সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeইতিহাস ও ঐতিহ্যশুক্র-মঙ্গলের গতিবিধি নিয়ে জটিল গণনা, ১২০০ বছরের পুরনো দেওয়াললিপিতে মিলল নাম

শুক্র-মঙ্গলের গতিবিধি নিয়ে জটিল গণনা, ১২০০ বছরের পুরনো দেওয়াললিপিতে মিলল নাম

শুলতুনের দেওয়াললিপিতে পাওয়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্যগুলির মধ্যে রয়েছে ২,৯২০ দিনের একটি জটিল হিসাব। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সময়কাল পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ করা শুক্রগ্রহের পাঁচটি পুনরাবৃত্তিচক্র এবং আটটি সৌরবর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : আজকের দিনে গ্রহের গতিপথ নির্ণয় করতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন শক্তিশালী দূরবীন, কম্পিউটার এবং মহাকাশ গবেষণার নানা আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু প্রায় ১২০০ বছর আগে, যখন এসব প্রযুক্তির অস্তিত্বই ছিল না, তখনও গ্রহের গতিবিধি নিয়ে জটিল গণনা করতেন প্রাচীন মায়া সভ্যতার জ্যোতির্বিদেরা। কীভাবে সম্ভব হয়েছিল এমন অসাধারণ কীর্তি? সম্প্রতি প্রাচীন দেওয়াললিপির পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে এক গণিতজ্ঞের নাম খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। তাঁর নাম সাক তাহন ওয়াক্স, যার অর্থ ‘সাদা বুকের শেয়াল’।

গুয়াতেমালার প্রাচীন মায়া শহর শুলতুনের একটি ঘরের দেওয়ালে পাওয়া গাণিতিক হিসাব ও চিত্রলিপি বিশ্লেষণ করে এই নামের সন্ধান মিলেছে। সেখানে শুধু নামই নয়, রয়েছে দিনপঞ্জি, সময় গণনা এবং গ্রহের গতিবিধি সম্পর্কিত জটিল হিসাবের চিহ্নও। বিশেষ করে শুক্র ও মঙ্গলগ্রহের চলন নিয়ে করা গণনা গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই প্রাচীন মায়ারা কীভাবে আকাশের গতিবিধি এত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন, সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

মধ্য আমেরিকার প্রাচীন মায়া সভ্যতা গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং দিনপঞ্জি তৈরির দক্ষতার জন্য পরিচিত। তাদের সময় গণনার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত উন্নত। সূর্য, চাঁদ এবং বিভিন্ন গ্রহের দৃশ্যমান অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে তারা ধর্মীয় আচার, কৃষিকাজ এবং দৈনন্দিন জীবনের সময় নির্ধারণ করত।

এই সভ্যতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান শুলতুন। গুয়াতেমালার এই প্রাচীন শহরের একটি ঘর ২০১০ সালে আবিষ্কৃত হয়। ঘরটির দেওয়ালে পাওয়া যায় অসংখ্য চিত্রলিপি, দিনপঞ্জির হিসাব এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানসংক্রান্ত নানা তথ্য।

দীর্ঘদিন ধরে এই দেওয়াললিপিগুলির অর্থ বোঝার চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা। সেখানকার ১১টি চিত্রলিপির একটি অংশ বিশেষভাবে তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেটির পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে তাঁরা এমন এক ব্যক্তির নাম খুঁজে পান, যাঁর পরিচয় এতদিন স্পষ্ট ছিল না।

নামটি হল সাক তাহন ওয়াক্স। বাংলায় যার অর্থ ‘সাদা বুকের শেয়াল’। গবেষকদের কাছে এই নাম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রাচীন মায়া সভ্যতায় জটিল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনার সঙ্গে যুক্ত একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়ের সম্ভাব্য সূত্র তুলে ধরেছে।

শুলতুনের দেওয়াললিপিতে পাওয়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্যগুলির মধ্যে রয়েছে ২,৯২০ দিনের একটি জটিল হিসাব। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সময়কাল পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ করা শুক্রগ্রহের পাঁচটি পুনরাবৃত্তিচক্র এবং আটটি সৌরবর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শুক্রগ্রহকে পৃথিবী থেকে কখনও সূর্যোদয়ের আগে পূর্ব আকাশে, আবার কখনও সূর্যাস্তের পরে পশ্চিম আকাশে উজ্জ্বল অবস্থায় দেখা যায়। পৃথিবী ও শুক্রের কক্ষপথে চলার কারণে আকাশে শুক্রের দৃশ্যমান অবস্থান নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করলে এই পরিবর্তনের মধ্যে নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তির ধারা শনাক্ত করা সম্ভব।

প্রাচীন মায়া জ্যোতির্বিদেরা এমন পুনরাবৃত্তিচক্রের হিসাব রাখতেন। তাঁদের কাছে এই গণনা ছিল শুধু আকাশের সৌন্দর্য বোঝার উপায় নয়, বরং সময় নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।

২,৯২০ দিনের হিসাবটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখায়, প্রাচীন মায়ারা দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণকে সংখ্যার সাহায্যে সাজিয়ে গ্রহের দৃশ্যমান গতিবিধি বোঝার চেষ্টা করতেন। তবে এই হিসাবের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা বুঝতে মূল গবেষণার বিস্তারিত বিশ্লেষণ জরুরি।

শুলতুনের দেওয়াললিপির গুরুত্ব শুধু শুক্রগ্রহের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে মঙ্গলগ্রহের গতিবিধি এবং মায়া সভ্যতার বিভিন্ন দিন গণনার চক্রের মধ্যেও সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।

পৃথিবী থেকে মঙ্গলগ্রহের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে তার দৃশ্যমান গতি ও অবস্থানে পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবী ও মঙ্গল নিজ নিজ কক্ষপথে চলার কারণে আকাশে মঙ্গলের অবস্থান কখনও দ্রুত এগিয়ে যায় বলে মনে হয়, আবার কখনও পিছিয়ে যাওয়ার মতো দেখায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই আপাত পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বিপরীতমুখী গতি বা রেট্রোগ্রেড মোশন বলা হয়।

এ ধরনের পরিবর্তন বুঝতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণের ফলাফল নিয়মিত লিখে রাখা এবং বিভিন্ন সময়ের তথ্যের তুলনা করাও জরুরি।

প্রাচীন মায়াদের গণনা থেকে বোঝা যায়, তাঁরা শুধু কোনও গ্রহকে আকাশে দেখে তার অবস্থান মনে রাখতেন না। বরং পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সময়ের হিসাব মিলিয়ে গ্রহের চলনের পুনরাবৃত্তি বোঝার চেষ্টা করতেন। এই পদ্ধতি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে এক নয়, তবে প্রাচীন যুগের পর্যবেক্ষণভিত্তিক জ্ঞানচর্চার অসাধারণ উদাহরণ।

গবেষকদের নজর কেড়েছে দেওয়াললিপির শেষে থাকা একটি বাক্য। তার অর্থ, ‘এমনই বলেছেন’। এই বাক্যের পরেই সাক তাহন ওয়াক্স নামটি পাওয়া গিয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। ওই গণিতজ্ঞ কি নিজেই দেওয়ালে নিজের হিসাব লিখেছিলেন? নাকি অন্য কোনও ব্যক্তি তাঁর গণনা লিপিবদ্ধ করে তাঁর নাম উল্লেখ করেছিলেন? বর্তমানে পাওয়া তথ্য থেকে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

যদি তিনি নিজেই হিসাব লিখে থাকেন, তা হলে দেওয়ালটি তাঁর কাজের নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে, অন্য কেউ তাঁর নাম উল্লেখ করে থাকলে এটি প্রাচীন মায়া সমাজে জ্ঞানচর্চার স্বীকৃতি দেওয়ার একটি উদাহরণও হতে পারে।

তবে কোনও একটি সম্ভাবনাকেই এখনই চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রাচীন লিপির অর্থ উদ্ধার করার ক্ষেত্রে শব্দের ব্যাখ্যা, লেখার প্রেক্ষাপট এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। তাই এই নামের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

মায়া সভ্যতার গণিতচর্চা ছিল তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা শূন্যের ধারণা ব্যবহার করতেন এবং বিশের ভিত্তিতে তৈরি একটি সংখ্যাপদ্ধতি অনুসরণ করতেন। দিন, মাস ও বছরের হিসাব রাখার জন্য তাঁদের একাধিক দিনপঞ্জি ছিল।

এই দিনপঞ্জিগুলির সাহায্যে দীর্ঘ সময়ের হিসাব রাখা সম্ভব হতো। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক জীবন এবং আকাশের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সময়ের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রেও এগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

প্রাচীন মায়াদের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গ্রহের দৃশ্যমান অবস্থানকে অনেক সময় আচার-অনুষ্ঠান এবং বিশেষ দিন নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। ফলে গ্রহের গতিপথের হিসাব তাঁদের কাছে নিছক গাণিতিক অনুশীলন ছিল না; এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও ছিল।

শুলতুনের দেওয়াললিপি সেই জ্ঞানচর্চার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। সেখানে গণনা, দিনপঞ্জি এবং গ্রহের চলনের সম্পর্ক একসঙ্গে পাওয়া যাওয়ায় প্রাচীন মায়াদের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, গ্রহের দৃশ্যমান গতিবিধি বোঝার জন্য দূরবীন অপরিহার্য নয়। উজ্জ্বল গ্রহগুলি খালি চোখেই দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা সম্ভব।

প্রাচীন মায়া জ্যোতির্বিদেরা আকাশের বিভিন্ন বস্তু পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সেই তথ্য লিখে রাখতেন। পরে পুরনো পর্যবেক্ষণের সঙ্গে নতুন তথ্য মিলিয়ে তাঁরা গ্রহের পুনরাবৃত্তিচক্র সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারতেন। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, গণনা এবং সময়ের হিসাব—এই তিনটির সমন্বয়ই ছিল তাঁদের জ্ঞানচর্চার ভিত্তি।

অবশ্য আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রাচীন মায়াদের পদ্ধতির পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা বর্তমান যুগের মতো গ্রহের কক্ষপথ নির্ণয় বা মহাকর্ষের সূত্র ব্যবহার করতেন না। তাঁদের হিসাব মূলত পৃথিবী থেকে দেখা গ্রহের অবস্থান এবং তার পুনরাবৃত্তির উপর নির্ভর করত।

তবু আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণ থেকে এমন জটিল সম্পর্ক শনাক্ত করা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব।

শুলতুনের দেওয়াললিপিতে সাক তাহন ওয়াক্সের নামের সন্ধান প্রাচীন মায়া সভ্যতার জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নতুন আলো ফেলতে পারে। এতদিন অজানা থাকা একজন গণিতজ্ঞের পরিচয় সম্পর্কে সম্ভাব্য সূত্র পাওয়ার পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে গ্রহের গতিবিধি নিয়ে জটিল গণনার সম্পর্কও সামনে এসেছে।

এই আবিষ্কার মনে করিয়ে দেয়, প্রাচীন সভ্যতার জ্ঞান সম্পর্কে আমাদের ধারণা এখনও অসম্পূর্ণ। পাথরের দেওয়াল, চিত্রলিপি এবং পুরনো দিনপঞ্জির মধ্যে এমন অনেক তথ্য লুকিয়ে থাকতে পারে, যা নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছে।

তবে সাক তাহন ওয়াক্স ঠিক কীভাবে এই হিসাব তৈরি করেছিলেন, দেওয়াললিপির প্রতিটি অংশের অর্থ কী এবং তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা কতটা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।

প্রাচীন মায়াদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের দক্ষতা নিয়ে গবেষণা যত এগোবে, ততই পরিষ্কার হতে পারে তাঁদের পর্যবেক্ষণ, গণনা এবং সময় নির্ধারণের পদ্ধতি। আর সেই সঙ্গে হয়তো আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে, প্রায় ১২০০ বছর আগে আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই মানুষ কীভাবে মহাকাশের নিয়মিত পরিবর্তন সম্পর্কে এত গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ