যশোরের ইতিহাস মানেই শুধু ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গল্প নয়। এই জনপদের ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে আরও অনেক অজানা অধ্যায়। তেমনই একটি বিস্ময়কর অধ্যায় হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাঙালি তরুণদের নিয়ে গঠিত ‘বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানি’। এই বাহিনীতে যশোরের ১৯ জন তরুণও যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তান, কেউ শিক্ষিত তরুণ; আর একই সময় এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন পরবর্তীকালের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানির জন্ম
সময়টা ১৯১৬ সাল। ইউরোপকে কেন্দ্র করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব তখন ব্রিটিশ ভারতের ওপরও পড়ছিল। ভারতীয়দের মধ্যে থেকে সৈন্য ও সহায়ক কর্মী সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দেয়। একই সঙ্গে শিক্ষিত বাঙালি সমাজের সমর্থন ধরে রাখাও ব্রিটিশ সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে ‘Bengali Double Company’। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল দুটি কোম্পানি নিয়ে একটি ছোট সামরিক ইউনিট গঠন করার। কিন্তু তরুণদের আগ্রহ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সদস্যসংখ্যা কয়েকশতে পৌঁছে যায়।
এই বাহিনীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর সদস্যদের সামাজিক পরিচয়। তখনকার শিক্ষিত, শহুরে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের বহু তরুণ এতে যুক্ত হন। অর্থাৎ, যাঁরা সাধারণত শিক্ষা, আইন, চাকরি কিংবা অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের একটি অংশ সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য এগিয়ে আসেন।
যশোরের ১৯ তরুণের সাহসী সিদ্ধান্ত
এই বাহিনীর সঙ্গে যশোরের যোগসূত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যশোর থেকে ১৯ জন তরুণ এতে যোগ দিয়েছিলেন। এক শতাব্দীরও বেশি আগে বিদেশের মাটিতে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁদের জন্য সহজ ছিল না।
তখন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল সীমিত। আজকের মতো মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট বা দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ ছিল না। পরিবার থেকে দূরে গিয়ে অজানা পরিবেশে থাকা ছিল বড় ধরনের সিদ্ধান্ত। তারপরও তাঁরা সেই পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
এই ১৯ তরুণের গল্প যশোরের ইতিহাসকে শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত করে দেয়।
কুমার অধিক্রম মজুমদার: পেশা ছেড়ে সামরিক জীবনে
যশোরের এই তরুণদের মধ্যে আলোচিত ছিলেন কুমার অধিক্রম মজুমদার। তিনি ছিলেন রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের পুত্র এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী।
একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীর সামনে নিজের পেশাগত জীবন চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে তিনি বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানিতে যোগ দেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি ভিন্ন মানসিকতার পরিচয় বহন করে।
এই সময় তাঁর পরিবারও স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন ছিল। দূরবর্তী প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে পাওয়া চিঠিই ছিল তাঁদের খবর জানার প্রধান মাধ্যম।
একই বাহিনীতে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম
এই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতি। পরবর্তীকালে যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠবেন, তখন তিনি ছিলেন তরুণ নজরুল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নজরুল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাজগতে নানা মাত্রায় প্রভাব ফেলেছিল বলে গবেষণায় আলোচনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যে সময় যশোরের তরুণরা এই সামরিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিলেন, একই বৃহত্তর ধারার মধ্যে নজরুলও নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করছিলেন।
লাহোর থেকে নওশেরা: শুরু হয় সামরিক প্রশিক্ষণ
১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে প্রথম দলটি যাত্রা শুরু করে। লাহোর হয়ে তারা পৌঁছায় নওশেরায়। সেখানেই শুরু হয় সামরিক প্রশিক্ষণ।
তবে প্রশিক্ষণের শুরুতেই তাঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি পরিবারগুলোর কাছেও নিশ্চয়ই স্বস্তি ও উদ্বেগ—দুই ধরনের অনুভূতি তৈরি করেছিল।
নওশেরা থেকে কুমার অধিক্রম মজুমদার তাঁর বাবা যদুনাথ মজুমদারকে চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠির ভিত্তিতে যদুনাথ মজুমদার ‘বেঙ্গলি’ পত্রিকায় একটি আশ্বাসমূলক বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তরুণদের ভালো থাকা এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের কথা জানানো হয়।
আজকের দিনে কয়েক সেকেন্ডে ফোন করে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা যায়। কিন্তু সেই সময়ে একটি চিঠি পৌঁছাতে সময় লাগত। ফলে দূরদেশে থাকা তরুণদের পরিবারের কাছে প্রতিটি চিঠিই ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।
১৯১৭ সালে মেসোপটেমিয়ার পথে
১৯১৭ সালের জুলাই মাসে বাহিনীর একটি অংশকে পাঠানো হয় মেসোপটেমিয়ায়। বর্তমান ভূগোলের হিসাবে অঞ্চলটির বড় অংশ ইরাকের অন্তর্ভুক্ত।
এই দলের সঙ্গে ছিলেন কুমার অধিক্রম মজুমদার, শৈলেন্দ্রনাথ বসু, ঢাকার খাজা হাবিবুল্লাহসহ আরও অনেকে। তাঁদের দায়িত্ব সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়া ছিল না।
তাঁরা মূলত গ্যারিসন ডিউটি, পাহারা, যোগাযোগ ও বার্তা বহনের মতো সহায়ক দায়িত্ব পালন করতেন। যুদ্ধের ইতিহাসে এ ধরনের দায়িত্বকে অনেক সময় সামনে থাকা লড়াইয়ের তুলনায় কম দৃশ্যমান মনে হয়। কিন্তু একটি সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম সচল রাখতে এসব দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাগদাদে পৌঁছেও কাটেনি বিপদ
মেসোপটেমিয়ার পরিবেশ ছিল তাঁদের জন্য সম্পূর্ণ অপরিচিত। কঠিন আবহাওয়া, ভিন্ন ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা-সুবিধার সীমাবদ্ধতা তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে ইউনিটটি বাগদাদে পৌঁছায়। কিন্তু ততদিনে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে কয়েকজন বাঙালি সদস্যের মৃত্যু হয়।
বিদেশের মাটিতে তাঁদের মৃত্যু এই ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি। তাঁদের অনেকের নাম পরবর্তীকালের সাধারণ ইতিহাসচর্চায় খুব বেশি আলোচিত হয়নি। অথচ তাঁরা পরিবার, পরিচিত পরিবেশ এবং স্বাভাবিক জীবন থেকে হাজার মাইল দূরে গিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ছোট উদ্যোগ থেকে বড় সামরিক বাহিনী
‘ডাবল কোম্পানি’ নামটি শুনলে হয়তো মনে হতে পারে এটি ছিল খুব ছোট একটি সামরিক দল। কিন্তু বাস্তবে এর সদস্যসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯১৭ সালের মধ্যেই সদস্যসংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যায়।
পরবর্তীকালে এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হয়ে ‘Forty Ninth Bengalis’ নামে একটি বৃহত্তর সামরিক ইউনিটে রূপ নেয়। তখন সদস্যসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।
ফলে শুরুতে যে উদ্যোগকে প্রতীকী সামরিক ইউনিট হিসেবে দেখা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটি একটি উল্লেখযোগ্য বাঙালি সামরিক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
যশোরের অজানা সেই তরুণ
এই ইতিহাসের সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো, যশোরের যে তরুণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়, তাঁর নাম আজও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন।
ইতিহাসে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। বড় যুদ্ধের বিবরণে অনেক সময় সেনা কর্মকর্তা, বড় সামরিক অভিযান কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের নাম থেকে যায়। কিন্তু সাধারণ তরুণদের জীবন, তাঁদের পরিবার, ভয়, আশা এবং মৃত্যুর গল্প হারিয়ে যায় সময়ের সঙ্গে।
নামটি জানা না থাকলেও সেই তরুণের ইতিহাসের গুরুত্ব কমে যায় না। বরং এই অজানা নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু বিখ্যাত ব্যক্তিদের দিয়ে তৈরি হয় না। অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবন ও ত্যাগের ওপরও ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে।
যশোরের ইতিহাসে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে যশোরের তরুণদের এই সংযোগ আমাদের স্থানীয় ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার সুযোগ দেয়। একদিকে আছে যশোরের ১৯ তরুণের সামরিক জীবনে প্রবেশ, অন্যদিকে একই সময়ের বৃহত্তর ভারতীয় ও বাঙালি সমাজের পরিবর্তন।
তাঁরা সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেননি—এমন তথ্য থাকলেও তাঁদের দায়িত্ব ছিল যুদ্ধকালীন সামরিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রশিক্ষণ, পাহারা, গ্যারিসন দায়িত্ব, যোগাযোগসহ বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এই কারণে তাঁদের গল্পকে শুধু যুদ্ধের গল্প হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এটি ছিল একটি সময়ের সামাজিক ইতিহাসও—যে সময়ে শিক্ষিত বাঙালি তরুণরা নিজেদের পরিচিত জীবন থেকে বেরিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছিলেন।
ইতিহাসের পাতায় আরও যত্ন দরকার
যশোরের এই অধ্যায় আমাদের একটি সহজ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—স্থানীয় ইতিহাসের কত গল্প এখনও অজানা রয়ে গেছে?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম বড় ঘটনা। সেই বৈশ্বিক ঘটনার ঢেউ যশোরের মতো একটি জনপদের তরুণদের জীবনেও পৌঁছেছিল। তাঁদের কেউ সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কেউ বিদেশের মাটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার কেউ সেখানেই প্রাণ হারিয়েছেন।
আজ তাঁদের গল্প নতুন করে সামনে আনা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়। বরং স্থানীয় ইতিহাসকে বিশ্ব ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা।
যশোরের সেই ১৯ তরুণ, কুমার অধিক্রম মজুমদার এবং তাঁদের সময়ের অন্য তরুণদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসের বড় ঘটনাগুলোর পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট জীবনকাহিনি।
সেই গল্পগুলো খুঁজে বের করা, সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। কারণ একটি জনপদের শিকড় যত গভীরে, তার ইতিহাসও তত বেশি গল্পে ভরা।
লেখক: সাজেদ রহমান, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।



