এনবি সংবাদ, আইটি ডেস্ক : একসময় সোশ্যাল মিডিয়া মানেই ছিল অর্কুট। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টুইটারের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার অনেক আগেই অনলাইন বন্ধুত্ব ও যোগাযোগের নতুন দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল এই প্ল্যাটফর্ম। সাইবার ক্যাফেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্কুট ব্যবহার, বন্ধুদের স্ক্র্যাপ পাঠানো এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার স্মৃতি আজও অনেকের কাছে নস্টালজিয়ার অংশ। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি আবার ফিরতে চলেছে? সম্প্রতি প্রতিষ্ঠাতা অর্কুট বুয়ুককোকতেনের বক্তব্য ঘিরে এমনই জল্পনা তৈরি হয়েছে।
অর্কুটকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা অর্কুট বুয়ুককোকতেনের একটি পোস্টের পর। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করার পাশাপাশি অর্কুটের ওয়েবসাইটে একটি খোলা চিঠিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে নতুনভাবে অর্কুট ফিরিয়ে আনার ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য মানুষের সমর্থনও চেয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা।
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার বর্তমান ব্যবহার নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উদ্দেশ্য কেবল লাইক, ভিউ ও শেয়ার বাড়ানো হওয়া উচিত নয়। বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রকৃত যোগাযোগ তৈরি এবং সম্পর্ক বজায় রাখাই হওয়া উচিত এর মূল লক্ষ্য।
তবে অর্কুটের প্রত্যাবর্তন নিয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। নতুন প্ল্যাটফর্ম কবে চালু হতে পারে, কী ধরনের সুবিধা থাকবে কিংবা পুরোনো অর্কুটের কোন বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনা হবে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আপাতত বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠাতার পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
একসময় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কাছে অর্কুট ছিল পরিচিত একটি নাম। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং অনলাইন কমিউনিটিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল এই প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার আগের সময়ে সাইবার ক্যাফে ছিল অর্কুট ব্যবহারের অন্যতম জায়গা।
The internet should help us find our people. Friendship. Community. A place to belong. Help me bring Orkut back in that spirit. Add your name at https://t.co/FO48fJMjEq and share your supporter card with someone you want to bring along. Love, Orkut https://t.co/zesE18Y3Fd
— Orkut Buyukkokten (@orkut) October 8, 2026
কিন্তু প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়াতেও প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। নতুন নতুন প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং ব্যবহারকারীদের অভ্যাস বদলে যাওয়ার ফলে অর্কুট ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারায়। একসময় বন্ধ হয়ে যায় পরিষেবাটি। পরবর্তী সময়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার—বর্তমানে এক্স—অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয়।
যাঁরা অর্কুটের জনপ্রিয়তার সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন, তাঁদের কাছে প্ল্যাটফর্মটির নাম এখনও আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, জেন জি-র অনেকের কাছেই অর্কুট মূলত পুরোনো ইন্টারনেট যুগের একটি নাম।
অর্কুট বুয়ুককোকতেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রকৃত যোগাযোগ গড়ে তোলার চেয়ে তাঁদের মনোযোগ ধরে রাখার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে অনলাইন যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দূরে থাকা বন্ধু, পরিবারের সদস্য কিংবা পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যবহারকারীরা যদি কেবল স্ক্রিনে সময় কাটানো, পোস্ট দেখা এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন, তাহলে প্রকৃত যোগাযোগের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়েই আলোচনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্কুট প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্যের মূল সুর হলো, প্রযুক্তি যেন মানুষের সম্পর্ককে শক্তিশালী করে, মানুষের মনোযোগকে শুধু নিজের মধ্যে আটকে না রাখে।
অর্কুট নতুনভাবে চালু হলে তার নকশা, ব্যবহারব্যবস্থা এবং গোপনীয়তা রক্ষার পদ্ধতি কেমন হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্য থেকে সামাজিক যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার ভাবনা সামনে এসেছে। তবে এই ধারণা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
বর্তমানে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ভিডিও, ছবি, লাইভ সম্প্রচার, ব্যক্তিগত বার্তা এবং নানা ধরনের কনটেন্টের আধিপত্য রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্কুট ফিরলে তাকে পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বর্তমান ব্যবহারকারীদের চাহিদার সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যবহারকারীর তথ্যের সুরক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশনের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এগুলোর কোনটি নতুন অর্কুটে থাকবে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠাতার পক্ষ থেকে নিশ্চিত ঘোষণা আসেনি।
অর্কুটকে ফিরিয়ে আনার ভাবনা সামনে আসার পর বহু মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরোনো ব্যবহারকারীদের কাছে এটি নস্টালজিয়ার বিষয় হলেও নতুন প্রজন্মের কাছে অর্কুট হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাস জানার একটি নতুন সুযোগ।
তবে মানুষের আগ্রহ বা সমর্থন থাকলেই যে প্ল্যাটফর্মটি দ্রুত চালু হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীদের জন্য কার্যকর পরিষেবা তৈরি করার মতো বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, অর্কুটের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্যে মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রকৃত সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার যে ভাবনা উঠে এসেছে, তা বাস্তবে রূপ পায় কি না, এখন সেদিকেই নজর। আপাতত অর্কুটের নতুন সংস্করণ চালুর নির্দিষ্ট তারিখ বা চূড়ান্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যের অপেক্ষায় থাকতে হবে।



