এনবি সংবাদ ডেস্ক : মহাকাশে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন (ISS) যে শুধু পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, তা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী তার অবস্থান ও অভিমুখও পরিবর্তন করতে হয়। আর সেই বিরল মুহূর্তই এবার ক্যামেরাবন্দি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভশ্চর অনিল মেনন। ড্রাগন মহাকাশযানের জানলা দিয়ে তোলা প্রায় ৫,৫০০টি স্থিরচিত্র জুড়ে তৈরি হয়েছে অসাধারণ সেই ভিডিও।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা বিশাল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ধীরে ধীরে নিজের অভিমুখ পরিবর্তন করছে। মহাকাশের অন্ধকারে নীল পৃথিবীকে পটভূমিতে রেখে স্পেস স্টেশনের এই বিশাল ঘূর্ণনকে অনেকটা মহাজাগতিক জিমন্যাস্টিকসের মতোই মনে হয়েছে দর্শকদের কাছে।
অনিল মেননের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মহাকাশ স্টেশনকে বিশেষ একটি ‘বুস্ট’ বা গতি দেওয়ার জন্য তার অবস্থান বদলানোর প্রয়োজন হয়েছিল। সেই কারণেই স্টেশনের অভিমুখ পরিবর্তন করেন নাসার প্রকৌশলীরা।
মহাকাশে কোনও বিশাল কাঠামোর দিক পরিবর্তন করা পৃথিবীর মতো সহজ কাজ নয়। সেখানে স্পেস স্টেশনের গতিবিধি, কক্ষপথ, অবস্থান এবং অন্যান্য মহাকাশযানের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব—সবকিছু হিসাব করে পরিকল্পনা করতে হয়।
অনিল মেননের প্রকাশ করা ফুটেজে মূলত সেই প্রক্রিয়ার পর স্টেশনের আগের অভিমুখে ফিরে আসার দৃশ্যই ধরা পড়েছে। পৃথিবীর উপরে কয়েকশো কিলোমিটার উচ্চতায় একটি বিশাল মহাকাশ স্টেশনের এমন গতিবিধি সাধারণ মানুষের চোখে দেখা অত্যন্ত বিরল।
এই ভিডিওটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলির একটি হল, এটি কোনও সাধারণ ভিডিও ক্যামেরায় একটানা ধারণ করা হয়নি। অনিল মেননের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫,৫০০টি স্থিরচিত্র বা স্টিল ছবি পরপর সাজিয়ে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিটি ছবি স্পেস স্টেশনের গতিবিধির একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত ধরে রেখেছে। সেই ছবিগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখানোর ফলে পুরো ঘূর্ণন বা অভিমুখ পরিবর্তনের দৃশ্যটি একটি চলমান ভিডিওর মতো ফুটে উঠেছে।
অনিল মেনন জানিয়েছেন, মূল ছবিগুলিতে কোনও ধরনের ডিজিটাল কারসাজি করা হয়নি। তবে দর্শকদের কাছে মহাকাশ স্টেশনের গতিবিধি এবং পৃথিবীর দৃশ্য আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার জন্য ভিডিওটির ফ্রেম রেট বা প্রদর্শনের গতি কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে।
এই বিরল দৃশ্যের আরও একটি বিশেষত্ব হল, এটি দেখা হয়েছে ড্রাগন মহাকাশযানের জানলা দিয়ে। ফলে ক্যামেরার দৃষ্টিকোণও ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
একদিকে মহাকাশের গভীর কালো শূন্যতা, অন্যদিকে নীল-সাদা পৃথিবী। তার মাঝেই ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান বদলাচ্ছে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন। পুরো দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, যেন পৃথিবীর কক্ষপথে বিশাল কোনও মহাকাশযান নিঃশব্দে নৃত্য করছে।
অনিল মেননও সেই কারণেই মজার ছলে স্পেস স্টেশনের এই গতিবিধিকে ‘জিমন্যাস্টিকস’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ভিডিওটি শেয়ার করার সময় অনিল মেনন লেখেন, মহাকাশ স্টেশনও জিমন্যাস্টিকস করতে পারে। ড্রাগনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে এই দিক পরিবর্তনের দৃশ্য দেখা যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নভশ্চরের এমন রসিক মন্তব্যের সঙ্গে ভিডিওর দৃশ্যও বেশ মানানসই। বিশাল মহাকাশ স্টেশনকে যখন পৃথিবীর পটভূমিতে ধীরে ধীরে ঘুরতে দেখা যায়, তখন সেটিকে সত্যিই কোনও মহাজাগতিক ব্যালের দৃশ্য বলে মনে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন একটি বিশাল গবেষণাগার। সেখানে বিভিন্ন দেশের মহাকাশচারীরা দীর্ঘ সময় ধরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন। স্টেশনটিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ধরে রাখতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মহাকাশযানের সঙ্গে কাজ করতে তার অবস্থান ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
কখনও কক্ষপথ ঠিক রাখতে, কখনও অন্য কোনও মহাকাশযানের সঙ্গে নির্দিষ্ট অপারেশন পরিচালনা করতে স্পেস স্টেশনের গতিপথ বা অভিমুখ পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। এই ধরনের প্রতিটি কাজ অত্যন্ত নির্ভুল হিসাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
তাই সাধারণ দর্শকের কাছে ভিডিওটি যতই বিনোদনমূলক মনে হোক, এর পিছনে রয়েছে জটিল মহাকাশ প্রকৌশল এবং নিখুঁত পরিকল্পনা।
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর সমাজমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা শুরু হয়। মহাকাশের বুক থেকে পৃথিবীকে দেখার পাশাপাশি স্পেস স্টেশনের এমন বিরল গতিবিধি দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন।
একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, দৃশ্যটি অসাধারণ সুন্দর এবং ভিডিওটি দেখার পর পৃথিবীর সৌন্দর্যকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছেন তিনি। আরেকজন লিখেছেন, মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে সবসময়ই অপূর্ব লাগে।
আবার কেউ কেউ স্পেস স্টেশনের ঘূর্ণনের দৃশ্যকে মহাজাগতিক ব্যালে নৃত্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পৃথিবীর নীল পটভূমিতে বিশাল মহাকাশ স্টেশনের এই ধীর গতির পরিবর্তন যে দর্শকদের কল্পনায় নানা উপমা তৈরি করেছে, সমাজমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াতেই তার প্রমাণ মিলেছে।
মহাকাশ থেকে বিভিন্ন আকর্ষণীয় দৃশ্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য অনিল মেননের পোস্টগুলি নিয়মিতই আগ্রহ তৈরি করে। তাঁর শেয়ার করা ছবিতে কখনও পৃথিবীর অপূর্ব দৃশ্য, কখনও মহাকাশ স্টেশনের ভিতরের জীবন, আবার কখনও মহাকাশচারীদের দৈনন্দিন কাজের ঝলক দেখা যায়।
তবে স্পেস স্টেশনের অভিমুখ পরিবর্তনের এই ফুটেজ আলাদা করে নজর কেড়েছে। কারণ এখানে শুধু পৃথিবীর সৌন্দর্য নয়, একই সঙ্গে একটি বিশাল মহাকাশ কাঠামোর গতিবিধিও চোখের সামনে ধরা পড়েছে।
মহাকাশ নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল বরাবরই প্রবল। এমন বাস্তব ফুটেজ সেই কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীর কক্ষপথে ভেসে থাকা একটি বিশাল গবেষণাগার কীভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের অবস্থান বদলায়, তা এই ভিডিওর মাধ্যমে অনেকটাই সহজে বোঝা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, ৫,৫০০টি স্থিরচিত্রে ধরা এই মহাজাগতিক দৃশ্য শুধু চোখ ধাঁধানো নয়, মহাকাশ প্রযুক্তির জটিলতারও একটি চমৎকার উদাহরণ। আর পৃথিবীর পটভূমিতে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের সেই ‘জিমন্যাস্টিকস’ আপাতত মুগ্ধ করে রেখেছে মহাকাশপ্রেমীদের।



