Upwelling।
এল নিনোর সময় এই স্বাভাবিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে গেলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জমে থাকা উষ্ণ জল পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। একই সময়ে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে গভীর ঠান্ডা জলের ওপরে ওঠার প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে যায়।
ফলে সমুদ্রের উপরিভাগ আরও উষ্ণ হয়ে ওঠে।
সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
উষ্ণ সমুদ্রের জল থেকে বেশি পরিমাণে বাষ্পীভবন হতে পারে। সেই জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলে উঠে মেঘ ও বৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু উষ্ণ জল কোথায় অবস্থান করছে, তার ওপর নির্ভর করে সেই বৃষ্টি কোন অঞ্চলে বেশি হবে।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতার অবস্থান বদলে যায়। ফলে মেঘ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক অঞ্চলও স্থান পরিবর্তন করতে পারে।
এই কারণেই প্রশান্ত মহাসাগরে শুরু হওয়া একটি পরিবর্তনের প্রভাব হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও অনুভূত হতে পারে।
এল নিনো ও লা নিনা একই বৃহৎ ENSO ব্যবস্থার দুটি বিপরীত পর্যায়।
এল নিনোর সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের জল তুলনামূলক উষ্ণ হয়।
লা নিনার সময় ওই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের জল তুলনামূলক ঠান্ডা হয় এবং বাণিজ্য বায়ু সাধারণত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
দুই পরিস্থিতির প্রভাবও অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত ধরনের হতে পারে। তবে পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে এল নিনো বা লা নিনার প্রভাব একইভাবে দেখা যায় না।
এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে সরাসরি অনুভূত হয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। তবে এর প্রভাব বৈশ্বিক।
দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে শুষ্কতা ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
অর্থাৎ এল নিনোর কোনও একক ‘বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া’ নেই। এর প্রভাব অঞ্চলভেদে আলাদা।
এল নিনোর সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
এর অন্যতম কারণ হল উষ্ণ সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ তাপ স্থানান্তরিত হওয়া। শক্তিশালী এল নিনোর সময়ে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি বা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
এল নিনো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ নয়। মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। এল নিনো তার ওপর একটি প্রাকৃতিক উষ্ণতার ওঠানামা যোগ করে।
এই কারণেই এল নিনোর বছরগুলোতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা সাময়িকভাবে আরও বেশি হতে পারে।
এল নিনোর সময় যেখানে উষ্ণ সমুদ্রের জল অবস্থান করে, সেখানে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা ও মেঘের কার্যকলাপ বাড়তে পারে।
ফলে কিছু অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কিন্তু একই সময়ে পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ এল নিনো একই সময়ে পৃথিবীর এক অংশে অতিবৃষ্টি এবং অন্য অংশে খরা তৈরি করতে পারে।
এল নিনোর অন্যতম পরিচিত প্রভাব হল কিছু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া।
অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে এল নিনোর সময় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
কম বৃষ্টির সঙ্গে বেশি তাপমাত্রা যুক্ত হলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। নদী, জলাধার ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
কৃষির ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের কারণ।
কৃষির জন্য আবহাওয়ার সময়মতো পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বীজ বোনা, চারা রোপণ, ফুল আসা এবং ফসল কাটার সময় যদি বৃষ্টিপাত বা তাপমাত্রার স্বাভাবিক ছক বদলে যায়, তাহলে উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।
খরা হলে সেচের প্রয়োজন বাড়ে। অতিবৃষ্টি হলে জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। আবার অস্বাভাবিক গরমে কিছু ফসল তাপজনিত চাপে পড়তে পারে।
তাই এল নিনোর প্রভাব নিয়ে কৃষি পরিকল্পনা করতে হলে শুধু ‘বৃষ্টি বাড়বে না কমবে’—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। কোন সময়ে কতটা বৃষ্টি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল।
কারণ বাংলাদেশের আবহাওয়া মূলত দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি, বায়ুচাপের পার্থক্য এবং স্থানীয় আবহাওয়া ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
এল নিনো দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বৃষ্টির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে অনেক এল নিনো বছরের সঙ্গে ভারতীয় বর্ষার দুর্বলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে প্রতিটি এল নিনো বছরে বাংলাদেশে কম বৃষ্টি হবেই—এমন কথা বলা যায় না।
কারণ একটি অঞ্চলের আবহাওয়া একাধিক জলবায়ু প্রক্রিয়ার ফল।
এল নিনোর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষার দুর্বলতার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে।
যদি মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়, তাহলে দেশের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে কৃষি ও পানিসম্পদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে এল নিনো থাকলেই বর্ষা দুর্বল হবে—এমন সরল নিয়ম নেই। ভারত মহাসাগরের ডাইপোল বা IOD, বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিও ফলাফল বদলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি বর্ষার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
আমন ধানের মৌসুমে বৃষ্টির ঘাটতি হলে সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত গরম বা দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা জমির আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে।
রবি মৌসুমেও তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা গম, সরষে ও অন্যান্য ফসলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট ফসলের উৎপাদন কতটা কমবে বা বাড়বে, তা শুধু এল নিনো দেখে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এল নিনোর বৈশ্বিক উষ্ণতাবর্ধক প্রভাব বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশেও তাপমাত্রার পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট শহরে কত ডিগ্রি তাপমাত্রা হবে, তা এল নিনো দিয়ে সরাসরি বলা যায় না।
স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, মেঘের উপস্থিতি এবং স্থলভাগের পরিস্থিতিও তাপমাত্রা নির্ধারণ করে।
তাই এল নিনোকে সম্ভাব্য একটি প্রভাবক হিসেবে দেখা উচিত, একমাত্র কারণ হিসেবে নয়।
কম বৃষ্টিপাত হলে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি ও সেচের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বর্ষায় কোনও সময়ে অতিবৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই দুই বিপরীত পরিস্থিতির জন্যই আগাম জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
এল নিনোর সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রভাবগুলোর একটি দেখা যায় সামুদ্রিক পরিবেশে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বদলালে মাছের খাদ্য ও বিচরণের এলাকা বদলাতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর সময় গভীর সমুদ্র থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ ঠান্ডা জল ওপরে ওঠার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রে অবশ্য বঙ্গোপসাগরের নিজস্ব পরিবেশ, নদীর প্রবাহ, সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য স্থানীয় কারণ গুরুত্বপূর্ণ।
এল নিনো বিভিন্ন মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির পরিবেশে পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট এল নিনো থাকলেই ঘূর্ণিঝড় বাড়বে বা কমবে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুর উল্লম্ব শিয়ার, মৌসুমি বায়ু ও অন্যান্য স্থানীয় পরিস্থিতি ঘূর্ণিঝড়ের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এখানে বিষয়টি একটু সূক্ষ্ম।
এল নিনো নিজে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র।
কিন্তু পৃথিবী এখন শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক উষ্ণ। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা একটি উষ্ণ পৃথিবীতে আরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রার ভিত্তিই যখন বেশি, তখন তার ওপর এল নিনোর উষ্ণতা যোগ হলে চরম গরমের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, বাতাসের গতি, বায়ুচাপ, মেঘ এবং বৃষ্টিপাতের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
স্যাটেলাইট, সমুদ্রবয়া, আবহাওয়া স্টেশন ও কম্পিউটার মডেল—সব মিলিয়ে এল নিনোর অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা হয়।
বিশেষ করে Niño 3.4 অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ENSO পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
না।
আধুনিক বিজ্ঞান এল নিনো সম্পর্কে কয়েক মাস আগে থেকে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস দিতে পারে। কিন্তু এর শক্তি, সর্বোচ্চ পর্যায় এবং নির্দিষ্ট দেশের ওপর প্রভাব সবসময় নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব হয় না।
কারণ সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল।
এ ছাড়া একটি এল নিনোর প্রভাব অন্য একটি জলবায়ু সূচকের কারণে আরও শক্তিশালী বা দুর্বল হতে পারে।
সংবাদমাধ্যমে ‘সুপার এল নিনো’ শব্দটি প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
তবে এটি কোনও সর্বজনস্বীকৃত আনুষ্ঠানিক শ্রেণি নয়।
তাই কোনও প্রতিবেদনে ‘সুপার এল নিনো’ শব্দটি দেখলে সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক সংস্থা কী মাত্রার এল নিনোর কথা বলছে, সেটি দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
এল নিনো অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার মতো বিষয়। কারণ এর প্রভাব কৃষি, খাদ্য, জলসম্পদ ও স্বাস্থ্যে পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু এল নিনো মানেই বিশ্বজুড়ে বিপর্যয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
একটি শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবও পৃথিবীর সব অঞ্চলে একরকম হয় না।
তাই আতঙ্কের বদলে আগাম পূর্বাভাস, স্থানীয় আবহাওয়ার তথ্য এবং প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি কার্যকর।
এল নিনোর খবর শুনে আলাদা কোনও জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের এলাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাপপ্রবাহের সতর্কতা থাকলে পর্যাপ্ত পানি পান করা, দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে অপ্রয়োজনে বাইরে না থাকা এবং শিশু ও বয়স্কদের দিকে বিশেষ নজর রাখা উচিত।
অতিরিক্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে জলাবদ্ধতা, বন্যা বা বজ্রপাতের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।
কৃষকদের জন্য স্থানীয় কৃষি ও আবহাওয়া বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক সমুদ্র-বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা, যার প্রভাব পৃথিবীর বহু দূরের আবহাওয়াতেও পৌঁছাতে পারে।
এর কারণে কোথাও বৃষ্টি বাড়তে পারে, কোথাও খরা দেখা দিতে পারে। কোথাও তাপমাত্রা বাড়তে পারে, আবার কোথাও ঝড়ের পরিবেশ বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব মূলত বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু ও অন্যান্য জলবায়ু ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। তাই এল নিনোকে বাংলাদেশের আবহাওয়ার একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও বর্তমান পৃথিবী আগের তুলনায় উষ্ণ। ফলে এল নিনো এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একসঙ্গে বিবেচনা করা এখন আরও জরুরি।
প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তন তাই শুধু দূরের সমুদ্রের খবর নয়। তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে আমাদের বৃষ্টি, গরম, কৃষি, পানি এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপরও।



