সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeএক্সক্লুসিভমিলনের পরই সঙ্গীকে খেয়ে ফেলে স্ত্রী মাকড়সা! মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও কেন প্রজননে...

মিলনের পরই সঙ্গীকে খেয়ে ফেলে স্ত্রী মাকড়সা! মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও কেন প্রজননে ঝাঁপায় পুরুষরা?

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ মাকড়সারাও নিজেদের বাঁচানোর জন্য নানা কৌশল ব্যবহার করতে পারে। মিলন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সরে যাওয়া তার মধ্যে অন্যতম। কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ মাকড়সা স্ত্রীকে রেশমের সুতোয় আটকে রাখার মতো আচরণও করতে পারে, যাতে সে সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করতে না পারে।

এনবি সংবাদ ডেস্ক : প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াই কখনও কখনও এতটাই কঠিন যে প্রজননও হয়ে উঠতে পারে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। মানুষের কাছে যৌন মিলন যেখানে সাধারণত সম্পর্ক ও প্রজননের সঙ্গে যুক্ত, প্রাণিজগতে তার চিত্র অনেক বেশি বিচিত্র। এমনকি কিছু মাকড়সার ক্ষেত্রে মিলনের পর পুরুষটির সামনে যেন দুটি পথ থাকে—প্রজনন করবে, নাকি প্রাণ বাঁচাবে!

কারণ, কিছু প্রজাতির স্ত্রী মাকড়সা যৌন মিলনের পর পুরুষ সঙ্গীকে আক্রমণ করে এবং কখনও কখনও তাকে খেয়েও ফেলে। প্রাণিজগতের এই আচরণকে বিজ্ঞানীরা যৌন নরখাদকতা বা sexual cannibalism হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব স্ত্রী মাকড়সাই মিলনের পর পুরুষকে খেয়ে ফেলে। বরং নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতিতে এমন আচরণ দেখা যায়।

চীনের Aterigena aculeata প্রজাতির ফানেল মাকড়সাকে ঘিরে গবেষণায় আরও একটি অদ্ভুত আচরণের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, স্ত্রী মাকড়সা কখনও কখনও নিজের শরীর গুটিয়ে এমনভাবে স্থির হয়ে থাকে, যেন সে মৃত।

প্রথম নজরে বিষয়টি বেশ অবাক করার মতো। কারণ সাধারণভাবে কোনো প্রাণীকে মৃতের মতো পড়ে থাকতে দেখা গেলে তার পেছনে শিকারির হাত থেকে বাঁচার কৌশল কাজ করতে পারে। অনেক প্রাণী বিপদের সময় নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়ে মৃত সাজার চেষ্টা করে। এতে শিকারি বিভ্রান্ত হতে পারে এবং কখনও কখনও আক্রমণ না করেই চলে যায়।

কিন্তু এই মাকড়সার ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও জটিল।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্ত্রী মাকড়সার এই স্থির হয়ে থাকার আচরণ পুরুষকে কাছে আসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ স্ত্রী মাকড়সা যখন শরীর গুটিয়ে স্থির থাকে, তখন পুরুষ মাকড়সা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে করে তার কাছে পৌঁছে মিলনে অংশ নিতে পারে।

এরপর পরিস্থিতি আবার বদলে যেতে পারে।

পুরুষ মাকড়সার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে যৌন মিলন শেষ হওয়ার পর। কারণ তখন তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়—সঙ্গিনীর কাছ থেকে সরে যাবে, নাকি সেখানে থেকে যাবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ মাকড়সারাও নিজেদের বাঁচানোর জন্য নানা কৌশল ব্যবহার করতে পারে। মিলন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সরে যাওয়া তার মধ্যে অন্যতম। কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ মাকড়সা স্ত্রীকে রেশমের সুতোয় আটকে রাখার মতো আচরণও করতে পারে, যাতে সে সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করতে না পারে।

অর্থাৎ এখানে শুধু স্ত্রী মাকড়সার আক্রমণাত্মক আচরণই নয়, পুরুষটির আত্মরক্ষার কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতির এই অদ্ভুত সম্পর্ক অনেকটা এমন—প্রজননের জন্য দুজনেরই একে অপরের প্রয়োজন, কিন্তু সেই একই সম্পর্কের শেষে একজনের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।

স্ত্রী মাকড়সার এমন আচরণের পেছনে খাবারের প্রয়োজনীয়তা একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ডিম তৈরি ও প্রজননের জন্য স্ত্রী মাকড়সার প্রচুর শক্তি প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পুরুষ সঙ্গীকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলে কিছু অতিরিক্ত পুষ্টি পাওয়া সম্ভব।

তবে বিষয়টি সব ক্ষেত্রে এত সরল নয়।

যৌন নরখাদকতার পেছনে প্রজাতিভেদে বিভিন্ন কারণ কাজ করতে পারে। কোথাও খাদ্য পাওয়ার সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আবার কোথাও পুরুষের আচরণ, স্ত্রী মাকড়সার ক্ষুধা, আকারের পার্থক্য বা মিলনের সময়কার পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই ‘মিলনের পর স্ত্রী মাকড়সা পুরুষকে খেয়ে ফেলে’—এমন একটি ঘটনা দেখেই সব প্রজাতির আচরণ ব্যাখ্যা করা যায় না।

Aterigena aculeata নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো স্ত্রী মাকড়সার মৃত সাজার মতো আচরণ।

প্রাণিজগতে thanatosis বা মৃতের মতো স্থির হয়ে থাকার কৌশল অজানা নয়। বিপদের সময় কিছু প্রাণী এমন আচরণ করে শিকারিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই গবেষণায় যে বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, তা হলো প্রজননের সঙ্গে এই আচরণের সম্পর্ক।

স্ত্রী মাকড়সা যদি এমনভাবে স্থির হয়ে থাকে যে পুরুষ তাকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে করে কাছে আসে, তাহলে এই আচরণ মিলনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে পুরুষ মাকড়সার জন্যও এটি একটি বড় ঝুঁকি। কারণ সে যতক্ষণ স্ত্রীটির কাছাকাছি থাকবে, ততক্ষণ আক্রমণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

চীনের জিংগাংশান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিহে লিউ-এর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই আচরণ নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। গবেষণার অংশ হিসেবে মাকড়সার বিভিন্ন দল পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় মাকড়সাগুলিকে তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করে দ্রুত হিমায়িত করে তাদের শরীরের বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মিলনের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এই ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুধু বাইরে থেকে মাকড়সার আচরণ দেখলে তার পেছনের কারণ বোঝা সবসময় সম্ভব নয়। শরীরের গঠন ও প্রজনন-সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে আচরণের সঙ্গে শারীরবৃত্তীয় সম্পর্কও বোঝা যায়।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

পুরুষ মাকড়সা যদি জানে যে মিলনের পর স্ত্রী তাকে আক্রমণ করতে পারে, তাহলে সে কেন সেই ঝুঁকি নেয়?

বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, প্রজননের সুযোগ পাওয়ার মূল্য অনেক বেশি। কোনো পুরুষ যদি নিজের জিন পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে না পারে, তাহলে তার বেঁচে থাকার সুবিধাও সীমিত হতে পারে। তাই কিছু পরিস্থিতিতে প্রজননের সুযোগ পাওয়ার জন্য ঝুঁকি নেওয়া প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারায় টিকে থাকতে পারে।

তবে নির্দিষ্ট এই প্রজাতির ক্ষেত্রে পুরুষ মাকড়সা কেন এমন ঝুঁকি নেয়, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। গবেষকরা আচরণটির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলেও এর নেপথ্যের সব কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

এই প্রশ্নের উত্তরও সহজ নয়।

একদিকে স্ত্রী মাকড়সার জন্য পুরুষটি সম্ভাব্য খাদ্য হতে পারে। অন্যদিকে পুরুষটির প্রধান লক্ষ্য প্রজনন। ফলে দুজনের স্বার্থ এক জায়গায় মিললেও পরবর্তী পর্যায়ে তাদের স্বার্থের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

এই কারণেই গবেষকেরা এমন আচরণকে শুধু ‘পুরুষকে খেয়ে ফেলা’ হিসেবে দেখছেন না। এর মধ্যে প্রজনন, খাদ্য, আত্মরক্ষা এবং বিবর্তন—সবকিছুর যোগসূত্র রয়েছে।

প্রকৃতির নিয়মে একটি প্রাণীর জন্য যে আচরণ লাভজনক, অন্যটির জন্য সেটিই মারাত্মক হতে পারে। মাকড়সার এই বিচিত্র যৌন জীবন তারই একটি নাটকীয় উদাহরণ।

মাকড়সার জগৎ এমনিতেই অসংখ্য অদ্ভুত আচরণে ভরা। কোথাও পুরুষ নিজের শরীর দিয়ে স্ত্রীকে আটকে রাখে, কোথাও মিলনের পর দ্রুত পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে, আবার কোনো কোনো প্রজাতিতে পুরুষ সঙ্গীই পরিণত হয় খাদ্যে।

Aterigena aculeata-কে ঘিরে গবেষণায় স্ত্রী মাকড়সার মৃত সাজার মতো আচরণ সেই রহস্যকে আরও গভীর করেছে। কেন স্ত্রী এমন আচরণ করে, পুরুষ কীভাবে এই সংকেতকে ব্যাখ্যা করে এবং মিলনের পর আক্রমণ এড়ানোর কৌশল কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে—এসব প্রশ্ন নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রকৃতির প্রতিটি আচরণ মানুষের পরিচিত যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। যে ঘটনা আমাদের কাছে অদ্ভুত বা ভয়ংকর মনে হয়, সেটিই কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা ও প্রজননের দীর্ঘ বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।

আর সেই কারণেই মাকড়সার এই বিচিত্র যৌন জীবন শুধু চমকপ্রদ একটি ঘটনা নয়। এটি প্রাণীদের আচরণ, বিবর্তন এবং প্রজনন কৌশল কতটা জটিল হতে পারে, তারও একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ।

তথ্যগত সতর্কতা: এই প্রতিবেদনে মাকড়সার প্রজনন ও আচরণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। সব প্রজাতির মাকড়সার ক্ষেত্রে একই আচরণ দেখা যায় না। বিশেষ করে যৌন মিলনের পর সঙ্গীকে খেয়ে ফেলার ঘটনা নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এটিকে সব মাকড়সার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ