সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeইতিহাস ও ঐতিহ্যব্রিটিশ বনাম বাঙালি! নিউ মার্কেট ঘিরে সংঘর্ষের রক্তাক্ত ইতিহাস

ব্রিটিশ বনাম বাঙালি! নিউ মার্কেট ঘিরে সংঘর্ষের রক্তাক্ত ইতিহাস

উনিশ শতকের কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। শহরের জনসংখ্যা বাড়ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাসিন্দাদের জন্য আলাদা ধরনের নাগরিক সুবিধা তৈরির প্রবণতাও ছিল।

কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা নিউ মার্কেট শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঔপনিবেশিক কলকাতার সামাজিক বৈষম্য, ব্যবসায়িক স্বার্থ, স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধ এবং ক্ষমতার টানাপোড়েনের এক বিস্ময়কর ইতিহাস।

আজকের প্রজন্মের কাছে নিউ মার্কেট কিংবা হগ মার্কেট পরিচিত একটি ব্যস্ত বাজার হিসেবে। কিন্তু দেড়শ বছরেরও বেশি আগে এই জায়গাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল তীব্র বিরোধ। সেই বিরোধের কেন্দ্রে ছিলেন কলকাতার তৎকালীন প্রভাবশালী পুলিশ কমিশনার ও পৌর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা স্যার চার্লস স্টুয়ার্ট হগ এবং দেশীয় ব্যবসায়ী বাবু হীরালাল শীল।

১৮৭৩-৭৪ সালের সেই ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি বাজার তৈরির ইতিহাস নয়; এটি ঔপনিবেশিক কলকাতার সমাজ ও ক্ষমতার কাঠামো বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

হগ মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা কীভাবে শুরু হয়?

উনিশ শতকের কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। শহরের জনসংখ্যা বাড়ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাসিন্দাদের জন্য আলাদা ধরনের নাগরিক সুবিধা তৈরির প্রবণতাও ছিল।

এই সময় স্যার চার্লস স্টুয়ার্ট হগ কলকাতার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ইউরোপীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত বাজার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বর্তমান নিউ মার্কেটের যাত্রা শুরু।

কিন্তু নতুন বাজার তৈরির জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়েছিল, সেখানেই তৈরি হয় বড় সমস্যা।

হীরালাল শীলের ধর্মতলা বাজার

এই গল্পের অন্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন বাবু হীরালাল শীল। তিনি ছিলেন কলকাতার একজন ধনী ও প্রভাবশালী দেশীয় ব্যবসায়ী। ধর্মতলা এলাকায় তাঁর বাজার ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

সেই বাজারে শুধু বড় ব্যবসায়ী ছিলেন না। সবজিওয়ালা, ছোট দোকানি, শ্রমজীবী মানুষসহ বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করত ওই বাজারের ওপর।

ফলে বাজারটি সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ ব্যবসায়িক মালিকানার প্রশ্নের পাশাপাশি বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে যায়।

এখান থেকেই শুরু হয় বিরোধ।

বাজার উচ্ছেদকে ঘিরে সংঘর্ষ

নতুন বাজার তৈরির পরিকল্পনায় পুরোনো বাজার সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাজার খালি করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

অন্যদিকে হীরালাল শীলও সহজে পিছিয়ে যেতে রাজি হননি। তাঁর পক্ষ থেকে লাঠিয়ালদের দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়।

ফলে পুলিশ ও লাঠিয়ালদের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাজারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও এই উত্তেজনার মধ্যে পড়ে যান।

একটি বাজার উচ্ছেদের প্রশাসনিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে পরিণত হয় বড় ধরনের সামাজিক বিরোধে।

শুধু বাজারের মালিকানা নয়, ছিল অধিকার ও জীবিকার প্রশ্ন

এই ঘটনাকে শুধু ব্রিটিশ প্রশাসন বনাম একজন দেশীয় ব্যবসায়ীর দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না।

একদিকে ছিল পৌর প্রশাসনের নতুন বাজার তৈরির পরিকল্পনা। অন্যদিকে ছিল পুরোনো বাজারের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা।

তাই সংঘর্ষের মধ্যে জমি, বাজারের মালিকানা, ব্যবসার অধিকার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা—সবকিছুই একসঙ্গে জড়িয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাকে কলকাতার প্রাথমিক গণপ্রতিরোধের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেও আলোচনা করা হয়েছে।

সংবাদপত্রে উঠে আসে বাজারের লড়াই

ঘটনাটি তখনকার সংবাদপত্রেরও নজর কাড়ে। ১৮৭৩ সালের বিভিন্ন বাংলা পত্রিকায় হীরালাল শীল ও বাজার নিয়ে বিরোধের খবর প্রকাশিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়।

‘ভারত সংস্কারক’ ও ‘সুলভ সমাচার’-এর মতো পত্রিকায় বিষয়টি আলোচিত হয়।

সেই সময় সংবাদপত্র ছিল জনমত গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে বাজারকে ঘিরে বিরোধটি শুধু প্রশাসনিক দপ্তর কিংবা আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; কলকাতার শিক্ষিত সমাজেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল।

মঞ্চনাটকেও উঠে আসে ‘মার্কেট যুদ্ধ’

ঘটনাটি তৎকালীন কলকাতার সমাজে এতটাই আলোড়ন তুলেছিল যে নাট্যজগতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।

শিশির কুমার ঘোষের ‘The Battle of the Markets’ নামে একটি নাটকের কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। একইভাবে ‘Great Market War’ নামের নাটকের সঙ্গেও এই ঘটনার যোগসূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।

নাটকের মঞ্চে বাজারের বিরোধ উঠে আসা থেকে বোঝা যায়, ঘটনাটি তখন সাধারণ মানুষের আলোচনারও বিষয় হয়ে উঠেছিল।

অর্থাৎ, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; সমকালীন নাগরিক সমাজেও এর প্রভাব পড়েছিল।

আদালতেও গড়ায় বিরোধ

বাজার নিয়ে বিরোধ শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ের পর্যায়েও পৌঁছায়। হীরালাল শীল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন এবং ক্ষতিপূরণের দাবি করেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঔপনিবেশিক কলকাতায় দেশীয় ব্যবসায়ী ও ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা অসম ছিল, সেই প্রশ্নও এই ঘটনার মাধ্যমে সামনে আসে।

তবে বিরোধ যতই তীব্র হোক, শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হয়।

সাত লাখ টাকায় বাজার কেনা হয়

দীর্ঘ বিরোধের পর কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি হীরালাল শীলের বাজারটি সাত লাখ টাকার বিনিময়ে অধিগ্রহণ করে বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত ছিল পুরো ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ এর মাধ্যমে পুরোনো বাজারের জায়গায় নতুন পরিকল্পিত বাজার নির্মাণের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।

হীরালাল শীলের প্রতিরোধ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বাজারটি তাঁর হাতে থাকেনি।

১ জানুয়ারি ১৮৭৪: নতুন বাজারের উদ্বোধন

সব বিরোধ পেরিয়ে ১৮৭৪ সালের ১ জানুয়ারি কলকাতায় নতুন বাজারের উদ্বোধন হয়।

নতুন বাজারটি তৎকালীন ইউরোপীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজন ও রুচিকে সামনে রেখে পরিকল্পিত হয়েছিল। পরিচ্ছন্নতা, স্থাপত্য এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় এটি সেই সময়ের কলকাতায় নতুন ধরনের ধারণা নিয়ে আসে।

পরে বাজারটি স্যার চার্লস হগের নাম অনুসারে ‘হগ মার্কেট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

বর্তমানে অবশ্য ‘নিউ মার্কেট’ নামটিই বেশি প্রচলিত।

কেন নিউ মার্কেটের ইতিহাস এত গুরুত্বপূর্ণ?

আজকের নিউ মার্কেটে গেলে হয়তো কেউ ভাববেন না, এই জায়গা তৈরির পেছনে এত জটিল ইতিহাস রয়েছে।

এখন এখানে পোশাক, খাবার, জুতা, গয়না, উপহারসহ নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কেনাকাটা করতে আসেন।

কিন্তু এই ব্যস্ত বাজারের ইতিহাসের দিকে তাকালে ঔপনিবেশিক কলকাতার আরেকটি ছবি সামনে আসে—যেখানে শহর উন্নয়নের পরিকল্পনার সঙ্গে শ্রেণি, জাতিগত পরিচয়, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্ন জড়িয়ে ছিল।

হীরালাল শীলের প্রতিরোধের উত্তরাধিকার

হীরালাল শীল শেষ পর্যন্ত তাঁর বাজার ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু বাজার রক্ষার জন্য তাঁর প্রতিরোধ উনিশ শতকের কলকাতার সামাজিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে আছে।

এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহরের বড় বড় স্থাপনা ও বাজারের পেছনেও মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে। একটি বাজার ভেঙে নতুন বাজার তৈরি করা প্রশাসনের কাছে হয়তো উন্নয়ন প্রকল্প হতে পারে। কিন্তু সেই বাজারের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে সেটিই হতে পারে জীবিকার প্রশ্ন।

নিউ মার্কেটের ইতিহাস তাই শুধু একটি ভবন বা বাজার তৈরির কাহিনি নয়। এটি ঔপনিবেশিক কলকাতায় ক্ষমতা, ব্যবসা, নাগরিক জীবন ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আজ নিউ মার্কেটের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালে হয়তো সেই পুরোনো সংঘর্ষের কোনো চিহ্ন চোখে পড়বে না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সেই বিরোধ এখনও রয়ে গেছে।

নিউ মার্কেটের প্রতিটি ব্যস্ত করিডর তাই যেন মনে করিয়ে দেয়—একটি শহরের ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ কিংবা বড় রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে থাকে না। কখনও কখনও একটি বাজার, তার দোকানি আর সাধারণ মানুষের জীবনও হয়ে ওঠে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

লেখক: রিফাত-বিন-ত্বহা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ