এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মানুষ আজ দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটে। দুই হাত দিয়ে নানা কাজ করে, দূরত্ব অতিক্রম করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গাছে ওঠার ক্ষমতাও ধরে রেখেছে। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন সবসময় এমন ছিল না। লক্ষ লক্ষ বছর আগে মানবগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের একটা বড় অংশ গাছের ওপরেই সময় কাটাত। গাছের ডালে চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য গাছ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে ঠিক কবে সেই পরিবর্তন শুরু হয়েছিল? কবে মানুষ গাছের ডালপালায় চলাফেরার পাশাপাশি মাটিতে দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি হলো লুসি। প্রায় ৩২ লক্ষ বছর পুরনো এই জীবাশ্ম মানব বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুসির কঙ্কালের বিভিন্ন অংশ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, মানুষের দুই পায়ে হাঁটার ইতিহাস আসলে অনেক বেশি জটিল এবং দীর্ঘ।
মানুষের বিবর্তন নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো, আমাদের পূর্বপুরুষরা একসময় গাছে বসবাস করত এবং পরে কোনো এক পর্যায়ে গাছ ছেড়ে মাটিতে নেমে দুই পায়ে হাঁটা শুরু করে।
বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, বাস্তব ঘটনাটি এতটা সরল ছিল না।
বরং দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি পর্যায় চলেছিল, যখন মানবপূর্ব পূর্বপুরুষেরা একই সঙ্গে গাছে ওঠা ও গাছে চলাফেরার ক্ষমতা ধরে রেখেছিল এবং মাটিতেও দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ গাছ থেকে মাটিতে নামার ঘটনাটি ছিল ধাপে ধাপে ঘটে যাওয়া একটি বিবর্তনীয় পরিবর্তন।
এক প্রজন্মে এই পরিবর্তন হয়নি। হাজার হাজার প্রজন্ম ধরে শরীরের গঠন, পায়ের ব্যবহার, কোমরের আকৃতি এবং হাঁটার ধরনে পরিবর্তন জমতে জমতেই আধুনিক মানুষের দুই পায়ে হাঁটার বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে।
১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়ায় আবিষ্কৃত লুসির জীবাশ্ম মানব বিবর্তনের গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। লুসির বৈজ্ঞানিক নাম Australopithecus afarensis।
তার জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৩২ লক্ষ বছর। কঙ্কালের উল্লেখযোগ্য অংশ সংরক্ষিত থাকায় বিজ্ঞানীরা তার দেহের গঠন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পেরেছেন।
লুসির কঙ্কালের কোমর, পা, হাঁটু ও মেরুদণ্ডের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, তার শরীর দুই পায়ে হাঁটার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য বহন করত।
এর অর্থ হলো, কয়েক মিলিয়ন বছর আগেই মানব বিবর্তনের ধারায় দুই পায়ে হাঁটার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
তবে একই সঙ্গে তার শরীরের কিছু বৈশিষ্ট্য গাছে ওঠা ও গাছে চলাফেরার সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল। আর এখানেই লুসির গুরুত্ব।
লুসিকে ঘিরে গবেষণা থেকে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা একেবারেই ‘গাছ ছেড়ে মাটিতে নামা’ ধরনের সরল গল্প নয়।
বরং ধারণা করা হয়, Australopithecus afarensis-এর মতো প্রাচীন হোমিনিনরা মাটিতে দুই পায়ে হাঁটতে পারত, আবার প্রয়োজন হলে গাছেও উঠত।
এর পেছনে বাস্তব কারণও ছিল।
প্রাচীন পরিবেশে গাছ ছিল খাবারের উৎস। ফল, পাতা কিংবা অন্যান্য খাদ্য সংগ্রহের জন্য গাছে ওঠার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে গাছ শিকারি প্রাণীর হাত থেকে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারত।
রাত কাটানো বা বিশ্রামের জন্যও গাছ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
ফলে মাটিতে হাঁটার ক্ষমতা তৈরি হলেও গাছের প্রয়োজন একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।
মানুষের পূর্বপুরুষরা কেন দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করল, তার একটি মাত্র কারণ বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে পারেননি।
এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে থাকতে পারে।
দুই পায়ে হাঁটার ফলে মাটির ওপর চলাফেরা করার সময় দুই হাত তুলনামূলকভাবে মুক্ত থাকে। পরে এই হাতই খাবার বহন, বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার এবং অন্যান্য কাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দুই পায়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার ক্ষমতাও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে মানুষের দ্বিপদ চলনের বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু একটি কারণ দেখিয়ে মানুষের দুই পায়ে হাঁটার সম্পূর্ণ ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না।
প্রাচীন হোমিনিনদের জন্য গাছ ছিল একসঙ্গে খাবার, আশ্রয় এবং নিরাপত্তার জায়গা।
মাটিতে চলাফেরার পাশাপাশি গাছে ওঠার সুবিধা থাকলে তারা পরিবেশের একাধিক স্তর ব্যবহার করতে পারত। মাটিতে থাকা অবস্থায় এক ধরনের খাদ্য পাওয়া যেত, আবার গাছে উঠে অন্য ধরনের খাদ্য সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল।
এছাড়া শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জন্য বড় হুমকি ছিল। ফলে গাছের ওপর আশ্রয় নেওয়া তাদের বেঁচে থাকার কৌশলের অংশ হতে পারে।
এই কারণেই দুই পায়ে হাঁটার ক্ষমতা তৈরি হওয়ার পরও গাছের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিন বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ঠিক কখন আমাদের পূর্বপুরুষরা গাছের জীবন পুরোপুরি ছেড়ে মাটিতে বসবাস শুরু করেছিল।
এর নির্দিষ্ট একটি তারিখ দেওয়া কঠিন।
কারণ বিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট দিনের ঘটনা নয়। এটি বহু প্রজন্ম ধরে ধীরে ধীরে ঘটে। একটি প্রজাতির কিছু সদস্যের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য দেখা দিতে পারে, পরবর্তী প্রজন্মে সেই বৈশিষ্ট্য আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পর সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
মানুষের দুই পায়ে হাঁটার ক্ষেত্রেও সম্ভবত এমনটাই ঘটেছিল।
প্রথমে গাছে ওঠার পাশাপাশি মাটিতে অল্প দূরত্ব দুই পায়ে হাঁটা, পরে আরও দক্ষতার সঙ্গে হাঁটা এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্বে দুই পায়ে চলাফেরা—এভাবে পরিবর্তন এগিয়ে থাকতে পারে।
লুসি আধুনিক মানুষ নন। তিনি Homo sapiens-এর সদস্যও নন। তিনি মানুষের বিবর্তনীয় পরিবারের অনেক পুরনো এক সদস্য।
তবু তার জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ তার কঙ্কাল এমন একটি সময়ের সাক্ষ্য বহন করে, যখন মানুষের পূর্বপুরুষদের শরীরে দুই পায়ে চলাফেরার বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল, কিন্তু গাছে ওঠার সক্ষমতাও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
এই তথ্য মানুষের বিবর্তনকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে সাহায্য করে।
আমাদের পূর্বপুরুষরা হঠাৎ একদিন গাছ থেকে নেমে মাটিতে দুই পায়ে হাঁটা শুরু করেনি। বরং গাছ ও মাটির দুই পরিবেশের মধ্যে চলাচল করতে করতে বহু প্রজন্ম ধরে তাদের শরীর ও আচরণ বদলেছে।
দুই পায়ে হাঁটা শুধু চলাফেরার একটি নতুন পদ্ধতি ছিল না। এটি মানব বিবর্তনের পরবর্তী অনেক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
দুই পায়ে হাঁটার ফলে হাতের ব্যবহার বদলেছে। পরিবেশে চলাফেরার ধরন বদলেছে। খাবার সংগ্রহ ও বহনের কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্ক, হাত, সামাজিক আচরণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো আরও বহু বৈশিষ্ট্য মানব বিবর্তনের অংশ হয়েছে।
তাই লুসির মতো জীবাশ্ম শুধু একটি প্রাচীন প্রাণীর কঙ্কাল নয়। এগুলি আসলে আমাদের নিজেদের অতীতের টুকরো টুকরো প্রমাণ।
আজকের মানুষ গাছে বসবাস করে না। দুই পায়ে হাঁটা আমাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই ক্ষমতা তৈরি হতে লেগেছে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনীয় ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়।
আর লুসির জীবাশ্ম সেই ইতিহাসের এমন একটি সময়কে সামনে আনে, যখন আমাদের পূর্বপুরুষরা সম্ভবত একসঙ্গে গাছের জগৎ এবং মাটির জগত—দুই পরিবেশেই জীবন কাটাচ্ছিলেন।
সুতরাং মানুষ ঠিক কোন দিনে গাছের জীবন ছেড়ে মাটিতে দুই পায়ে হাঁটা শুরু করেছিল—তার নির্দিষ্ট উত্তর এখনও নেই। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে এখন ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছে, এই পরিবর্তন ছিল দীর্ঘ, ধীর এবং বহু প্রজন্ম ধরে চলা এক বিবর্তনীয় যাত্রা।



