এনবি সংবাদ, আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : এল নিনো নতুন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। কয়েক বছর পর পর প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রায় অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে এই জলবায়ু পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খরা এবং ঝড়ের ধরনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ২০২৬ সালের বর্তমান এল নিনো নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের জায়গাটি কিছুটা আলাদা। নতুন এক বিশ্লেষণে এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। Climate Impact Lab-এর গবেষকেরা জানিয়েছেন, এর ফলে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা তৈরি হতে পারে।
Climate Impact Lab-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ভারতে প্রায় ১৫,৮০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিবেদনে এই সংখ্যার সঙ্গে প্রায় ১,৬০০-এর অনিশ্চয়তার পরিসরও উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৫,৮০০ সংখ্যা মানে এই নয় যে ভারতে ইতিমধ্যে এত মানুষের মৃত্যু হয়েছে বা নিশ্চিতভাবেই হবে। গবেষকেরা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অতিরিক্ত তাপের কারণে সম্ভাব্য মৃত্যুর একটি পরিসংখ্যানগত অনুমান করেছেন।
এই হিসাব করা হয়েছে আগের বছরের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক এবং আসন্ন সময়ের তাপমাত্রার সম্ভাব্য পরিস্থিতি মিলিয়ে। গবেষণায় ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালের গড় পরিস্থিতিকে তুলনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
Climate Impact Lab-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি এল নিনো পরিস্থিতির প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪,৫১,০০০ হতে পারে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭—এই ছয় মাসেই প্রায় ২,৩৯,০০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। বাকি মৃত্যুর হিসাব এল নিনো শুরু হওয়ার পরের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাব ফেব্রুয়ারির পরও চলতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
ভারত ছাড়াও আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ব্রাজিলের মতো অঞ্চলে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। সাহেল অঞ্চলে প্রায় ৬৬,৮০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ১৯,৩০০ এবং ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াকে মিলিয়ে প্রায় ১৯,৪০০ মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়েছে।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক সঞ্চালনকে প্রভাবিত করতে পারে। তার ফল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আলাদা আলাদাভাবে দেখা যায়।
কোনও অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টি হতে পারে, আবার অন্য কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কোথাও খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, আবার কোথাও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়ে।
Climate Impact Lab-এর বিশ্লেষণ বলছে, এই এল নিনোর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্বের স্থলভাগের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অত্যন্ত গরম দিনের সংখ্যাও প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।
ভারতের মতো বড় ও বৈচিত্র্যময় দেশে এল নিনোর প্রভাব সব জায়গায় একই রকম হবে না। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে কৃষি, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ চাহিদা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে অতিরিক্ত গরমের সময় বয়স্ক মানুষ, শিশু, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ওপর তাপের প্রভাব বেশি হতে পারে।
Climate Impact Lab-এর বিশ্লেষণে ভারতের সম্ভাব্য মৃত্যুর একটি বড় অংশ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই তিন মাসে ঘটতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ঝুঁকি ওই সময়ের পরেও ভারতের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এই জায়গাতেই প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, এল নিনোর কারণে তৈরি হতে পারে এমন তাপমাত্রার পরিস্থিতি অনেকটা সেই তাপমাত্রার মতো হতে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান গতিপথে প্রায় ২০ বছর পর স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে সুপার এল নিনোর কারণে আগামী ২০ বছর ধরে একই রকম গরম চলবে।
বরং গবেষণাটি বোঝাতে চেয়েছে, সাময়িকভাবে তৈরি হওয়া এই তাপমাত্রা পরিস্থিতি মানুষকে এমন এক ভবিষ্যৎ জলবায়ুর অভিজ্ঞতা দিতে পারে, যা বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের ধারায় আরও কয়েক দশক পরে সাধারণ হয়ে উঠতে পারে।
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। কারণ ‘২০ বছর ধরে গরম থাকবে’ এবং ‘২০ বছর পরের সম্ভাব্য গরমের মতো পরিস্থিতি এখন দেখা যেতে পারে’—দুটি বক্তব্যের অর্থ এক নয়।
অতিরিক্ত তাপের পাশাপাশি এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন করতে পারে। ফলে কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা এবং কিছু অঞ্চলে দাবানলের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষ করে উষ্ণ ও শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হলে বনাঞ্চলে আগুনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে কিছু অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
তবে এল নিনোর প্রভাব প্রতিটি অঞ্চলে একই হবে না। স্থানীয় আবহাওয়া, ভূপ্রকৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক মিলিয়ে পরিস্থিতি তৈরি হবে।
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতেও ইতিমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম রাজ্যজুড়ে এল নিনো পরিস্থিতির প্রস্তুতির জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
রাজ্য সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, সম্ভাব্য প্রবল শীতকালীন ঝড়, বন্যা, উপকূলীয় ক্ষয়, ভূমিধস এবং কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের মতো পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এটি এল নিনোর প্রভাব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলেও ক্যালিফোর্নিয়ার পরিস্থিতিকে ভারতের সম্ভাব্য পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না। এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে আলাদা হয়।
সুপার এল নিনো নিয়ে নতুন গবেষণার সংখ্যাগুলি নিঃসন্দেহে বড়। কিন্তু এই ধরনের গবেষণাভিত্তিক প্রক্ষেপণকে নিশ্চিত মৃত্যুর তালিকা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বরং এর উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করা এবং আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। গবেষকদের মতে, তাপপ্রবাহের সতর্কতা, শীতল থাকার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি, স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রস্তুতি এবং বাইরে কাজ করা মানুষের জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অতিরিক্ত মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তাই ভারতের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু ‘সুপার এল নিনো কতটা ভয়ংকর হবে’—তা নয়। বরং এই অতিরিক্ত তাপ, পরিবর্তিত বৃষ্টিপাত এবং সম্ভাব্য চরম আবহাওয়ার জন্য কতটা আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার এই পূর্বাভাস ভবিষ্যতে আবহাওয়ার নতুন তথ্যের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে আগামী কয়েক মাসে এল নিনোর শক্তি, তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



