সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeইতিহাস ও ঐতিহ্যএকাত্তরের ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি: কীভাবে ফিরেছিল নিজ দেশে?

একাত্তরের ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি: কীভাবে ফিরেছিল নিজ দেশে?

কিন্তু আত্মসমর্পণের পর তাঁদের কী হয়েছিল? কেন বাংলাদেশে আটকে না রেখে ভারতে নেওয়া হলো? তাঁদের কি যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়ার কথা ছিল? আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাঁরা পাকিস্তানে ফিরে গেলেন?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী যখন সামরিকভাবে কোণঠাসা, তখন ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী।

এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি নাগরিক ও সামরিক সদস্য যুদ্ধবন্দি হন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার ছিলেন সামরিক, আধাসামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বিপুলসংখ্যক সৈন্য একসঙ্গে আত্মসমর্পণের ঘটনা ছিল বিরল।

কিন্তু আত্মসমর্পণের পর তাঁদের কী হয়েছিল? কেন বাংলাদেশে আটকে না রেখে ভারতে নেওয়া হলো? তাঁদের কি যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়ার কথা ছিল? আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাঁরা পাকিস্তানে ফিরে গেলেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ সালের এক জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে।

৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির মধ্যে কারা ছিলেন?

আত্মসমর্পণকারী ৯৩ হাজার মানুষ সবাই পাকিস্তানি সেনা ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি পুলিশ, বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কূটনীতিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।

গবেষকদের তথ্যমতে, প্রায় ৮০ হাজার ছিলেন সামরিক, আধাসামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য। বাকি প্রায় ১৩ হাজার ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।

যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী, সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরীফ, এয়ার কমোডর ইনামুল হক এবং মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ।

বাংলাদেশে কেন রাখা হয়নি যুদ্ধবন্দিদের?

আত্মসমর্পণের পর প্রথমদিকে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশের তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের পরিকল্পনা ছিল, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশের মাটিতেই বিশেষ আদালতের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করা।

কিন্তু সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধের ক্ষত তখনও শুকায়নি। খাদ্য, পোশাকসহ নানা প্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৯৩ হাজার বন্দির থাকা, খাওয়া ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

আরও একটি বড় সমস্যা ছিল নিরাপত্তা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল। তাই বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হলে তাঁদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারত।

অন্যদিকে আত্মসমর্পণের দলিলে যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সম্মানজনক আচরণ এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে আত্মসমর্পণের প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যেই পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ভারতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ঢাকা থেকে ভারতে কীভাবে পাঠানো হয়েছিল?

বন্দিদের মূলত স্থল ও আকাশপথে ভারতে নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিমানে করে পাঠানো হয়েছিল। সাধারণ যুদ্ধবন্দিদের ট্রেন ও ট্রাকে করে ভারতের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়।

এভাবে বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের।

ভারতের কোথায় রাখা হয়েছিল পাকিস্তানি বন্দিদের?

ভারতের কলকাতা, জব্বলপুর, আগ্রা, রাঁচি ও বিহারসহ বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের রাখা হয়েছিল।

নিয়াজীর নিজের লেখা ‘The Betrayal of East Pakistan’ বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর তাঁকে এবং কয়েকজন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাকে বিমানে করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে তাঁদের ফোর্ট উইলিয়ামের একটি সরকারি কোয়ার্টারে রাখা হয়েছিল। পরে নিয়াজীসহ অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জব্বলপুরের একটি বন্দিশিবিরে স্থানান্তর করা হয়।

নিয়াজীর বর্ণনায় জব্বলপুরের ওই শিবিরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল। কাঁটাতারের বেড়া, প্রহরাচৌকি, সার্চলাইট এবং সার্বক্ষণিক পাহারার কথা তিনি তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

আগ্রা থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন পাকিস্তানি সেনারা

পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের জীবন কেমন ছিল, তার আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায় সাবেক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা সুজাত লতিফের স্মৃতিচারণে।

আত্মসমর্পণের পর তাঁকে প্রথমে কলকাতায় এবং পরে ট্রেনযোগে আগ্রার একটি বন্দিশিবিরে নেওয়া হয়। কয়েক হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও কর্মকর্তার সঙ্গে দীর্ঘ রেলযাত্রার পর তিনি সেখানে পৌঁছান।

সুজাত লতিফের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাঁরা পালানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন। পরে পরিকল্পনা ধরা পড়লে তাঁদের রাঁচির একটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

রাঁচিতে গিয়েও পালানোর চেষ্টা থামেনি। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা মাটির নিচ দিয়ে একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গ খনন করেছিলেন বলে তাঁর সাক্ষাৎকারে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনাও সফল হয়নি।

যুদ্ধবন্দিরা হয়ে উঠেছিলেন কূটনৈতিক আলোচনার অংশ

১৯৭১ সালের যুদ্ধ শেষ হলেও পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন ধরনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়।

পাকিস্তানে যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ তোলে, জেনেভা কনভেনশনের নীতিমালা অনুযায়ী দ্রুত যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না।

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিষয়টি শুধু ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। বাংলাদেশকেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হবে।

এ সময় বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাকিস্তানের কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়টি যুদ্ধবন্দিদের ভবিষ্যতের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরেন।

সিমলা চুক্তি কীভাবে পথ খুলে দেয়?

১৯৭২ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে ভারতের হিমাচল প্রদেশের সিমলায় বৈঠক হয়। সেখানে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সিমলা চুক্তি।

এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধের অবসান এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ তৈরি করা। একই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের যুদ্ধবিরতি রেখাকে নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলওসি হিসেবে ব্যবহারের বিষয়েও দুই দেশ সম্মত হয়।

যুদ্ধবন্দিদের ক্ষেত্রেও এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারত তার হেফাজতে থাকা পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সম্মত হয়।

তবে বিষয়টি তখনও পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। কারণ যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কয়েকজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশের আলাদা অবস্থান ছিল।

দিল্লি চুক্তি ও বন্দিদের প্রত্যাবাসন

১৯৭৩ সালের আগস্টে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দিল্লিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়।

এই চুক্তির আওতায় যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত প্রধান ১৯৫ জন বাদে অন্য পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর এবং বাংলাদেশে আটকে পড়া উর্দুভাষী বিহারিদের পাকিস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হয়।

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় বন্দিশিবিরে থাকা পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফেরার পথ কার্যত খুলে যায়।

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় প্রত্যাবাসন

চুক্তির পর ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যুদ্ধবন্দিদের হস্তান্তর শুরু হয়। ধাপে ধাপে তাঁদের ভারত থেকে পাকিস্তানে পাঠানো হতে থাকে।

প্রথমে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ১৯৫ জনকে বাদ রেখে অন্য বন্দিদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া এগোয়। পরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওই ১৯৫ জনকেও দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সম্মতি আসে।

১৯৭৪ সালে শেষ হয় যুদ্ধবন্দি হস্তান্তর

দীর্ঘ আলোচনা ও কূটনৈতিক সমঝোতার পর অবশেষে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যাবাসন শেষ পর্যায়ে পৌঁছে।

১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীকে ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরের যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শেষ হয়।

৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির গল্প আসলে কী বলে?

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সামরিক অধ্যায় শেষ হলেও যুদ্ধবন্দিদের প্রশ্নটি আরও কয়েক বছর ধরে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ছিল।

প্রথমে তাঁদের বাংলাদেশ থেকে ভারতে স্থানান্তর, এরপর দীর্ঘ বন্দিজীবন এবং শেষে সিমলা ও দিল্লি চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন—পুরো ঘটনাপ্রবাহ ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী দক্ষিণ এশিয়ার জটিল কূটনীতির অংশ।

একাত্তরের ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির ইতিহাস তাই শুধু বন্দিদের দেশে ফিরে যাওয়ার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে অবস্থান, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তানের কূটনৈতিক টানাপোড়েনেরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ