এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : নেপালের ভয়াবহ ভুটেকোশি নদীর হড়পা বানের এক মাস পেরিয়ে গেলেও বিপর্যয়ের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। ২৬ অগস্টের ভয়াবহ বন্যায় উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। এক মাস পরেও নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চলছে। উদ্ধার হচ্ছে দেহের অবশিষ্টাংশ। একই সঙ্গে রাস্তা, সেতু ও জরুরি পরিষেবা ফের চালু করতে জোরকদমে কাজ করছে নেপাল সরকার।
নেপালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের পর এখনও পর্যন্ত ১,৪৫১টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। তবে তার মধ্যে মাত্র ১১২টি দেহ শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বিপর্যয়ের পর বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। বিভিন্ন সরকারি আপডেটে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে পরিবর্তন দেখা গেলেও ২২ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী ৫,৭০৫ জনের সন্ধান মেলেনি।
নেপালের এই বিপর্যয়ে ভারতীয়দেরও অনেকে নিখোঁজ হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের ৩৭ জন বাসিন্দার এখনও সন্ধান মেলেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তাঁদের মধ্যে ৩২ জন ‘চলো যাই’ নামে একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন।
ওই পর্যটন সংস্থার কর্ণধার দিব্যজ্যোতি বসুর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ৩২ জনের কেউ এখনও ফিরে আসেননি। নিখোঁজদের পরিবারের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে নেপাল সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনও নমুনার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া দেহের মিল পাওয়া যায়নি।
এই নিখোঁজদের তালিকায় প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠার নামও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
উদ্ধারকারী দলের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ মৃতদেহ শনাক্ত করা। ভয়াবহ বন্যার স্রোতে বহু দেহ দীর্ঘ সময় কাদামাটি, পাথর ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে ছিল। ফলে অধিকাংশ দেহের অবস্থা এতটাই খারাপ যে চোখ দেখে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে ডিএনএ পরীক্ষার উপর নির্ভর করছে নেপাল প্রশাসন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া দেহ ও দেহাবশেষ থেকে ১,৩২৯টি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নিখোঁজদের পরিবারের কাছ থেকেও হাজারের বেশি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া দেহগুলির বিস্তারিত তথ্য নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারেন। দেহ সংরক্ষণের জায়গার সমস্যার কারণে বহু অশনাক্ত দেহাবশেষ নিরাপদভাবে মাটির নীচে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ডিএনএ নমুনাগুলিও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনও পরিবারের নমুনার সঙ্গে মিল পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
বিপর্যয়ের পর নেপালের সেনা, পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন একসঙ্গে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গতদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ত্রাণ ও আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। খাদ্য, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং অস্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার সাহায্য নিতে হচ্ছে।
সরকারি আপডেটে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি সামলাতে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে উদ্ধার, ত্রাণ এবং পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
২৬ অগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বান নেমে আসে। ভুটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার উপর দিয়ে নেমে আসা প্রবল স্রোত কাদামাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিয়ে বহু জনপদের উপর দিয়ে বয়ে যায়।
রাস্তা ও সেতুর পাশাপাশি একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাহাড়ি এলাকায় থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীদের অনেকে নিখোঁজ হয়ে যান। কয়েকটি প্রকল্পের সুড়ঙ্গেও উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নীচে থাকা জটিল সুড়ঙ্গগুলিতে উদ্ধারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালাতে হয়েছে।
বন্যার জেরে রসুয়া ও ধাডিংয়ের মধ্যে প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৪১টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ফলে নুয়াকোট ও রসুয়ার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
দুর্গত এলাকায় যোগাযোগ ফেরাতে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ শুরু করেছে প্রশাসন। দেবীঘাটের কাছে একটি অস্থায়ী সেতু তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে গালছি-বিদুর সড়কপথে যোগাযোগ ফের চালু হয়েছে। বেত্রাবতীতেও অস্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ চলছে।
স্যাব্রুবেসী এলাকায়ও সেতু নির্মাণ করছে সরকার। তবে স্যাব্রুবেসী থেকে রসুয়াগাধী যাওয়ার মূল রাস্তা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা দ্রুত মেরামত করে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
নেপালের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে বিপর্যয়ের পর ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় যাওয়ার রাস্তা নেই। কোথাও সেতু ভেঙে গিয়েছে, কোথাও আবার ভূমিধসের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
এই পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ড্রোন এবং অস্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার সাহায্যও নেওয়া হচ্ছে। তবে আকাশপথে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে দুর্গত সব এলাকায় সমান গতিতে সাহায্য পৌঁছনো যাচ্ছে না।
বন্যার পর নিখোঁজ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীদের সন্ধানেও অভিযান চলছে। চিলিম এবং আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও আশপাশের ধ্বংসস্তূপে একাধিক দেহ উদ্ধার হয়েছে। কিছু জায়গায় এখনও নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
বিপর্যয়ের পর কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষয়ক্ষতি নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি করেছে। দুর্গত এলাকায় বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা পুনরুদ্ধারের কাজও চলছে।
বন্যার মূল ধাক্কা সামলে ওঠার মধ্যেই নতুন করে ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন ভূমিধসের কারণে কোথাও রাস্তা বন্ধ হয়েছে, কোথাও আবার যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
ফলে একদিকে নিখোঁজদের খোঁজ চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা মেরামত করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্গত মানুষের কাছে খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে।
নেপাল ধীরে ধীরে বিপর্যয় কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। কিন্তু ১,৪৫১টি দেহ উদ্ধার হওয়ার পরও মাত্র ১১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং হাজার হাজার মানুষের এখনও নিখোঁজ থাকার তথ্য দেখাচ্ছে, এই বিপর্যয়ের ক্ষত কতটা গভীর। উদ্ধার ও শনাক্তকরণের পাশাপাশি রাস্তা, সেতু ও জরুরি পরিষেবা পুনর্গঠন—সব মিলিয়ে নেপালের সামনে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি।



