এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলের প্রভাবে আবারও বদলে যেতে চলেছে বিশ্বের আবহাওয়ার ছবি। শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। মার্কিন আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের শরৎ ও শীতকালে খুব শক্তিশালী এল নিনো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি। এমনকি চলতি এল নিনো ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলেও পূর্বাভাস রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করেছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া। এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় ২১ সেপ্টেম্বর রাজ্যটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউসম। লক্ষ্য, শীতের প্রবল বৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস, উপকূলীয় প্লাবনসহ সম্ভাব্য দুর্যোগের আগে প্রশাসনিক ও উদ্ধার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। সমুদ্রের এই উষ্ণতা বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে দিতে পারে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিতে পারে অস্বাভাবিক আবহাওয়া।
মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NOAA) ১০ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এল নিনো ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার বিচ্যুতি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল। NOAA জানিয়েছে, উত্তর গোলার্ধের ২০২৬ সালের শরৎ ও শীতকালে খুব শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি।
আরও সাম্প্রতিক সরকারি পূর্বাভাসে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে ঐতিহাসিক মাত্রার এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ বলা হয়েছে। অর্থাৎ অতীতের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর সঙ্গে এবারের পরিস্থিতির তুলনা করার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে পূর্বাভাস মানেই নিশ্চিত ফল নয়—এল নিনোর চূড়ান্ত শক্তি ও স্থানীয় প্রভাব এখনও পরিবর্তিত হতে পারে।
কেন ক্যালিফোর্নিয়ায় জরুরি অবস্থা?
প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালিফোর্নিয়ায় শক্তিশালী এল নিনো সাধারণত প্রবল বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া, পাহাড়ি এলাকায় তুষারপাত, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রাজ্য প্রশাসনের আশঙ্কা, একের পর এক শক্তিশালী ঝড় আঘাত হানলে উপকূলীয় এলাকায় জল ঢুকে পড়া, রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং পাহাড়ি এলাকায় ধসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে কাদা ও ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এই কারণেই দুর্যোগ শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া সরকার।
কী কী প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া?
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন সংস্থাকে সম্ভাব্য বন্যা ও ঝড়ের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় বালির বস্তা, পাম্প এবং অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম মজুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার পরিবহণ দফতর গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলিতে রাস্তা নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা বন্ধ করা এবং তুষার সরানোর সরঞ্জামও আগে থেকে প্রস্তুত রাখবে। প্রয়োজনে উদ্ধারকাজ, অনুসন্ধান, প্রকৌশল সহায়তা ও লজিস্টিক কাজে ন্যাশনাল গার্ডকেও ব্যবহার করা হতে পারে।
এছাড়া বন্যা, ভূমিধস ও ধসের মতো পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের কাজ দ্রুত করার জন্য কিছু অনুমোদন প্রক্রিয়াও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের জন্য বহুভাষিক সতর্কবার্তা এবং জরুরি প্রস্তুতি সংক্রান্ত তথ্য আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
এল নিনোর প্রভাব শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়
এল নিনো কোনও একটি দেশের আবহাওয়ার ঘটনা নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার এই পরিবর্তন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ার উপরও এল নিনোর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। বিশেষ করে ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক নিয়ে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। তবে এল নিনো শক্তিশালী হলেই কোনও নির্দিষ্ট দেশে একই ধরনের আবহাওয়া তৈরি হবে—এমন সরল সম্পর্ক নেই।
NOAA-ও জানিয়েছে, শক্তিশালী এল নিনো নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে, কিন্তু কোনও একটি অঞ্চলে ঠিক কী ধরনের আবহাওয়া হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। স্থানীয় বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি, সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য জলবায়ু কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার আগাম সতর্কবার্তা
ক্যালিফোর্নিয়ার জরুরি অবস্থা ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য আতঙ্ক তৈরি করা নয়, বরং সম্ভাব্য দুর্যোগের আগে প্রশাসনকে প্রস্তুত রাখা। রাজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে শীতকালে একাধিক শক্তিশালী ঝড়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাই আগে থেকেই উদ্ধারকর্মী, সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
NOAA-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। ফলে আগামী কয়েক মাস বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখবেন বিজ্ঞানীরা।
ক্যালিফোর্নিয়ার আগাম পদক্ষেপ তাই মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর প্রস্তুতি। এল নিনোর প্রভাব ঠিক কতটা তীব্র হবে, তা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হবে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা যে ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে, সে বিষয়ে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।



