এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : জাপানের পূর্ব উপকূলের দিকে ভয়ংকর শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসছে সুপার টাইফুন ‘দুজুয়ান’। শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাজধানী টোকিওসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় শুরু হয়েছে প্রবল বৃষ্টিপাত। কোথাও কোথাও বৃষ্টির সঙ্গে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় ইতিমধ্যে ১৯ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জাপানের কর্তৃপক্ষ।
আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিতে দেশটির একাধিক অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকা ও ভূমিধসপ্রবণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে জরুরি উদ্ধারকারী দলও।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা বা জেএমএর তথ্য অনুযায়ী, টাইফুন দুজুয়ানের কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় একটানা বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৪৩ কিলোমিটার। তবে ঝোড়ো হাওয়ার সময় সেই গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৯৮ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এ ধরনের শক্তিশালী বাতাসের কারণে গাছপালা উপড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
টাইফুনের প্রভাবে জাপানের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হলে নদীর পানি বাড়ার পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় মাটি নরম হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় জাপান সরকার একাধিক প্রিফেকচারে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, টোকিও, চিবা, কানাগাওয়া, ইবারাকি, শিজুওকা ও সাইতামা প্রিফেকচারের মোট ১৯ লাখ ৮ হাজার ৬৪৫ জনকে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে প্রবীণ, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলেছে। একই সঙ্গে যারা পাহাড়ের ঢাল, নদীর তীর কিংবা ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেন, তাদের বাড়িতে অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র, ওষুধ, খাবার ও পানীয় সঙ্গে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাপানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিবা প্রিফেকচারের সোদেগাউরা শহর এবং টোকিওর দক্ষিণাঞ্চলের ওশিমা দ্বীপে সর্বোচ্চ ‘লেভেল-৫’ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এই সতর্কতা সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়, যখন মানুষের জীবন রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের উঁচু ও নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী, যারা কোনো কারণে সরাসরি আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারছেন না, তাদের ভবনের তুলনামূলক নিরাপদ ও উঁচু তলায় অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি ঢাল, খাড়া জমি এবং ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে এমন জায়গা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
সুপার টাইফুন দুজুয়ানের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাবেই জাপানের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই বৃষ্টির কারণে কানাগাওয়া ও চিবা প্রিফেকচারে একাধিক ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে।
জাপানের দমকল বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কানাগাওয়া প্রিফেকচারে পাহাড় ধসে একটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে এক নারী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে চিবা প্রিফেকচারে ভূমিধসের ঘটনায় একজন আহত হয়েছেন।
উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে কাজ করছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে স্থানীয় প্রশাসনও।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা কোনো ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উষ্ণ সমুদ্র থেকে একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বেশি পরিমাণে জলীয়বাষ্প ও শক্তি সংগ্রহ করতে পারে। এর ফলে ঝড় দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে চলতি বছরের ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এল নিনোর সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো টাইফুনের তীব্রতার সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণ করতে আবহাওয়াবিদদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া সংস্থার তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
জাপানের পূর্বাঞ্চলে টাইফুনের প্রভাব বাড়তে থাকায় টোকিওসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো বাতাসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নগর এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ভূমিধস। দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সামান্য অতিরিক্ত বৃষ্টিতেও মাটি ও পাথর নিচে নেমে আসতে পারে।
এ কারণে জাপানের প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি আগেভাগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপানের বিভিন্ন এলাকায় জরুরি উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দমকল বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
কোনো এলাকায় ভূমিধস, বন্যা কিংবা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী টাইফুনের সময় শুধু বাতাসের গতিবেগ নয়, বৃষ্টির পরিমাণ এবং এর স্থায়িত্বও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তাই ঝড়ের গতিপথের পাশাপাশি বৃষ্টির পূর্বাভাস এবং স্থানীয় সতর্কতাও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সুপার টাইফুন দুজুয়ানকে ঘিরে জাপানের পূর্বাঞ্চলে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ১৯৮ কিলোমিটার পর্যন্ত ঝোড়ো বাতাস এবং ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
এরই মধ্যে ভূমিধসের ঘটনায় হতাহত ও নিখোঁজের খবর পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য না করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
টাইফুনের গতিপথ ও শক্তির পরিবর্তন অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও বদলাতে পারে। ফলে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সর্বশেষ সতর্কতা অনুসরণ করেই বাসিন্দাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।



