সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশনদীই প্রধান অতিথি! সবুজে ঘেরা সিকিমে বসছে অভিনব ‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’

নদীই প্রধান অতিথি! সবুজে ঘেরা সিকিমে বসছে অভিনব ‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’

তিন দিনের এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে ‘চিরবিরে মাহশির চ্যালেঞ্জ’। এটি সাধারণ মাছ ধরার প্রতিযোগিতা নয়। এর বিশেষত্ব হলো—মাছ ধরার পর সেটিকে আবার নদীতে ছেড়ে দিতে হবে।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : কোনও উৎসবের প্রধান অতিথি হিসেবে সাধারণত কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পী কিংবা জনপ্রিয় তারকাকে দেখা যায়। কিন্তু নদীকে যদি সেই মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে একটু অন্যরকম। আর সেই অভিনব ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে চলেছে সিকিম।

আগামী ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর সিকিমের জোরেথাং শহরের কাছাকাছি রঙ্গিত নদীর তীরে বসতে চলেছে ‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’। উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়, এখানে কোনও ব্যক্তি নন, রঙ্গিত নদীকেই প্রধান অতিথি হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে। বিনোদনের পাশাপাশি নদী, মাছ, পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার মধ্যে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হবে এই আয়োজনে।

সিকিম রাজ্য সরকার এবং সিকিম অ্যাঙ্গলার্স অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবের লক্ষ্য শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ করা নয়। নদীকে কেন্দ্র করে কীভাবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা যায়, সেটিও তুলে ধরতে চাইছেন আয়োজকেরা।

‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’-এর ভাবনার পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি?

সিকিম অ্যাঙ্গলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করতে গিয়ে সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে এই প্রশ্নটি উঠে আসে। নদী ও প্রকৃতিকে উপভোগ করতে মানুষ অনেক দূরের পর্যটনকেন্দ্রে ছুটে যায়। কিন্তু নিজেদের রাজ্যের নদীকে ঘিরে কি এমন একটি পরিবেশবান্ধব পর্যটন মডেল তৈরি করা যায়, যা প্রকৃতি রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষেরও উপকার করবে?

সেখান থেকেই রঙ্গিত নদীর তীরে টেকসই অ্যাঙ্গলিং এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে আসে।

সংগঠনের কর্ণধার উদয়চন্দ্র রাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, নদীকে কেন্দ্র করে যদি টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে এবং স্থানীয় মানুষ সেখান থেকে উপকৃত হন, তাহলে নদী সংরক্ষণের ব্যাপারেও তাঁদের আগ্রহ বাড়বে।

অর্থাৎ, নদীকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে না দেখে স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করাই এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

তিন দিনের এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে ‘চিরবিরে মাহশির চ্যালেঞ্জ’। এটি সাধারণ মাছ ধরার প্রতিযোগিতা নয়। এর বিশেষত্ব হলো—মাছ ধরার পর সেটিকে আবার নদীতে ছেড়ে দিতে হবে।

এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ক্যাচ অ্যান্ড রিলিজ’ বা ‘ধরো এবং ছেড়ে দাও’।

মাহশির পাহাড়ি নদীর একটি পরিচিত মাছ। নদীর পরিবেশ ও মাছের প্রজাতি সংরক্ষণের বিষয়টি মাথায় রেখেই এই প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মাছ ধরার আনন্দ থাকবে, কিন্তু মাছকে স্থায়ীভাবে নদী থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে না।

আয়োজকদের মতে, এই ধরনের অ্যাঙ্গলিংয়ের মাধ্যমে মাছ ধরা এবং নদী সংরক্ষণের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।

শুধু মাছ ধরার প্রতিযোগিতা নয়, ‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’-এ দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে নানা ধরনের কার্যক্রম। প্রকৃতি, শিল্প, সংস্কৃতি, শরীরচর্চা এবং বিনোদন—সবকিছুকেই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রঙ্গিত নদীর তীরে ক্যাম্পিংয়ের পাশাপাশি থাকছে মৃৎশিল্পের আয়োজন। শিল্পপ্রেমীদের জন্য থাকবে মাঙ্গা আর্ট এবং আলোকচিত্রের সুযোগ। প্রকৃতিপ্রেমীরা অংশ নিতে পারবেন পাখি দেখার কর্মসূচিতে।

এমনকি থাকছে ‘মাশরুম ওয়াক’। অর্থাৎ, প্রকৃতির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মাশরুম সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকবে।

এর পাশাপাশি কবিতা পাঠ, গল্প বলা, রান্না ও বেকিং সেশন, সঙ্গীত পরিবেশনসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনও রাখা হয়েছে।

শরীর ও মন ভালো রাখার জন্য থাকবে তাই-চি এবং চি-গংয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী চীনা শরীরচর্চার সেশন। সন্ধ্যায় নদীর তীরে আয়োজন করা হবে বনফায়ারেরও।

ফলে উৎসবটি শুধু মাছ ধরা বা নদী দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রকৃতির সঙ্গে কয়েক দিন সময় কাটানোর একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ‘দ্য রিভার পিক’ নামে নদী পরিষ্কারের কর্মসূচি।

নদীর তীরে উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি নদীকে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়টিকেও সামনে আনতে চাইছেন আয়োজকেরা। পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতে নদীর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সচেতনতা তৈরির চেষ্টা থাকবে এই উদ্যোগে।

কারণ নদীকে ঘিরে পর্যটন গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই নদীর পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। উৎসবের মাধ্যমে সেই বার্তাই দিতে চাইছে আয়োজক সংগঠন।

‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’কে শুধু তিন দিনের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না আয়োজকেরা। এর পেছনে রয়েছে আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

সিকিম অ্যাঙ্গলার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রঙ্গিত নদীর তীরে মাছ ধরা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র তৈরির পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি, পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষকে এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা—সবকিছু ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সিকিম সরকার ‘চিরবিরে তার’ এলাকার দায়িত্ব সিকিম অ্যাঙ্গলার্স অ্যাসোসিয়েশনের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পরিকাঠামো তৈরিতেও সরকারি সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।

আয়োজকদের কাছে এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ।

শুধু বাইরের পর্যটক এনে নদীর তীরে কয়েক দিনের উৎসব করলেই নদী সংরক্ষণ সম্ভব নয়। স্থানীয় মানুষকে যদি নদীর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ করা যায়, তাহলে নদী রক্ষার দায়িত্বও তাঁদের মধ্যে আরও শক্তিশালী হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

এই কারণেই রঙ্গিত নদীকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতি, অ্যাঙ্গলিং, পর্যটন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তিন দিনের উৎসবে প্রায় ৫০০ পর্যটক নদীর তীরে ক্যাম্প করে রাত কাটাতে পারবেন বলে আয়োজকদের দাবি। যাঁরা নিজেদের তাঁবু নিয়ে আসতে চান, তাঁরাও সেই সুযোগ পাবেন।

অর্থাৎ, শহুরে কোলাহল থেকে দূরে কয়েক দিনের জন্য প্রকৃতির মধ্যে থাকার অভিজ্ঞতাও মিলবে এই উৎসবে।

রঙ্গিত নদী, পাহাড়ি পরিবেশ, সবুজে ঘেরা এলাকা এবং নদীর তীরে রাত কাটানোর সুযোগ—সব মিলিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।

উৎসবকে ঘিরে শুধু সিকিমেই প্রচার চালানো হয়নি। রঙ্গিত নদীর দার্জিলিং জেলার সিঙ্গালিলা এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন আয়োজকেরা।

দার্জিলিং এবং কালিম্পংয়ে উৎসবের প্রচার চালানো হয়েছে। শিলিগুড়ির পরিবেশপ্রেমী এবং মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর ফলে সিকিমের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি পাহাড়ি ও সমতল এলাকার প্রকৃতিপ্রেমীদেরও উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’-এর মূল ভাবনাটি আসলে নদীকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ধরনের পর্যটন মডেল তৈরি করা। যেখানে পর্যটন থাকবে, মাছ ধরা থাকবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে নদীর পরিবেশ সংরক্ষণও গুরুত্ব পাবে।

বিশেষ করে ‘ধরো এবং ছেড়ে দাও’ ধরনের অ্যাঙ্গলিং প্রতিযোগিতা এবং নদী পরিষ্কারের কর্মসূচি উৎসবটির পরিবেশবান্ধব বার্তাকে আরও স্পষ্ট করছে।

আগামী ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর রঙ্গিত নদীর তীরে যখন উৎসব শুরু হবে, তখন সেটি শুধু একটি পর্যটন অনুষ্ঠান হয়ে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে সিকিমের নতুন পরিবেশবান্ধব পর্যটন মডেলের সূচনা করবে—সেদিকেই নজর থাকবে।

তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—এই উৎসবে নদী শুধুই অনুষ্ঠানস্থল নয়। নদীকেই রাখা হয়েছে অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে। আর সেই কারণেই ‘চিরবিরে রিভার ফেস্ট’ অন্য সাধারণ পর্যটন উৎসবের তুলনায় বেশ আলাদা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ