সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeইতিহাস ও ঐতিহ্যআলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ২৩০০ বছরের পুরনো স্কুলের সন্ধান, মাটি খুঁড়ে মিলল প্রাচীন...

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ২৩০০ বছরের পুরনো স্কুলের সন্ধান, মাটি খুঁড়ে মিলল প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র

দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মিয়েজার এই শিক্ষাকেন্দ্র নিয়ে আগ্রহ ছিল। অবশেষে খননকাজ ও গবেষণার মাধ্যমে প্রাচীন স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : ইতিহাসের পাতায় যাঁর নাম যুদ্ধজয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সেই আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর জীবনের সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান মিলেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উত্তর গ্রিসের প্রাচীন ম্যাসিডোনীয় শহর মিয়েজায় খুঁজে পেয়েছেন এমন একটি শিক্ষাকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষ, যেখানে প্রায় ২৩০০ বছর আগে আলেকজান্ডার পড়াশোনা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়।

এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রাচীন স্কুলের সন্ধান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আলেকজান্ডার এবং তাঁর শিক্ষক, বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের স্মৃতি। ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারটি ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকে সাধারণত বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত বিজেতা হিসেবে মনে করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে ম্যাসিডোনিয়ার রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া এই শাসক অল্প বয়সেই সামরিক অভিযান শুরু করেন এবং বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল শিক্ষাজীবন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যারিস্টটল, যিনি প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক।

মিয়েজার এই শিক্ষাকেন্দ্রেই তরুণ আলেকজান্ডার জ্ঞানচর্চা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। সেখানে তিনি শুধু দর্শন বা সাহিত্য নয়, রাজনীতি, নৈতিকতা, রাষ্ট্রচিন্তা এবং বিভিন্ন জ্ঞানবিষয়েও শিক্ষা পেয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

প্রাচীন এই শিক্ষাকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে উত্তর গ্রিসের মিয়েজা শহরে। বর্তমান গ্রিসের এই অঞ্চল একসময় ম্যাসিডোনীয় রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মিয়েজার এই শিক্ষাকেন্দ্র নিয়ে আগ্রহ ছিল। অবশেষে খননকাজ ও গবেষণার মাধ্যমে প্রাচীন স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

খননস্থল থেকে পাওয়া স্থাপত্যের নিদর্শন দেখে বোঝা যায়, এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ পড়াশোনার জায়গা ছিল না। বরং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, শরীরচর্চা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্যও সেখানে আলাদা ব্যবস্থা ছিল।

আজকের আধুনিক স্কুলে যেমন শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি খেলার মাঠ, মিলনায়তন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকে, মিয়েজার প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রেও তার কিছুটা মিল পাওয়া যায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে সেখানে পড়াশোনার কক্ষ, খেলার জায়গা, স্টেডিয়াম এবং ভোজসভা বা ব্যাঙ্কোয়েট হলের মতো স্থাপনার অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে।

এ থেকে গবেষকদের ধারণা, সে সময় শিক্ষাব্যবস্থা শুধু বই বা মৌখিক শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের শারীরিক অনুশীলন, সামাজিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানচর্চার জন্যও আলাদা জায়গা রাখা হয়েছিল।

বিশেষভাবে নজর কেড়েছে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য তৈরি পাথরের ডেস্ক বা বসার ব্যবস্থা। প্রায় ২৩০০ বছর আগের একটি শিক্ষাকেন্দ্রে এমন পরিকল্পিত পরিকাঠামোর উপস্থিতি প্রাচীন গ্রিসের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

প্রাচীন স্কুলের স্থাপত্যের পাশাপাশি খননকাজে বিভিন্ন ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রীও উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রা এবং সিরামিকের তৈরি বিভিন্ন জিনিস।

এছাড়াও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কাজে ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয় এমন একটি সরু বস্তু উদ্ধার হয়েছে। দেখতে অনেকটা পেন্সিলের মতো এই জিনিসটি প্রাচীন শিক্ষার্থীরা লেখার কাজে ব্যবহার করত বলে গবেষকদের ধারণা।

এই ধরনের ছোট ছোট নিদর্শনই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে শুধু স্থাপত্যের ধরন জানা যায়। কিন্তু সেখানে পাওয়া দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র থেকে বোঝা যায়, সেই জায়গায় মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করত এবং শিক্ষার্থীরা কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করত।

মিয়েজার এই শিক্ষাকেন্দ্রকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই আলেকজান্ডার ও অ্যারিস্টটলের সম্পর্ক।

অ্যারিস্টটল ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক। দর্শন, রাজনীতি, জীববিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা থেকে শুরু করে জ্ঞানের বহু ক্ষেত্রে তাঁর অবদান রয়েছে। অন্যদিকে তাঁর ছাত্র আলেকজান্ডার পরবর্তীকালে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বিশাল ভূখণ্ড জয় করেন।

একজন ছিলেন জ্ঞানচর্চার প্রতীক, অন্যজন ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিজেতা। তাঁদের শিক্ষক-শিষ্য সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত একটি বাস্তব শিক্ষাকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষ তাই ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

এই আবিষ্কার প্রাচীন গ্রিসের শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের বিষয়েও নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে একটি স্কুল বলতে আমরা শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, অডিটোরিয়ামসহ নানা পরিকাঠামোর কথা ভাবি।

মিয়েজার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ২৩০০ বছর আগেও শিক্ষার্থীদের জন্য পরিকল্পিত পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। অবশ্য সেই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক স্কুলের মতো ছিল না। তবু শিক্ষা এবং অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য আলাদা স্থান রাখার বিষয়টি প্রাচীন সমাজের সংগঠিত শিক্ষাচর্চার ইঙ্গিত দেয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এগুলি অনেক সময় ইতিহাসের লিখিত তথ্যকে বাস্তব স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। মিয়েজার এই প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রও তেমনই একটি উদাহরণ।

একদিকে এখানে রয়েছে প্রায় ২৩০০ বছরের পুরনো স্থাপত্য। অন্যদিকে এই জায়গার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ও অ্যারিস্টটলের মতো ইতিহাসের দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।

তাই মিয়েজার এই স্কুলের সন্ধানকে শুধু একটি পুরনো ভবনের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যায়। এটি প্রাচীন ম্যাসিডোনিয়ার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে আলেকজান্ডারের শিক্ষাজীবনের সঙ্গেও তৈরি করেছে একটি দৃশ্যমান যোগসূত্র।

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান আরও এগোলে এই শিক্ষাকেন্দ্রে কীভাবে পড়াশোনা চলত, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল এবং আলেকজান্ডারের শিক্ষাজীবন সম্পর্কে আর কী তথ্য পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে আরও জানা সম্ভব হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ