এনবি সংবাদ ডেস্ক : শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারত ও বাংলাদেশের টানা ছুটিতে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত বেড়েছে। চিকিৎসা, ব্যবসা ও দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রতিদিনই ভারত যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। গত চার দিনে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ২০ হাজার ৬৮৩ জন পাসপোর্টধারী যাত্রী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করেছেন বলে জানা গেছে।
তবে যাত্রীদের সংখ্যা বাড়লেও বেনাপোল আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি না থাকা, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পৃথক লাইনের ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাঁদের।
যাত্রীদের অভিযোগ, ভ্রমণকর ও বিভিন্ন ফি বাড়লেও সেই তুলনায় সেবার মান বাড়েনি। অন্যদিকে, যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে পারাপার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারত ও বাংলাদেশের ছুটি মিলিয়ে টানা আট দিনের অবকাশে অনেকেই পরিবার নিয়ে ভারতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন। কেউ যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য, কেউ ব্যবসায়িক কাজে, আবার কেউ ছুটি কাটাতে বেছে নিচ্ছেন ভারতের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান।
এ কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত বেড়েছে। গত চার দিনে ২০ হাজার ৬৮৩ জন যাত্রী দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করেছেন। ছুটির বাকি দিনগুলোতেও যাত্রীর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামলাতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এবং প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তি বাড়ছে।
বেনাপোল আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে যাত্রীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করা নিয়ে। যাত্রীদের ভাষ্য, ভোর থেকেই অনেকে ভারত যাওয়ার জন্য টার্মিনালে এসে লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি না থাকায় তাঁদের দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা করতে হয়।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অনেক যাত্রী ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কারও কারও পক্ষে অসুস্থ শরীর নিয়ে লাইনে অপেক্ষা করাও কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রবীণ, ক্যানসারে আক্রান্ত এবং গুরুতর অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কষ্টকর।
যাত্রীদের দাবি, বন্দরে পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হলে অপেক্ষার সময় কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে। পাশাপাশি যাত্রীদের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সেবার পরিকাঠামো উন্নত করা প্রয়োজন।
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে প্রবীণ নাগরিক, মুক্তিযোদ্ধা, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী এবং গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পৃথক লাইনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
ফলে শারীরিক অসুস্থতা বা বয়সজনিত সমস্যার কারণে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে তাঁদের বাড়তি দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে। যাত্রীদের মতে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আলাদা লাইন চালু করা হলে তাঁদের পক্ষে দ্রুত ও স্বস্তিতে যাতায়াত করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। তাঁদের দাবি, যাত্রীসেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দালালদের তৎপরতা বন্ধ করা এবং টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
ভারত ভ্রমণে বিভিন্ন কর ও ফি পরিশোধ করতে হয় পাসপোর্টধারী যাত্রীদের। যাত্রীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একজন পাসপোর্টধারীকে ১ হাজার টাকা ভ্রমণকর এবং ৬২ টাকা বন্দর ফি দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি ভারতীয় অংশে ৪০০ রুপি ভ্রমণকর দিতে হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
যাত্রীদের দাবি, গত পাঁচ বছরে কর ও ফি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। তবে সেই অনুপাতে যাত্রীসেবার মান বাড়েনি। তাঁদের মতে, সরকারি রাজস্ব পরিশোধের পাশাপাশি যাত্রীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।
যাত্রীদের অভিযোগ, ভ্রমণের শুরুতেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাই কর ও ফি আদায়ের পাশাপাশি সেবার মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
বেনাপোল বন্দর দিয়ে যাত্রী পারাপারের কার্যক্রম প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয়। তবে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, ভিআইপি পরিচয়ে কিছু যাত্রী আগে পারাপারের সুযোগ পান। এতে একই নিয়মে কর ও ফি পরিশোধ করার পরও সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
পাসপোর্টধারী আনিসুর রহমান জানান, যাত্রী পারাপারের ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান নিয়ম কার্যকর থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হলেও বিশেষ পরিচয়ের কারণে কেউ আগে যাওয়ার সুযোগ পেলে সেবার ক্ষেত্রে সমতা বজায় থাকে না।
ভারতগামী কয়েকজন যাত্রীও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দুর্গাপূজার ছুটিতে চিকিৎসা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘ অপেক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে যাত্রার শুরুতেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
বেনাপোল বন্দর চেকপোস্ট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দীন বলেন, ছুটির সময়ে যাত্রীদের চাপ বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি নির্মাণ এবং বিশেষ শ্রেণির যাত্রীদের জন্য পৃথক লাইনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে যাতায়াত আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, অপেক্ষার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা এবং প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং পারাপারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক রুহুল আমিন জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে বন্দরে যাত্রীদের যাতায়াত বেড়েছে। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা এবং ভোগান্তি কমিয়ে নিরাপদে পারাপারের ব্যবস্থা করতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে বন্দরে জায়গা অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে যাত্রীছাউনি, পৃথক লাইন এবং সুশৃঙ্খল পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দুর্গাপূজার মতো ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।



