সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeরাজনীতিআওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের বিরোধ, নেপথ্যে কী?

আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের বিরোধ, নেপথ্যে কী?

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে জামায়াতে ইসলামী সংসদে তাদের সমর্থন দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। সেই সরকারে জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে একই মঞ্চে থাকা এই দুই রাজনৈতিক দল এখন একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখছে। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতা বা রাজনৈতিক আঁতাতের অভিযোগ ঘিরে দুই দলের মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। এ খবর বিবিসি বাংলা অনইনের।

বিএনপির অভিযোগ, সরকারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করছে। অন্যদিকে জামায়াত এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে। বরং দলটির নেতারা পাল্টা অভিযোগ তুলছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে।

কিন্তু হঠাৎ করে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে এমন অবিশ্বাস তৈরি হলো কেন? এর পেছনে কি সত্যিই কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার তথ্য রয়েছে, নাকি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিরোধের জেরে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক কৌশল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধের পেছনে রয়েছে ক্ষমতার সমীকরণ, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন, সংসদীয় রাজনীতিতে অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে দুই দল একসঙ্গে সরকার পরিচালনা করেছে, আবার ক্ষমতার বাইরে থেকেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে জামায়াতে ইসলামী সংসদে তাদের সমর্থন দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। সেই সরকারে জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে দুই দলকে একসঙ্গে দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে ২০ দলীয় জোটেও তারা দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল।

তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুই দলের সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে বিএনপি সরকার পরিচালনা করছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ফলে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি রাজশাহীর একটি জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ তোলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি দাবি করেন, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এমন তথ্য রয়েছে, যার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের লোকজন দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করছে। এ কাজে দেশের ভেতরের একটি রাজনৈতিক পক্ষ সহায়তা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও দেশের একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এ বিষয়ে সমন্বয় থাকতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বিএনপির অন্য নেতারাও জামায়াতের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলতে শুরু করেন।

বিএনপির নেতাদের ধারণা, জামায়াতে ইসলামী সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যার সুযোগ নিতে পারে আওয়ামী লীগ।

তবে বিএনপির এই অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি।

বিএনপির অভিযোগের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দলীয় কার্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাধা দেওয়া হয়েছে। এমন একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত হওয়ার অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে হামিদুর রহমান আযাদ বিএনপির বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ তোলেন।

তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পাননি। অথচ বিএনপি বিভিন্ন সময়ে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন, সভা ও মিছিল করার সুযোগ পেয়েছে।

এই পরিস্থিতিকে সামনে এনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কার রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল, সেটি নিয়ে বিএনপির নেতাদের আগে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত।

অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ নয়, বরং আওয়ামী লীগের সঙ্গে কার সম্পর্ক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল, সেই প্রশ্নেও শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ।

বিএনপির নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত নিয়ে তাদের সন্দেহের পেছনে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে।

প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উল্লেখ করা গোয়েন্দা তথ্য। বিএনপির দাবি, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির পেছনে আওয়ামী লীগের অর্থায়ন এবং একটি রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, জামায়াতে ইসলামীর সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি। বিএনপির নেতারা মনে করছেন, বিরোধী দলের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এ বিষয়ে জামায়াতের আগের কিছু বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জামায়াতের পক্ষ থেকে দলটির নেতাকর্মীদের ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়ে বক্তব্য এসেছিল। এ ধরনের বক্তব্য থেকেই জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

রিজভীর অভিযোগ, জামায়াত এখন গোপনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তবে এমন রাজনৈতিক তৎপরতার পরিণতি দেশের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

তৃতীয়ত, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সংবিধান ও জুলাই সনদ নিয়ে চলমান বিরোধ। এই বিষয়টিই দুই দলের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সাম্প্রতিক মতবিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু জুলাই সনদ।

জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের দাবি, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিজেদের আপত্তি ও নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে চায়। দলটির অবস্থান, যেসব প্রস্তাবে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা ছাড়া সবকিছু হুবহু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

এই মতপার্থক্য থেকেই দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।

জামায়াত ও তাদের মিত্ররা মনে করছে, বিএনপি জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসছে। অন্যদিকে বিএনপির বক্তব্য, সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হলে তার একটি গ্রহণযোগ্য আইনি ভিত্তি থাকতে হবে।

ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

জুলাই সনদের পাশাপাশি সংবিধান নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থানেও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো সংবিধানের ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে। তাদের দাবি, শুধু কিছু ধারা পরিবর্তন বা সংশোধন করলেই রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আসবে না। বরং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে।

অন্যদিকে বিএনপি সংবিধান সংশোধনের প্রচলিত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আনতে আগ্রহী। দলটির নেতারা মনে করেন, সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইনগত বৈধতা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

এই মতপার্থক্যের কারণে সংসদে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা তৈরি হয়নি।

বিরোধী দলগুলো বিএনপির প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানিয়ে সংসদীয় কার্যক্রম বর্জনের অবস্থান নিয়েছে।

এতে সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন না থাকলে জাতীয় ঐকমত্য ও সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিএনপির আশঙ্কা, বিরোধী দলগুলো যদি নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে, তাহলে সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আলোচনায় এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, জুলাই সনদ ও সংবিধান নিয়ে জামায়াতের অবস্থান পরিবর্তনে চাপ তৈরি করতেই কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ সামনে আনছে বিএনপি?

বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যে এই বিরোধের একটি রাজনৈতিক দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তাঁর মতে, বিরোধী দলগুলো সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের দাবিতে অনড় থাকলে তা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করতে পারে। আর রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতার সুযোগ নিতে পারে আওয়ামী লীগ।

অর্থাৎ বিএনপির যুক্তি হচ্ছে, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে অতীতের ক্ষমতাসীন শক্তি আবার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে।

তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, জামায়াতকে চাপে রাখার জন্য তাঁরা আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ সামনে আনছেন না। তাঁদের দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁরা এ বিষয়ে কথা বলছেন।

অন্যদিকে জামায়াতের নেতারা মনে করছেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয় থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেই বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলছে।

হামিদুর রহমান আযাদের দাবি, সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। তাই জনগণের সামনে নতুন বিতর্ক তৈরি করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

দুই দলের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বিএনপি ও জামায়াত যখন একে অপরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলছে, তখন দলটির নিজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকে দেশ ছেড়ে যান। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে বিএনপি বা জামায়াতের কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিম দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ বিএনপি, জামায়াত কিংবা এনসিপির সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা করে কাজ করছে না।

তাঁর বক্তব্য, এসব রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য নেই। আওয়ামী লীগ বরং বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে রাজনীতি করতে চায়।

অর্থাৎ আওয়ামী লীগও বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তবে দলটির এই বক্তব্যের পাশাপাশি বিএনপি যে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলছে, সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়ায় পুরো বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও দলটিকে ঘিরে বিতর্ক থেমে নেই। বরং বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার বিরোধের কারণে দলটি আবার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

গত প্রায় এক বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন বক্তব্য, বিবৃতি ও ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস মনে করেন, বিএনপি ও জামায়াত একে অপরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তোলার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগকেই রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলছে।

তাঁর মতে, কোন পক্ষের অভিযোগ সত্য, তা সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে যাচাই করা কঠিন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন বক্তব্য জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও মনে করেন, দেশের রাজনীতিতে যে স্থিতিশীল, গঠনমূলক ও জনকল্যাণমূলক পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সমস্যা সমাধান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে একে অপরকে দোষারোপ করছে।

অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসের মতে, এই ধরনের রাজনীতি অতীতের দোষারোপের সংস্কৃতিকেই ফিরিয়ে আনছে। এতে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বর্তমান বিরোধ কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার, সংসদীয় রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ।

বিএনপি চায় সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে। অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা আরও ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানাচ্ছে।

এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা না হলে রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগও রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে ওঠা অভিযোগগুলোর পক্ষে প্রকাশ্যে চূড়ান্ত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ সামনে আসেনি। আওয়ামী লীগও দুই দলের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন শুধু আওয়ামী লীগের সঙ্গে কার আঁতাত রয়েছে, তা নয়। বরং রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা কতটা সম্ভব, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দোষারোপের সংস্কৃতি চলতে থাকলে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সংস্কারের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ