সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশহিমবাহ গলনে বিপদে ভারত, বাড়ছে বন্যা-পানির সংকট ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

হিমবাহ গলনে বিপদে ভারত, বাড়ছে বন্যা-পানির সংকট ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই বাঁধ দুর্বল হয়ে গেলে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে। এই ঘটনাকে বলা হয় গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক প্লাবন।

এনবি সংবাদ, আন্তর্জাতিক ডেক্স : হিমালয়কে শুধু বরফে ঢাকা বিশাল পর্বতমালা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। দক্ষিণ এশিয়ার পানি, কৃষি, বিদ্যুৎ, পর্যটন এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এই পর্বতশ্রেণির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে শুধু পরিবেশ নয়, ভারতের অর্থনীতি ও পানির নিরাপত্তার জন্যও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আগের দশকের তুলনায় বর্তমানে হিমালয়ের হিমবাহগুলো প্রায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে বরফ হারাচ্ছে। ফলে হিমবাহজাত হ্রদের সংখ্যা ও ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে বন্যা, ভূমিধস, পানির সংকট এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কাও ক্রমশ বাড়ছে।

গ্লোবাল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিস্টেমিকের তৈরি এক প্রতিবেদনে হিমালয়ের হিমবাহের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি এই প্রতিবেদনে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট বা আইসিমড এবং জি বি পন্ত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান এনভায়রনমেন্ট।

তবে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার হিমবাহ থাকলেও বিস্তারিত ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের তথ্য রয়েছে মাত্র ২১টি হিমবাহের। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি গবেষণায় উঠে আসা চিত্রের চেয়েও গুরুতর হতে পারে।

কারণ, বিশাল এই পার্বত্য অঞ্চলের বহু হিমবাহ এখনও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আসেনি।

হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় নতুন জলাধার বা হ্রদ তৈরি হচ্ছে। এসব হ্রদ অনেক সময় বরফ, পাথর ও মাটির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই বাঁধ দুর্বল হয়ে গেলে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে। এই ঘটনাকে বলা হয় গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক প্লাবন।

এ ধরনের বন্যা কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাহাড়ি উপত্যকার পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। রাস্তা, সেতু, ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

শুধু পানি নয়, উচ্চ পার্বত্য এলাকার ঢাল এবং পারমাফ্রস্ট অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে একটি দুর্যোগের সঙ্গে আরেকটি দুর্যোগ যুক্ত হয়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৮ শতাংশ হিমালয় অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের মোট দুর্যোগের প্রায় ৩৫ শতাংশ এই অঞ্চলে ঘটে।

২০২৫ সালে ভারতের সরকার সংসদে জানিয়েছিল, ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলের ১৮৯টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি হিমবাহজাত হ্রদকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া হিমালয়ীয় নদী অববাহিকায় ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২,৪৮৫টি হিমবাহ উদ্ভূত হ্রদ কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের নজরদারিতে রয়েছে।

এই সংখ্যাগুলোই বোঝায়, হিমবাহ গলে যাওয়ার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক প্লাবনের ভয়াবহতা সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাতেই স্পষ্ট হয়েছে।

২০২৩ সালে সিকিমে হিমবাহজাত একটি হ্রদের আকস্মিক প্লাবনে অন্তত ৭০ জনের মৃত্যু হয়। ভয়াবহ বন্যায় রাস্তা, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এর আগে ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডেও ভয়াবহ জলপ্রবাহের ঘটনা ঘটে। ঋষিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা উপত্যকায় প্রবল পানির স্রোতে ২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান।

এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ের বরফ ও পানির পরিবর্তন কেবল পাহাড়ি পরিবেশের সমস্যা নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের জীবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে।

হিমালয়কে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় প্রাকৃতিক জলাধার বলা হয়। এখানকার বরফ ও তুষার গলে বহু গুরুত্বপূর্ণ নদীর প্রবাহ বজায় থাকে।

এই নদীগুলোর পানির ওপর নির্ভর করে কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

আইসিমডের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের বেশিরভাগ নদী অববাহিকা চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ‘পিক ওয়াটার’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ, হিমবাহ গলার কারণে নদীতে পানির প্রবাহ প্রথমে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর হিমবাহের বরফের মজুত কমতে থাকলে নদীতে পানির প্রবাহও ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।

তাই আজকের অতিরিক্ত পানি ভবিষ্যতের পানির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। বরং হিমবাহের দ্রুত গলন দীর্ঘমেয়াদে পানির সংকট তৈরি করতে পারে।

গবেষণায় হিমালয়ের পানির অর্থনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের হিসাবে, হিমালয়ের পানি ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশের ভিত্তি তৈরি করে।

ধান, গম ও চা চাষ থেকে শুরু করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটন এবং বিভিন্ন শিল্প বহু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই পানির ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু এর অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশ পাহাড়ি অঞ্চলে থাকে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয় থেকে তৈরি মোট অর্থনৈতিক মূল্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ পাহাড়ি এলাকায় থেকে যায়।

অর্থাৎ, হিমালয়ের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতির প্রভাব শুধু পাহাড়ি মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের খাদ্য উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবস্থা এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদ ও গ্রানথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান লর্ড নিকোলাস স্টার্ন হিমালয়কে ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিকার মতো হিমালয়েও বিপুল পরিমাণ বরফ ও হিমবাহ রয়েছে। তবে হিমালয়ের বিশেষত্ব হলো, এর আশপাশে এবং নিচের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শত শত মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে।

তাদের কৃষি, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, শিল্প ও জীবিকা কোনো না কোনোভাবে হিমালয়ের পানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

ফলে হিমালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

হিমবাহ গলার পেছনে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতা দায়ী নয়। গবেষণায় ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বনের প্রভাবও বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

সমতল অঞ্চলের বিভিন্ন উৎস, বিশেষ করে ইটভাটা ও অন্যান্য দূষণকারী উৎস থেকে তৈরি কালো কণা বাতাসের মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে বরফ ও তুষারের ওপর জমা হতে পারে।

বরফের ওপর কালো কার্বন জমলে সূর্যের আলো বেশি শোষিত হয়। ফলে বরফ দ্রুত উষ্ণ হয়ে গলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, হিমালয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহ গলার সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বনের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হিমবাহ গলার ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপও প্রয়োজন। প্রথমেই ব্ল্যাক কার্বন নির্গমন কমাতে হবে। একই সঙ্গে আরও বেশি হিমবাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহজাত হ্রদগুলোও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কোনো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে আগাম সতর্কবার্তার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

পাহাড়ি রাস্তা, সেতু, বাঁধ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সময়ও ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

হিমালয় ভারতের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি পর্যটক ভ্রমণ করেন।

তবে শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

পর্যটন থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ পাহাড়ের পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মানুষের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে সবাই।

অপরিকল্পিত নির্মাণ, অতিরিক্ত বর্জ্য এবং পর্যটনের বাড়তি চাপ যাতে পাহাড়ের পরিবেশকে আরও দুর্বল না করে, সেদিকেও কঠোর নজর দেওয়া দরকার।

হিমালয়ের নদী ও পরিবেশ কোনো দেশের সীমান্ত মেনে চলে না। ভারত, নেপাল, ভুটান ও তিব্বতসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

তাই হিমবাহ গলা, হিমবাহজাত হ্রদের পানি বৃদ্ধি কিংবা পাহাড়ি ঢাল অস্থিতিশীল হওয়ার মতো ঘটনা মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জরুরি।

যৌথভাবে হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরি করা গেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

হিমালয়ের হিমবাহ যে গতিতে গলছে, তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এর প্রভাব আজ হয়তো মূলত পাহাড়ি এলাকায় দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পানির সংকট, কৃষি উৎপাদন, বিদ্যুৎ, পর্যটন এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সংকট মোকাবিলার সুযোগ এখনও রয়েছে। দূষণ কমানো, ব্ল্যাক কার্বন নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ এবং দায়িত্বশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ক্ষতির মাত্রা কমানো সম্ভব।

হিমালয় শুধু ভারতের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই হিমবাহ রক্ষার লড়াই আসলে পানি, খাদ্য, অর্থনীতি এবং কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ