সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeগণমাধ্যমসিএনএন-সহ ৩ সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা, ট্রাম্পের কভারেজ বন্ধ চার নেটওয়ার্কের

সিএনএন-সহ ৩ সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা, ট্রাম্পের কভারেজ বন্ধ চার নেটওয়ার্কের

হোয়াইট হাউসের প্রেস কভারেজে ‘টেলিভিশন পুল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। প্রেসিডেন্টের প্রতিটি অনুষ্ঠানে সব টেলিভিশন নেটওয়ার্কের ক্যামেরা ক্রু নিয়ে উপস্থিত হওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। বিশেষ করে এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো সীমিত জায়গায় সব সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও ক্যামেরা টিমকে রাখা কঠিন।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ও দেশটির সংবাদমাধ্যমের মধ্যে নতুন করে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকে ‘সিএনএন’, ‘এমএস নাও’ এবং ‘পলিটিকো’র সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করার সিদ্ধান্তের পর এবার প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করার প্রচলিত যৌথ টেলিভিশন পুল ব্যবস্থা স্থগিত করেছে পাঁচটি প্রধান নেটওয়ার্কের সদস্যরা। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে এবিসি নিউজ, সিবিএস নিউজ, ফক্স নিউজ, এনবিসি নিউজ এবং সিএনএন। ফলে ট্রাম্পের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য নিয়মিত যে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভিডিও কভারেজ সরবরাহ করা হতো, আপাতত তা বন্ধ থাকছে।

ঘটনার সূত্রপাত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ওই দিন ট্রাম্প ঘোষণা করেন, সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। ট্রাম্প ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসন ও প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ‘ভুয়া খবর’ প্রকাশের অভিযোগ তোলেন। তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং পরে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়।

ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এসব সংবাদমাধ্যম তাঁর প্রশাসন সম্পর্কে এমন খবর প্রকাশ করছে, যেগুলো তিনি ‘ফেক নিউজ’ হিসেবে মনে করেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে আরও সংবাদমাধ্যম একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।

এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ঢুকতে গেলে ওই তিন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের বাধা দেওয়া হয়। তাঁদের প্রেস ব্যাজ নিষ্ক্রিয় বা প্রত্যাহার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফলে তাঁরা সরাসরি হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে প্রেসিডেন্টের কার্যক্রম কভার করতে পারেননি।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। ২১ সেপ্টেম্বর সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকো ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা করে। মামলায় তারা প্রথম সংশোধনীর আওতায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকার এবং পঞ্চম সংশোধনীর অধীনে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস কভারেজে ‘টেলিভিশন পুল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। প্রেসিডেন্টের প্রতিটি অনুষ্ঠানে সব টেলিভিশন নেটওয়ার্কের ক্যামেরা ক্রু নিয়ে উপস্থিত হওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। বিশেষ করে এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো সীমিত জায়গায় সব সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও ক্যামেরা টিমকে রাখা কঠিন।

তাই দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পালা করে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করে। যে নেটওয়ার্কের পালা থাকে, তারা ভিডিও ধারণ করে এবং সেই ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেয়। এতে একই অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও একাধিক সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করতে পারে।

বর্তমান ব্যবস্থায় এবিসি নিউজ, সিবিএস নিউজ, সিএনএন, ফক্স নিউজ এবং এনবিসি নিউজ এই টেলিভিশন পুলে অংশ নেয়। ২১ সেপ্টেম্বরের জন্য সিএনএনের পালা ছিল। কিন্তু সিএনএনকে হোয়াইট হাউস থেকে বাদ দেওয়ার পর বাকি চার নেটওয়ার্কও যৌথভাবে পুল কভারেজ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এবিসি নিউজ, সিবিএস নিউজ, ফক্স নিউজ এবং এনবিসি নিউজের সিদ্ধান্তকে শুধু একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের কভারেজ বন্ধ করা হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরোটা বোঝা যাবে না। তারা সিএনএনসহ পাঁচ নেটওয়ার্কের যৌথ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কভার করার দায়িত্ব আপাতত স্থগিত করেছে।

যৌথ বিবৃতিতে নেটওয়ার্কগুলো বলেছে, জনগণের সরকারের বিষয়ে সঠিক ও স্বাধীন তথ্য পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। কোনও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আপত্তি থাকার কারণে প্রশাসনের উচিত নয় সেই সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া।

তবে এর অর্থ এই নয় যে চারটি নেটওয়ার্ক ট্রাম্প প্রশাসনের সব ধরনের সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি মূলত প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানগুলোর টেলিভিশন পুল কভারেজের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যান্য সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যম সীমিত পুল ব্যবস্থার বাইরে থেকে হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন চালিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠান কভার করার পুল ব্যবস্থাও চলমান রয়েছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিরোধ তাঁর বর্তমান মেয়াদে নতুন করে তৈরি হয়নি। প্রথম মেয়াদেও একাধিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর সংঘাত হয়েছিল।

২০১৮ সালে সিএনএনের হোয়াইট হাউস correspondent জিম অ্যাকোস্টার প্রেস ক্রেডেনশিয়াল প্রত্যাহার করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এরপর সিএনএন আদালতের দ্বারস্থ হয়। ফেডারেল বিচারক অ্যাকোস্টার প্রেস পাস পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। আদালতের ওই পদক্ষেপের ফলে তিনি আবার হোয়াইট হাউসে প্রবেশের সুযোগ পান।

২০২৫ সালেও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা এপির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রেস-অ্যাক্সেস নিয়ে বিরোধ দেখা যায়। ‘গালফ অব মেক্সিকো’ নাম ব্যবহারের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে এপির সম্পাদকীয় নীতির পার্থক্যের পর হোয়াইট হাউস এপির সাংবাদিকদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ইভেন্ট থেকে সীমিত করেছিল। পরে আদালত এপির প্রবেশাধিকার নিয়ে হস্তক্ষেপ করে এবং মামলাটি চলাকালীন নির্দিষ্ট প্রেস ইভেন্টে তাদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোর বিরুদ্ধে বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর বিষয়টি দ্রুত আইনি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। তিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, সরকারের সমালোচনামূলক বা অপছন্দের প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের সরকারি জায়গায় প্রবেশাধিকার বন্ধ করা সাংবিধানিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্ন তৈরি করে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, তারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে লক্ষ্য করছে না; বরং যেসব সংবাদমাধ্যমকে প্রশাসন ‘ভুয়া’ বা ভুল প্রতিবেদন হিসেবে মনে করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যেই এখন আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর থাকে এবং হোয়াইট হাউসের প্রেস-অ্যাক্সেস নীতিতে এর কী প্রভাব পড়ে।

টেলিভিশন পুল ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ায় প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান থেকে সরাসরি ভিডিও সংগ্রহের প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটেছে। বিশেষ করে ছোট জায়গা বা সীমিত প্রবেশাধিকারের অনুষ্ঠানে এই পুল ব্যবস্থার গুরুত্ব বেশি। একটি নেটওয়ার্কের ক্যামেরা ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো ব্যবহার করার সুযোগ পেত। এখন সেই সমন্বিত ব্যবস্থা না থাকায় সংবাদ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে এর অর্থ ট্রাম্পের কার্যক্রম সংবাদমাধ্যমে একেবারেই দেখা যাবে না—এমন নয়। হোয়াইট হাউসের বাইরে থাকা সাংবাদিক, অন্যান্য সংবাদমাধ্যম এবং ভিন্ন ধরনের প্রেস কভারেজের মাধ্যমে তাঁর কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ অব্যাহত থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় এবিসি নিউজ, সিবিএস নিউজ, ফক্স নিউজ ও এনবিসি নিউজের পুল কভারেজ স্থগিত করা ঘটনাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একই সঙ্গে তিন নিষিদ্ধ সংবাদমাধ্যমের করা মামলার কারণে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সাংবিধানিক ও আইনি আলোচনারও অংশ হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ