এনবি সংবাদ, অনলাইন : ভবিষ্যতে কী ঘটতে চলেছে, জীবনের পরবর্তী পদক্ষেপ শুভ হবে কি না, কিংবা অসুস্থতা থেকে মুক্তি মিলবে কি না—এমন প্রশ্ন মানুষের মনে আজও উঁকি দেয়। তবে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বছর আগে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রাচীন মানুষ যে পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। কোনও আধুনিক যন্ত্র বা জ্যোতিষশাস্ত্রের জটিল হিসাব নয়, ভাগ্যগণনার জন্য ব্যবহার করা হত পশুর পায়ের ছোট ছোট হাড়। আর সেই হাড় কীভাবে ফেলতে হবে, তার ফল কীভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে, সব নিয়ম লেখা থাকত পাথরের ফলকে!
তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন কিবিরা শহরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের মাধ্যমে এমনই একটি চুনাপাথরের ফলকের সন্ধান পাওয়া যায় ২০২৪ সালে। ফলকটির গায়ে খোদাই করা গ্রিক ভাষার লেখা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানতে পারেন, এটি ছিল প্রাচীন যুগের ভাগ্যগণনার নিয়মাবলি ও ফলাফল সংবলিত একটি নির্দেশিকা। প্রায় ১ হাজার ৮০০ বছরের পুরনো এই প্রত্নবস্তু প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবন এবং ভবিষ্যৎ জানার আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে এনেছে।
তুরস্কের প্রাচীন ইতিহাসে কিবিরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। একসময় এই শহরে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ জনপদ। শহরের প্রাচীন বাজার এলাকার একটি উপাসনালয়ে খনন চালানোর সময় উদ্ধার হয় রহস্যময় চুনাপাথরের ফলকটি।
প্রথম দেখায় ফলকটিকে সাধারণ কোনও প্রাচীন শিলালিপি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর চারদিকে খোদাই করা গ্রিক ভাষার লেখাগুলি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতেই সামনে আসে অন্য তথ্য। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফলকটিতে ভাগ্যগণনার বিভিন্ন ফলাফল, দেবতাদের নাম এবং মানুষের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ লেখা ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু ফলকটির বয়সে সীমাবদ্ধ নয়। এটি থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন সমাজে ভাগ্যগণনা কীভাবে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হত। অর্থাৎ, মানুষ নিজের ইচ্ছামতো কোনও ফলের ব্যাখ্যা করত না; বরং হাড় ফেলার পর যে ফল পাওয়া যেত, তার সঙ্গে ফলকে লেখা নির্দেশনা মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হত।
প্রাচীনকালের এই ভাগ্যগণনার পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হত ভেড়া, ছাগল কিংবা বাছুরের পায়ের গাঁটের ছোট হাড়। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণায় এ ধরনের হাড়কে সাধারণত অ্যাস্ট্রাগালাস (Astragalus) বলা হয়। এগুলি দেখতে ছোট হলেও নির্দিষ্ট কয়েকটি পিঠের ওপর ভর করে পড়তে পারে।
ভাগ্যগণনার সময় একসঙ্গে পাঁচটি হাড় ছুড়ে দেওয়া হত। প্রতিটি হাড়ের বিভিন্ন পিঠের সঙ্গে যুক্ত ছিল নির্দিষ্ট সংখ্যামান—১, ৩, ৪ এবং ৬। হাড়গুলি ছুড়ে দেওয়ার পর কীভাবে সেগুলি মাটিতে বা নির্দিষ্ট স্থানে পড়ল, তার ওপর ভিত্তি করে ফল নির্ধারণ করা হত।
এরপর প্রাপ্ত ফলের সঙ্গে পাথরের ফলকে খোদাই করা নির্দেশনা মিলিয়ে দেখা হত। সেখানে সংশ্লিষ্ট দেবতার নামের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বার্তা বা পরামর্শও থাকত।
এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, একই ধরনের হাড় ব্যবহার করেও বিভিন্ন বিন্যাস তৈরি হতে পারত। ফলে হাড়গুলির অবস্থান ও সংখ্যার সমন্বয়ে একাধিক ফল পাওয়া সম্ভব হত। কিবিরার ফলকে এমন ৫৬ ধরনের ফলাফলের উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়।
আজকের দৃষ্টিতে বিষয়টি অনেকটা পাশা ফেলার মতো মনে হতে পারে। তবে প্রাচীন মানুষের কাছে এটি ছিল নিছক খেলা নয়; বরং দেবতাদের ইচ্ছা বা বার্তা বোঝার একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতি।
প্রাচীন গ্রিক ধর্মবিশ্বাসে দেবতাদের মানুষের জীবন ও ভাগ্যের ওপর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হত। তাই ভাগ্যগণনার ফলাফলের সঙ্গে দেবতাদের নাম যুক্ত থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়।
কিবিরার পাথরের ফলকে বিভিন্ন ফলাফলের সঙ্গে দেবতাদের নাম এবং পরামর্শের উল্লেখ পাওয়া যায়। কোনও নির্দিষ্ট ফলকে জিউসের বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হত। আবার অ্যাপোলোর সঙ্গে যুক্ত একটি নির্দেশনায় তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
এই ধরনের বার্তা মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারত। যেমন, কোনও কাজ শুরু করার আগে অপেক্ষা করা উচিত কি না, ভ্রমণে বেরোনো ঠিক হবে কি না কিংবা কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য মানুষ ভাগ্যগণনার সাহায্য নিত।
তবে দেবতাদের নামে দেওয়া প্রতিটি বার্তার নির্দিষ্ট অর্থ কী ছিল, তা বোঝার জন্য ফলকের সম্পূর্ণ পাঠ ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, প্রাচীন গ্রিক ভাষার শব্দ, ধর্মীয় প্রতীক এবং সে সময়কার সামাজিক রীতিনীতি বুঝেই এই নির্দেশনাগুলির যথাযথ ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
প্রাচীন মানুষের জীবনেও অনিশ্চয়তার অভাব ছিল না। দীর্ঘ যাত্রায় বেরোনোর আগে পথ নিরাপদ হবে কি না, ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত কি না, কিংবা পরিবারের কারও অসুস্থতা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন—এসব প্রশ্ন তাঁদেরও ভাবিয়ে তুলত।
কিবিরার ফলকে সংরক্ষিত নির্দেশনাগুলি থেকে বোঝা যায়, ভাগ্যগণনা কেবল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কৌতূহল মেটানোর জন্য ব্যবহার করা হত না। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ হয়তো দূরবর্তী কোনও স্থানে যাওয়ার আগে শুভ সময় জানতে চাইতেন। আবার কোনও ব্যবসায়ী কেনাকাটা বা বাণিজ্যিক লেনদেনের আগে ভাগ্য যাচাই করতে চাইতেন। অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত উদ্বেগের সময়ও মানুষ এ ধরনের পদ্ধতির সাহায্যে আশ্বাস খুঁজতে পারত।
তবে ফলকটি থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি ঠিক কী ধরনের প্রশ্ন করতেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায় কি না, তা নির্ভর করে শিলালিপির পাঠ ও গবেষণার বিস্তারিত তথ্যের ওপর। তাই প্রাচীন মানুষের সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে নিশ্চিত তথ্য এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
ফলকটি যে জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে, সেটিও গবেষকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি পাওয়া যায় প্রাচীন কিবিরার বাজার এলাকার একটি উপাসনালয় থেকে। ফলকের গোড়ায় গ্রিক দেবতা হার্মিসের মূর্তি স্থাপনের ইঙ্গিত রয়েছে বলেও জানা যায়।
গ্রিক পুরাণে হার্মিস ছিলেন দেবতাদের বার্তাবাহক। পাশাপাশি বাণিজ্য, যাত্রা এবং পথিকদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। ফলে বাজার এলাকার কাছে হার্মিসের উল্লেখ থাকা ফলকটির ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
বাজার ছিল প্রাচীন শহরের মানুষের সমাগমস্থল। সেখানে ব্যবসায়ী, ক্রেতা, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ফলে বাজারের কাছাকাছি উপাসনালয়ে এমন একটি ফলক রাখা থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটি ব্যবহার করা তুলনামূলক সহজ হতে পারত।
অবশ্য ফলকটি ঠিক কীভাবে ব্যবহার করা হত, সেখানে নিয়মিত ভাগ্যগণনা পরিচালনা করতেন কোনও পুরোহিত বা বিশেষ ব্যক্তি কি না, কিংবা সাধারণ মানুষ নিজেরাই নির্দেশনা অনুসরণ করতেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক তথ্য প্রয়োজন।
কিবিরার ফলকের গায়ে খোদাই করা লেখাগুলি বিশ্লেষণের সময় গবেষকেরা অন্য শহরে ব্যবহৃত একই ধরনের ভাগ্যগণনার ফলকের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। এই তুলনার উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন অঞ্চলে একই পদ্ধতি প্রচলিত ছিল কি না এবং ফলাফলের ভাষা ও ব্যাখ্যায় কতটা মিল পাওয়া যায়, তা বোঝা।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে কিছু ক্ষেত্রে বানান ও ছন্দের অসংগতি ধরা পড়েছে বলে জানা যায়। প্রাচীন শিলালিপিতে এ ধরনের পার্থক্য অস্বাভাবিক নয়। কোনও লেখা স্থানীয়ভাবে তৈরি হতে পারে, আবার কোথাও প্রচলিত কোনও নির্দেশিকা অনুসরণ করে তা খোদাই করা হয়ে থাকতে পারে। সময়ের সঙ্গে ভাষার ব্যবহার ও লেখার রীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
তাই শুধু একটি ফলক বিশ্লেষণ করেই পুরো প্রাচীন সমাজে ভাগ্যগণনার প্রচলন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। বিভিন্ন স্থানের প্রত্নবস্তু, ঐতিহাসিক নথি এবং ভাষাগত বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিচার করলে তবেই এই প্রথার বিস্তার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এই আবিষ্কার সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—পশুর হাড় ছুড়ে কি সত্যিই ভবিষ্যৎ জানা সম্ভব ছিল?
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পদ্ধতিতে ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে জানার কোনও প্রমাণ নেই। হাড় কীভাবে পড়বে, তা নির্ভর করে নিক্ষেপের ধরন, হাড়ের গঠন এবং অন্যান্য ভৌত পরিস্থিতির ওপর। হাড়ের অবস্থান থেকে কোনও ঘটনার ভবিষ্যৎ নির্ভরযোগ্যভাবে অনুমান করা যায়—এমন দাবির পক্ষে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই।
তবে প্রাচীন মানুষের কাছে এই প্রথার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ছিল। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষ অনেক সময় ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং প্রতীকী পদ্ধতির সাহায্যে মানসিক নিশ্চয়তা খোঁজে। ভাগ্যগণনাও সেই বৃহত্তর মানবিক প্রবণতার একটি উদাহরণ হতে পারে।
এই ধরনের প্রত্নবস্তু তাই ভবিষ্যৎ জানার কোনও কার্যকর বৈজ্ঞানিক কৌশল হিসেবে নয়, বরং অতীতের মানুষের চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস এবং সামাজিক জীবন বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিবিরার চুনাপাথরের ফলকটি প্রমাণ করে, প্রায় ১ হাজার ৮০০ বছর আগে মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে কতটা আগ্রহী ছিল। যাত্রা, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—জীবনের নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁরা দেবতাদের নির্দেশ খুঁজতেন।
পাঁচটি ছোট পশুর হাড় ছুড়ে তার ফল একটি পাথরের ফলকে লেখা নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার এই পদ্ধতি আজকের মানুষের কাছে অভিনব মনে হলেও প্রাচীন সমাজে তা ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই—এটি শুধু একটি প্রাচীন ভাগ্যগণনার কৌশলের কথা জানায় না, বরং অতীতের মানুষ কীভাবে অজানাকে বোঝার চেষ্টা করত, তারও বিরল সাক্ষ্য বহন করে। ভবিষ্যৎ সত্যিই জানা যেত কি না, সেই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর না মিললেও প্রাচীন মানুষের বিশ্বাসের ইতিহাসে এই ফলক নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান নিদর্শন।



