এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : নেপালে ফের হড়পা বানের তাণ্ডব। এবার গোর্খা জেলার উত্তরে বুড়ি গণ্ডকী নদীতে আচমকা জলস্ফীতির জেরে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রবিবার ভোরে প্রবল স্রোতের সঙ্গে কাদামাটি ও বালি মিশ্রিত জল নদীর দু’পাড়ে আছড়ে পড়ে। নিমেষের মধ্যে ভেঙে পড়ে একাধিক বাড়িঘর। ভেসে যায় দুটি ঝুলন্ত সেতুও। প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীর ভয়াবহ স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ার ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে বড় ধরনের প্রাণহানির খবর না মিললেও পরে চারজনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানা যায়। তাঁদের সন্ধানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেছে নেপালের প্রশাসন। নদীর জলস্তর এখনও ওঠানামা করায় নতুন করে বিপদের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
রবিবার ভোরে বুড়ি গণ্ডকী নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তার পরেই নদীর প্রবল স্রোত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নদীর দিক থেকে বিকট গর্জনের মতো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই জল বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। ফলে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটতে শুরু করেন।
সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের প্রকাশিত একটি ভিডিয়োতে হড়পা বানের পর দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হেলিকপ্টারের সাহায্যে এলাকা পর্যবেক্ষণ এবং উদ্ধার তৎপরতার ছবি সামনে এসেছে। আকাশপথে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বোঝার পাশাপাশি বিপদে পড়া মানুষদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভিডিয়োতে নদীর প্রবল স্রোত দেখে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কাদামিশ্রিত জল দ্রুত এগিয়ে আসছে। নদীর জলস্তর আরও বাড়লে আশপাশের জনবসতির জন্য বিপদ বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Nepal’s National Disaster Risk Reduction and Management Authority tweets, "A large flood is coming from Chumanuwmi Rural Municipality-6 of the Budhi Gandaki River, so until the flood passes, do not go near the river up to Trishuli Dobhan. Stay in high places." (Source: Nepal Army)
— ANI (@ANI) October 11, 2026
তবে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োগুলির প্রতিটি দৃশ্যের সময় ও স্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই নির্দিষ্ট কোনও ভিডিয়োকে ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার আগে তার উৎস ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি।
হড়পা বানের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণ করা একটি ভিডিয়োতে বলে দাবি করা হচ্ছে। ‘ওয়েদারমনিটরস’ নামের একটি এক্স হ্যান্ডল থেকে প্রকাশিত ভিডিয়োতে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষকে দেখা যায়। তাঁদের নীচে বুড়ি গণ্ডকী নদী দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে যাচ্ছিল কালচে কাদামাটি ও বালিমিশ্রিত জল।
ভিডিয়োতে দেখা যায়, নদীর স্রোত ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। একসময় জল নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ছেড়ে পাড়ের দিকে এগিয়ে আসে। নদীর কাছাকাছি থাকা কয়েকটি বাড়ি প্রবল স্রোতের মুখে পড়ে। জলের ধাক্কায় বাড়িগুলি ভেঙে পড়ে এবং ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে ভেসে যায়।
পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের সামনে এমন দৃশ্য অত্যন্ত আতঙ্কজনক হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের চিৎকার ও আর্তনাদের কথা উঠে এসেছে ঘটনার বিবরণে। অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের বসতবাড়ি হারিয়ে ফেলেন অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সেই মুহূর্তে বাড়িঘর বা সম্পত্তি রক্ষা করার কোনও সুযোগ ছিল না। প্রবল জলস্রোতের সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়াই ছিল তাঁদের একমাত্র উপায়।
‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুমুব্রি গ্রামীণ পুরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের সল্লেরি, পাইয়ুকা এবং জগৎ এলাকায় হড়পা বানের প্রভাব পড়েছে। প্রবল জলস্রোতে একাধিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি বাড়ি নদীর জলে ভেসে যাওয়ার খবরও পাওয়া গিয়েছে।
চুমুব্রি গ্রামীণ পুরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রামকুমার গুরুং জানিয়েছেন, রবিবার ভোরে আচমকা বন্যার জল এলাকায় ঢুকে পড়ে। এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটে যে, বাসিন্দারা ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করার সময় পাননি।
বাড়িঘরের পাশাপাশি দুটি ঝুলন্ত সেতুও ভেসে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুলন্ত সেতু স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুর্গত এলাকার সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে উদ্ধারকাজ, চিকিৎসা পরিষেবা এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঠিক কতগুলি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। উদ্ধারকাজ ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষ হলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আসতে পারে।
বুড়ি গণ্ডকী নদীতে হড়পা বানের পর চারজনের নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছেন। তবে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পাহাড়ি নদীতে হড়পা বান হলে প্রবল স্রোতের সঙ্গে পাথর, কাদা, বালি ও গাছের গুঁড়ি ভেসে আসে। এই পরিস্থিতিতে নদীর আশপাশে তল্লাশি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আবার সেতু ভেঙে গেলে বা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ধারকারীদের দুর্গত এলাকায় পৌঁছতেও সমস্যা হয়।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং জানিয়েছেন, নদীর জলস্তর বাড়তে থাকায় উদ্ধারকাজ, ত্রাণ বিতরণ এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য হেলিকপ্টারের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বিপদে পড়া মানুষদের সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসন মাইকিং করে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষকে সতর্ক করছে। বাসিন্দাদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুড়ি গণ্ডকী নদীতে আচমকা জলস্ফীতির প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। গোর্খার মুখ্য জেলা আধিকারিক ধর্মেন্দ্রকুমার মিশ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, সিউরিবাসের উপরের দিকে ভূমিধসের খবর পাওয়া গিয়েছে। তবে সেই ভূমিধসের সঙ্গে নদীর জল বেড়ে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, শনিবার রাতে ভূমিধসের কারণে নদীর কোনও অংশে জল আটকে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পরে রবিবার ভোর চারটে নাগাদ জমে থাকা জলের চাপে সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ জল একসঙ্গে নীচের দিকে নেমে আসে। এর ফলেই হড়পা বান তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁদের অনুমান।
পাহাড়ি অঞ্চলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। ভূমিধসের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে গেলে তার পিছনে জল জমতে থাকে। পরে বাধা ভেঙে গেলে সেই জল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নীচের দিকে নেমে আসে। সঙ্গে কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে।
তবে বুড়ি গণ্ডকীর সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে অস্থায়ী হ্রদ তৈরির বিষয়টি এখনও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা মাত্র। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত প্রয়োজন।
নেপালের পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান ও ভূমিধসের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল। ভোটেকোশী নদী দিয়ে নেমে আসা প্রবল জলস্রোত, কাদা ও পাথরের কারণে একাধিক এলাকায় বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু এবং যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
A short while ago: A devastating flash flood has swept away Salleri Bazaar (Market) and caused severe destruction in Jagat Bazaar along the Budhi Gandaki River, Gorkha District, Nepal. (Video provided by Umesh.) https://t.co/aK74PD0S5t
— Weather Monitor (@WeatherMonitors) October 11, 2026
পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, ভারী বৃষ্টিপাত, ভূমিধস এবং নদীর প্রবাহে আকস্মিক পরিবর্তন এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ আগাম সতর্ক হওয়ার পর্যাপ্ত সময় পান না। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর স্বাভাবিক জলধারা বিপজ্জনক স্রোতে পরিণত হতে পারে।
বুড়ি গণ্ডকীর ঘটনাও সেই ঝুঁকির কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী মানুষ, পর্যটক এবং পাহাড়ি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বুড়ি গণ্ডকী নদীর জলস্তর ওঠানামা করায় গোর্খা, ধাদিং ও চিতওয়ানের নদীতীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নদীর জল কখনও বিপদসীমা অতিক্রম করায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের নদীর কাছাকাছি না যাওয়ার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ঢাল, নদীর পাড় এবং ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর আশপাশে অবস্থান করা বিপজ্জনক হতে পারে।
নদীর জল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, হঠাৎ ঘোলা হয়ে যাওয়া কিংবা পাহাড়ের দিক থেকে প্রবল গর্জনের শব্দ শোনা গেলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া জরুরি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভিডিয়ো তোলা বা বিপর্যয় দেখতে নদীর কাছে ভিড় করা প্রাণঘাতী হতে পারে।
এখন বুড়ি গণ্ডকী নদীর জলস্তর স্বাভাবিক হওয়া, নিখোঁজ চারজনের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুনরুদ্ধারই প্রশাসনের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভাইরাল ভিডিয়ো বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরলেও, দুর্গত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



