এনবি সংবাদ, অনলাইন : ডাইনোসর পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর পৃথিবীর জীবজগতে শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। সেই সময়েই নাকি আবির্ভাব হয়েছিল এমন এক প্রাণীর, যারা আজও রাতের আকাশে উড়ে বেড়ায়। তারা হল বাদুড়। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে, ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীতে আবির্ভাব হতে পারে বাদুড়ের।
শুধু তাই নয়, এত দিন বাদুড়ের উৎপত্তিস্থল নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, গবেষণাটি সেই প্রশ্নেরও নতুন উত্তর সামনে এনেছে। গবেষকদের ধারণা, পৃথিবীর প্রথম বাদুড়ের আবির্ভাব হয়েছিল ইউরোপে। পরে সেখান থেকে তারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আফ্রিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
বর্তমানে পৃথিবীতে বাদুড়ের দেড় হাজারেরও বেশি জীবিত প্রজাতি রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় প্রতিটি মহাদেশেই তাদের দেখা যায়। কেউ গুহায় থাকে, কেউ গাছের কোটরে, আবার কেউ শহরের পুরনো বাড়ি বা নিরিবিলি অন্ধকার জায়গাকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়।
কিন্তু এত বিপুল বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও বাদুড়ের বিবর্তনের ইতিহাস বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই ধোঁয়াশায় ঢাকা ছিল। এর প্রধান কারণ, বাদুড়ের জীবাশ্ম অত্যন্ত দুর্লভ। প্রাণীদের শরীরের নরম অংশ সাধারণত সহজে জীবাশ্মে পরিণত হয় না। বাদুড়ের হালকা ও তুলনামূলক সূক্ষ্ম হাড়ও দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত থাকা কঠিন।
এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে পুরনো বাদুড়ের জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫ কোটি ২০ লক্ষ বছর। সেটি উত্তর আমেরিকায় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, সেই জীবাশ্মই বাদুড়ের জন্মের প্রথম প্রমাণ নয়। তাদের আবির্ভাব তারও অন্তত কয়েক কোটি বছর আগে হয়ে থাকতে পারে।
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবী থেকে ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটে। এরপর পৃথিবীর পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বহু প্রাণী হারিয়ে গেলেও নতুন প্রাণীদের বিবর্তনের জন্য তৈরি হয় নানা সুযোগ।
গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের সময়ের খুব কাছাকাছি, আনুমানিক ৬ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে বাদুড়ের আবির্ভাব হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ ডাইনোসরের বিলুপ্তির মাত্র কয়েক লক্ষ বছর পরেই পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যে বাদুড়ের প্রবেশ ঘটেছিল বলে ইঙ্গিত মিলছে।
অবশ্য এই সময়কাল সরাসরি কোনও প্রাচীন বাদুড়ের জীবাশ্ম থেকে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং জিনগত তথ্য এবং পাওয়া জীবাশ্মের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সময়ের অনুমান করেছেন। ফলে এটি বাদুড়ের বিবর্তনের একটি সম্ভাব্য সময়কাল, চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
বাদুড়ের উৎপত্তি কোথায় হয়েছিল, সেটি দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে বড় প্রশ্ন ছিল। উত্তর আমেরিকা, এশিয়া কিংবা আফ্রিকার কোনও অঞ্চলকে সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
নতুন গবেষণায় অবশ্য ইউরোপের দিকে জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাদুড়ের প্রাথমিক বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ইউরোপ। সেখান থেকেই খুব দ্রুত তারা আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরিবেশে অভিযোজনের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও তাদের বিস্তার ঘটে।
এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমানে বাদুড়ের প্রজাতি বিশ্বের নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকলেও তাদের প্রাচীন বিবর্তনের কেন্দ্র কোথায় ছিল, সে বিষয়ে এত দিন নিশ্চিত ধারণা ছিল না।
বাদুড়ের বিবর্তনের রহস্য উন্মোচনের জন্য বিজ্ঞানীরা শুধু জীবাশ্মের উপর নির্ভর করেননি। তাঁরা আধুনিক বাদুড়ের জিনগত তথ্যও বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষণায় ১০৩টি বাদুড় প্রজাতির জিনোম এবং ৪৪টি বাদুড়ের জীবাশ্মের তথ্য একসঙ্গে পরীক্ষা করা হয়। জিনগত পরিবর্তনের ধারার সঙ্গে জীবাশ্মের বয়স ও বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা বাদুড়ের বিবর্তনের একটি সম্ভাব্য সময়রেখা তৈরি করার চেষ্টা করেন।
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সোঞ্জা ভার্নেস, ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের অধ্যাপক এমা টিলিং এবং আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গবেষক আরিয়াদনা মোরালেস-সহ একাধিক বিজ্ঞানী। গবেষণাটি ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
বাদুড়কে অন্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর থেকে আলাদা করে তার উড়তে পারার ক্ষমতা। কিন্তু শুধু উড়তে পারাই নয়, অন্ধকারে পথ খুঁজে খাবার ধরার জন্য তাদের রয়েছে আরও একটি অসাধারণ ক্ষমতা—ইকোলোকেশন।
ইকোলোকেশন হল শব্দ বা প্রতিধ্বনির সাহায্যে আশপাশের বস্তুর অবস্থান, দূরত্ব এবং আকার সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার একটি জৈবিক ব্যবস্থা। বাদুড় উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে। সেই শব্দ কোনও বস্তুতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলে তার প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণ করে তারা আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা করতে পারে।
নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, বাদুড়ের বিবর্তনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই এই ক্ষমতা বিকশিত হতে পারে।
এর ফলে রাতের অন্ধকারে শিকার খোঁজা অনেক সহজ হয়ে যায়। দিনের বেলায় পাখিদের সঙ্গে খাবারের জন্য প্রতিযোগিতা না করেও তারা নিজেদের জন্য আলাদা একটি পরিবেশগত জায়গা তৈরি করতে পেরেছিল।
বাদুড়ের নিশাচর জীবনযাপনও তাদের বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞানীদের মতে, ইকোলোকেশন তাদের রাতের অন্ধকারে সক্রিয় থাকতে বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল।
দিনের আলোয় পাখিরা আকাশে উড়ে শিকার করে। সেই সময় বাদুড় সক্রিয় থাকলে তাদের খাবার ও বাসস্থানের জন্য পাখিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হত। পাশাপাশি দিনের শিকারি প্রাণীদেরও মুখোমুখি হতে পারত তারা।
কিন্তু রাতের অন্ধকারে ইকোলোকেশন ব্যবহার করে বাদুড় নিজেদের জন্য একটি আলাদা পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়। ফলে ধীরে ধীরে নিশাচর জীবনযাপন তাদের বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।
এখানেই গবেষণার সবচেয়ে বড় রহস্যগুলির একটি এখনও রয়ে গিয়েছে। প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে যে বাদুড়ের আবির্ভাব হয়েছিল, তাদের চেহারা কেমন ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
কারণ সেই সময়ের বাদুড়ের সরাসরি জীবাশ্ম এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। গবেষকদের অনুমান, প্রাচীন বাদুড় হয়তো দেখতে অনেকটা ছোট গেছো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো ছিল। ধীরে ধীরে তাদের সামনের পায়ের আঙুল লম্বা হতে শুরু করেছিল এবং সেই পরিবর্তন থেকেই পরবর্তী সময়ে ডানার গঠন তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তবে এটি এখনও একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান। এর পক্ষে সরাসরি জীবাশ্ম প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হল, ৫ কোটি ২০ লক্ষ বছর আগের যে প্রাচীনতম বাদুড়ের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে, সেটি দেখতে ইতিমধ্যেই অনেকটা আধুনিক বাদুড়ের মতো। অর্থাৎ উড়তে সক্ষম বাদুড়ের শারীরিক গঠন তারও আগে কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই মধ্যবর্তী বিবর্তনের ধাপ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
নতুন গবেষণা তাই শুধু বাদুড়ের উৎপত্তির সম্ভাব্য সময়ই সামনে আনেনি, বরং তাদের প্রথম আবির্ভাবের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়েও নতুন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।
ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর পৃথিবীর জীবজগতে যে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, সেই সময়েই বাদুড়ের বিবর্তনের সূচনা হয়ে থাকতে পারে। ইউরোপ থেকে তাদের বিস্তার আফ্রিকা এবং পরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে বাদুড়ের বিবর্তনের গল্প এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাদের প্রথম পূর্বপুরুষ দেখতে কেমন ছিল, উড়তে পারার ক্ষমতা আগে নাকি ইকোলোকেশন আগে বিকশিত হয়েছিল, কিংবা ঠিক কোন পরিবেশে প্রথম বাদুড়ের জন্ম হয়েছিল—এমন একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত।
ভবিষ্যতে আরও জীবাশ্ম আবিষ্কার হলে হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ও সামনে আসবে। তখন পৃথিবীর রাতের আকাশের এই পরিচিত উড়ন্ত প্রাণীটির কোটি কোটি বছরের পুরনো ইতিহাস আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে।



