সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeসর্বশেষ সংবাদজিম, পেশি আর কড়া ডায়েটের আড়ালে লুকিয়ে হার্টের বিপদ? কী বললেন দেবী...

জিম, পেশি আর কড়া ডায়েটের আড়ালে লুকিয়ে হার্টের বিপদ? কী বললেন দেবী শেঠী

দেবী শেঠীর মতে, শরীরের গঠন দেখে হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য বিচার করা ঠিক নয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পেশিবহুল শরীর তৈরির প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট, হরমোন কিংবা শরীরের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এনবি সংবাদ ডেস্ক : পেশিবহুল শরীর, নিয়মিত জিম, কড়া ডায়েট—সব মিলিয়ে কাউকে দেখলে মনে হতেই পারে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু বাইরে থেকে শরীর যতই ফিট দেখাক, ভিতরে হৃদ্‌যন্ত্রের অবস্থা কেমন, তা শুধু আয়নায় দেখে বোঝার উপায় নেই। বরং অতিরিক্ত পেশি তৈরির জন্য সাপ্লিমেন্ট বা হরমোনের ব্যবহার, ডায়াবেটিস, মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে দেশের পরিচিত হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠী তরুণ প্রজন্মের হার্টের স্বাস্থ্য নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে জিম ও সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের ঝুঁকি, ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’, কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার অভ্যাস, ডায়াবেটিস, মেনোপজের পর মহিলাদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি এবং সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা।

দেবী শেঠীর মতে, শরীরের গঠন দেখে হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য বিচার করা ঠিক নয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পেশিবহুল শরীর তৈরির প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট, হরমোন কিংবা শরীরের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চিকিৎসকের অভিজ্ঞতায় এমন তরুণ রোগীও এসেছেন, যাঁদের হৃদ্‌যন্ত্রে স্পষ্ট ব্লকেজ ছিল না, অথচ তাঁরা গুরুতর হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ হার্টের সমস্যা বোঝার জন্য শুধু শরীরের গঠন বা জিমে কত ঘণ্টা সময় কাটানো হয়, সেটাই যথেষ্ট নয়।

তাই সিক্স প্যাক বা পেশিবহুল শরীরকে হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতার সার্টিফিকেট হিসেবে দেখা বিপজ্জনক হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক মানেই তীব্র বুকব্যথা—এই ধারণাও সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়। অনেক সময় এমন হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, যার লক্ষণ এতটাই সামান্য থাকে যে রোগী বুঝতেই পারেন না কী ঘটেছে।

দেবী শেঠী জানিয়েছেন, তাঁর দলের কাছে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের একটি বড় অংশ পরে জানিয়েছেন, এর আগেও তাঁরা এমন হৃদ্‌রোগের ঘটনা পার করেছেন, কিন্তু তখন বিষয়টি বুঝতে পারেননি। এই ধরনের ঘটনাকেই সাধারণভাবে ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ বলা হয়।

ফলে শুধু বুকব্যথা হচ্ছে না বলে হৃদ্‌যন্ত্র সম্পূর্ণ নিরাপদ—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, একাকীত্ব, প্রিয়জনকে হারানো কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরের উপর প্রভাব ফেলে। হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব থাকতে পারে।

দেবী শেঠীর মতে, যাঁদের ইতিমধ্যেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে বা হৃদ্‌যন্ত্রে ব্লকেজ তৈরির প্রবণতা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।

তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হৃদ্‌যন্ত্র শুধুমাত্র সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কারণে আচমকা নষ্ট হয়ে যায়—এমন সরল ব্যাখ্যাও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না। তীব্র মানসিক চাপ শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হৃদ্‌রোগের ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

হার্টের কথা উঠলেই অনেকের প্রথম চিন্তা হয় তেল বা চর্বি নিয়ে। কিন্তু দেবী শেঠী খাবারের কার্বোহাইড্রেটের দিকেও নজর দেওয়ার কথা বলেছেন।

ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে ভাত, রুটি এবং অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ করে ভাত বহু মানুষের প্রতিদিনের প্রধান খাবার। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ শরীরে বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং পরোক্ষভাবে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

তবে এর অর্থ কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির অন্যতম উৎস কার্বোহাইড্রেট। আসল বিষয় হল পরিমাণ, খাবারের মান এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস।

অর্থাৎ শুধু রান্নায় কতটা তেল ব্যবহার হচ্ছে, তা দেখলেই হবে না। প্রতিদিনের প্লেটে ভাত বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কত, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেবী শেঠীর মতে, দেশের প্রত্যন্ত এলাকা এবং ছোট শহরগুলিতে এমন উন্নত ডায়াগনস্টিক পরিকাঠামো তৈরি করা দরকার, যেখানে মানুষ সহজেই নিজের ভবিষ্যৎ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।

কারণ রোগ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছনোর আগেই যদি ঝুঁকির কারণ শনাক্ত করা যায়, তাহলে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ বাড়ে।

হৃদ্‌রোগকে অনেক সময় পুরুষদের সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও মহিলাদের ক্ষেত্রেও এর ঝুঁকি কম নয়। বিশেষ করে মেনোপজের পর হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।

দেবী শেঠীর বক্তব্য অনুযায়ী, কম বয়সে মহিলাদের শরীরে থাকা কিছু হরমোন হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে। মেনোপজের পর সেই সুরক্ষা কমে যাওয়ায় তাঁদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি পুরুষদের কাছাকাছি চলে আসতে পারে।

তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে মহিলাদেরও রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির বিষয়গুলিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

ভারতে কম বয়সে ডায়াবেটিসের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেবী শেঠী। ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার সমস্যা নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি হৃদ্‌যন্ত্রের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ সমস্যা হল, ডায়াবেটিসের শুরুতে অনেকের কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে নিজেকে সুস্থ মনে করলেও শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন ধরে বেশি থাকতে পারে।

এই কারণে শুধু একবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। গত কয়েক মাসে রক্তে শর্করা কতটা নিয়ন্ত্রণে ছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে HbA1c পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁদের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত।

তরুণদের আচমকা হার্ট অ্যাটাক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের দাবি দেখা যায়। এর মধ্যে কোভিড সংক্রমণ বা কোভিড টিকার সঙ্গে হৃদ্‌রোগের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

দেবী শেঠীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাড়তে থাকা হৃদ্‌রোগের ঘটনাকে কোভিড টিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো বড় কোনও সম্পর্ক তিনি দেখছেন না। গুরুতর কোভিড সংক্রমণের ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা তৈরি হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে বহু বছর পরে হওয়া হৃদ্‌রোগের ঘটনাকে সরাসরি কোভিড বা টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো প্রমাণ তাঁর জানা নেই।

কম বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা এখন বেশি চোখে পড়ছে—এমন ধারণা নিয়ে দেবী শেঠী কিছুটা সতর্ক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, অতীতেও কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক হত। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সামাজিক মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ার কারণে ঘটনাগুলি আগের তুলনায় অনেক বেশি সামনে আসছে।

তাই শুধুমাত্র দৃশ্যমান ঘটনাগুলির ভিত্তিতে তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক নাটকীয় হারে বেড়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষ এখন আগের তুলনায় দ্রুত পরীক্ষা করাচ্ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা বা ব্লকেজ আগেই শনাক্ত হচ্ছে এবং সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শরীরচর্চা অবশ্যই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু জিম করা, পেশি তৈরি করা বা ছিপছিপে শরীর থাকা মানেই হৃদ্‌যন্ত্র পুরোপুরি সুস্থ—এমন নিশ্চয়তা নেই।

হার্টের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, ধূমপান, পারিবারিক ইতিহাস, ওজন, ঘুম, মানসিক চাপ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আয়নায় নিজের শরীরকে ফিট দেখানোর পাশাপাশি শরীরের ভিতরের স্বাস্থ্য সম্পর্কেও সচেতন হওয়া দরকার। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করা এবং ঝুঁকির কারণগুলো শুরুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা—হার্টকে সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ