স্টাফ রিপোর্টার,এনবি সংবাদ : একসময় গ্রামবাংলার ঘরবাড়ি, উঠান কিংবা ঝোপঝাড়ে সহজেই চোখে পড়ত বেত গাছ। লম্বা, সরু ও কাঁটাযুক্ত এই লতানো উদ্ভিদ শুধু প্রকৃতির অংশ ছিল না, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। বেত দিয়ে তৈরি হতো চেয়ার, টেবিল, মোড়া, ঝুড়ি, টুকরি, ফুলের টব, সোফা, দোলনা থেকে শুরু করে কৃষিকাজের নানা সরঞ্জাম। আর মৌসুম এলে গাছে ধরত বেতফল—গ্রামীণ মানুষের কাছে পরিচিত একটি টক-মিষ্টি স্বাদের দেশীয় ফল।
কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক জীবনযাত্রা, প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে বসতবাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণ এবং বেতের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে কমছে বেত গাছের সংখ্যা। একসময় যে গাছ ছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত অনুষঙ্গ, সেটিই এখন অনেক এলাকায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।
বরগুনার আমতলী উপজেলাতেও বেত গাছ ও বেতফলের অস্তিত্ব ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও বিভিন্ন বাড়ির আশপাশে কিংবা ঝোপঝাড়ে বেতের ঝাড় দেখা যেত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীত।
বেত গাছ কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন। একসময় গ্রামীণ পরিবারের প্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রীই স্থানীয়ভাবে বেত দিয়ে তৈরি করা হতো। ফলে বেতের চাহিদা ছিল। চাহিদা থাকায় বাড়ির আশপাশে বেতের ঝাড় সংরক্ষণ করতেন অনেকেই।
বর্তমানে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন কৃত্রিম উপকরণ খুব সহজে এবং তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। ফলে ঝুড়ি, টুকরি, ফুলের টব, দড়ি কিংবা ছোটখাটো গৃহস্থালি সামগ্রীর জন্য মানুষ আর আগের মতো বেতের ওপর নির্ভর করেন না। এতে বেতের ব্যবহার কমেছে, আর একই সঙ্গে কমেছে বেত চাষ বা সংরক্ষণের আগ্রহও।
অন্যদিকে বসতবাড়ি সম্প্রসারণ, রাস্তা নির্মাণ, কৃষিজমির পরিবর্তন এবং ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার কারণেও বেতের প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। ফলে বেত গাছের বিস্তার অনেক জায়গায় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
স্থানীয়দের স্মৃতিতে বেত শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, বরং ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির একটি অংশ। একসময় প্রায় ২০ থেকে ২২ হাত লম্বা একটি বেত ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত বলে স্থানীয়রা জানান। এখন সেই বেত খুঁজে পাওয়াই কঠিন। কোথাও পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি।
স্থানীয় বেত বিক্রেতা ঝালোবাড়ির মাধব ও পরান ঝালো জানান, কয়েক বছর আগেও এলাকায় বেতের বাগান ও ঝাড় দেখা যেত। কিন্তু এখন সেসব অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মানুষের চাহিদা কমে যাওয়ায় বেত সংরক্ষণ বা উৎপাদনের আগ্রহও কমেছে।
তাদের মতে, আগে বেতের তৈরি জিনিসপত্রের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও এখন প্লাস্টিকের সামগ্রী সহজেই সেই জায়গা দখল করেছে। ফলে বেতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষও আগের মতো বাজার পাচ্ছেন না।
বেত গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর ফল। বেতফল বিভিন্ন অঞ্চলে বেত্তুন, বেথুন, বেথুল, বেতগুলা, বেতগুটি বা বেত্তুইনসহ নানা নামে পরিচিত।
বেত গাছে সাধারণত আশ্বিন-কার্তিক মাসের দিকে ফুল আসে। এরপর ফল পরিপক্ব হয়ে চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে বাজারে বা স্থানীয়ভাবে খাওয়ার উপযোগী হয়। পাকা বেতফলের শাঁস নরম এবং স্বাদ সাধারণত টক-মিষ্টি ধরনের। কোনো কোনো অঞ্চলে ফল তুলনামূলক মিষ্টি, আবার কোথাও টক স্বাদের হয়ে থাকে।
গ্রামবাংলার শিশুদের কাছে এই ফল একসময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে কাঁচা বা পাকা বেতফল লবণ-মরিচ দিয়ে খেতেন। কোথাও আবার বেতফল দিয়ে তৈরি করা হতো চাটনি। টক স্বাদের বেতফলের সঙ্গে মরিচের ঝাল মিশে তৈরি হতো ভিন্ন স্বাদের একটি দেশীয় খাবার।
বেত মূলত কাঁটাযুক্ত, চিরসবুজ ও অরোহী পামজাতীয় উদ্ভিদ। এর কাণ্ড সাধারণত লম্বা, সরু ও নলাকার। কাণ্ডের গায়ে কাঁটা থাকে এবং এটি আশপাশের কোনো গাছ বা অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে ওপরে উঠতে পারে।
বেতের কাণ্ডের আগা থেকে নতুন পাতা বের হয়। গাছের বয়স ও বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিচের অংশ শক্ত ও পোক্ত হয়ে ওঠে। অনেক প্রজাতির বেতের কাণ্ডে এমন কাঁটাযুক্ত অংশ থাকে, যা অন্য উদ্ভিদ বা অবলম্বনকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
ফুল আসার আগে বেত গাছ থেকে এক ধরনের মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়ানোর কথাও স্থানীয় মানুষের মুখে শোনা যায়। সেই সময় মৌমাছি, পিঁপড়া ও বিভিন্ন ছোট পোকামাকড় গাছের কাছে ভিড় করে। প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে এভাবেই বেত গাছ একটি ছোট জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশের অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের কুটিরশিল্পের ইতিহাসে বেতের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই কোনো না কোনো বেতের সামগ্রী দেখা যেত।
বেত দিয়ে তৈরি হতো—চেয়ার ও টেবিল, মোড়া ও সোফা, ঝুড়ি ও টুকরি, ফুলের টব, দোলনা, লাঠি, চালোন, কৃষিকাজের বিভিন্ন উপকরণ, সংরক্ষণের পাত্র, গৃহসজ্জার নানা সামগ্রী।
বেতের তৈরি আসবাব শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাত না, এর নান্দনিক মূল্যও ছিল। শহুরে বাড়িতে বেতের চেয়ার, সোফা কিংবা টেবিল অনেক সময় আভিজাত্য ও রুচির প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
এখনও উন্নতমানের হ্যান্ডিক্রাফট ও গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরিতে বেতের ব্যবহার রয়েছে। তবে আগের তুলনায় এর পরিধি অনেকটাই কমেছে।
বেতের তৈরি পণ্য টেকসই হলেও এগুলো সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও তৈরি করতে শ্রম লাগে। অন্যদিকে প্লাস্টিকের পণ্য কারখানায় ব্যাপক হারে উৎপাদন করা যায় এবং বাজারে সহজেই পাওয়া যায়।
ফলে গ্রামীণ মানুষের জীবনেও প্লাস্টিকের প্রবেশ দ্রুত বেড়েছে। ঝুড়ি, বালতি, টব, বাক্স, আসবাবের বিভিন্ন অংশসহ অসংখ্য পণ্যে প্লাস্টিক এখন ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থানীয় ক্রেতা জয়নুল আবেদিনের মতে, প্রায় এক দশক আগেও বেত দিয়ে ঘরের প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস তৈরি করা হতো। কিন্তু এখন বেত দুষ্প্রাপ্য হওয়ার পাশাপাশি প্লাস্টিকের সহজলভ্যতাও এর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে শুধু একটি কুটিরশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা এবং প্রাকৃতিক উপকরণনির্ভর জীবনযাপনের একটি ঐতিহ্যও।
বেতফলকে স্থানীয়ভাবে পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন উৎসে বেতফলে প্রোটিন, পটাশিয়াম, পেকটিন, থায়ামিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলের মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক অ্যাসিড ও ট্যানিনের মতো উদ্ভিজ্জ যৌগও পাওয়া যেতে পারে।
তবে বেতফলের পুষ্টিগুণ বা সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। কোনো ফলের মধ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান থাকা মানেই সেটি কোনো রোগের চিকিৎসা করবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
গ্রামীণ সমাজে বেতফল ও বেতের বিভিন্ন অংশের কিছু লোকজ ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। এসব ব্যবহার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ হলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
বেতের ফল ও মূলকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় নানা ধরনের লোকজ চিকিৎসা-পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। কোথাও বেতফল হজমের সমস্যা বা আমাশয়ের মতো সমস্যায় খাওয়ার কথা বলা হয়। আবার কোথাও বেতের মূলের বিভিন্ন প্রস্তুতি ব্যবহার করার ঐতিহ্য রয়েছে।
তবে এসব দাবিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়, মূত্রনালির সমস্যা, পিত্তথলির সমস্যা কিংবা প্রজনন-সংক্রান্ত জটিলতার ক্ষেত্রে নিজে থেকে বেতের মূল, ফল বা কোনো ভেষজ প্রস্তুতি খাওয়া নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
উদাহরণ হিসেবে শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণমান বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেতের মূল ব্যবহারের যে লোকজ দাবি রয়েছে, সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। একইভাবে দাঁতের গোড়া শক্ত করা বা পিত্তথলির সমস্যা সারানোর দাবির ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
অর্থাৎ, বেতের ঐতিহ্যগত ব্যবহার অবশ্যই আমাদের সংস্কৃতি ও লোকজ জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করার আগে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
বেতের ফলের পাশাপাশি কিছু এলাকায় বেতের কচি কাণ্ড খাদ্য হিসেবেও ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলো বিভিন্নভাবে রান্না করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বেত শুধু একটি কুটিরশিল্পের কাঁচামাল নয়; গ্রামীণ জীবনে এর ব্যবহার ছিল বহুমুখী।
একই গাছ থেকে ফল, কাণ্ড এবং বিভিন্ন অংশের ব্যবহার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিল। তাই বেতের সংখ্যা কমে



