সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeসর্বশেষ সংবাদ১ লাখ ৭৬ হাজার বছর আগে গুহার অন্ধকারে ২.২ টন পাথরের রহস্যময়...

১ লাখ ৭৬ হাজার বছর আগে গুহার অন্ধকারে ২.২ টন পাথরের রহস্যময় বৃত্ত! কেন বানিয়েছিল নিয়ানডারথালরা?

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের টার্ন-এ-গারোন অঞ্চলের অ্যাভিয়েরন গিরিখাতের কাছে অবস্থিত ব্রুনিকেল গুহা। দীর্ঘ সময় ধরে গুহাটি মানুষের অজানাই ছিল। এর প্রবেশপথ নুড়িপাথরের একটি ঢালের নীচে চাপা পড়ে থাকায় বাইরে থেকে এর ভিতরের কোনও অস্তিত্ব বোঝা যেত না।

এনবি সংবাদ, আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু রহস্য রয়েছে, যার সামনে আধুনিক বিজ্ঞানও থমকে দাঁড়ায়। হাজার হাজার বছর আগের কোনও সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ হলে হয়তো তার সঙ্গে মাটির পাত্র, অস্ত্র, ঘরবাড়ি কিংবা মানুষের হাড়গোড় পাওয়া যায়। সেসব দেখে গবেষকেরা অতীতের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারেন। কিন্তু যদি কোনও গুহার গভীরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কয়েক টন পাথর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো রয়েছে, অথচ সেই পাথর সাজানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট প্রমাণ নেই, তখন রহস্য আরও ঘনীভূত হয়।

ফ্রান্সের ব্রুনিকেল গুহায় এমনই এক বিস্ময়কর আবিষ্কার হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার বছর আগে গুহার গভীরে গিয়ে একদল প্রাচীন মানুষ স্ট্যালাগমাইটের টুকরো সংগ্রহ করে কয়েকটি বৃত্তাকার কাঠামো তৈরি করেছিল। পাথরগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে ছিল না। বরং বড় পাথরের সঙ্গে ছোট পাথর মিলিয়ে, স্তরে স্তরে সাজিয়ে এবং কিছু অংশে ঠেকনা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই কাঠামো।

সব মিলিয়ে প্রায় ২.২ টন পাথরের টুকরো ব্যবহার করা হয়েছিল সেখানে। কাঠামোগুলোর মধ্যে পোড়া হাড়ের চিহ্নও পাওয়া গেছে। ফলে গবেষকদের ধারণা, পাথর সাজানোর সময় আগুনের ব্যবহার হয়েছিল। কিন্তু কেন এত গভীরে গিয়ে এমন কাজ করেছিল প্রাচীন মানুষ? সেখানে কি কোনও বিশেষ অনুষ্ঠান হতো? নাকি এটি ছিল আশ্রয়স্থল? অথবা এমন কোনও উদ্দেশ্য ছিল, যা আজকের মানুষ কল্পনাও করতে পারে না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি। তবে একের পর এক গবেষণায় ব্রুনিকেল গুহার অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের টার্ন-এ-গারোন অঞ্চলের অ্যাভিয়েরন গিরিখাতের কাছে অবস্থিত ব্রুনিকেল গুহা। দীর্ঘ সময় ধরে গুহাটি মানুষের অজানাই ছিল। এর প্রবেশপথ নুড়িপাথরের একটি ঢালের নীচে চাপা পড়ে থাকায় বাইরে থেকে এর ভিতরের কোনও অস্তিত্ব বোঝা যেত না।

১৯৯০ সালে একদল অভিযাত্রী ওই ঢালের নীচে খনন করে গুহায় ঢোকার পথ খুঁজে পান। এরপর তাঁরা গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। প্রবেশপথ থেকে প্রায় ৩৩৬ মিটার এগিয়ে যাওয়ার পর তাঁরা এমন কিছু দেখতে পান, যা তাঁদের বিস্মিত করে।

গুহার ওই অংশে সূর্যের আলো পৌঁছানোর কোনও সুযোগ ছিল না। চারদিকে ছিল গভীর অন্ধকার। কিন্তু মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা পাথরের টুকরোগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সেগুলো সেখানে এনে সাজিয়েছে।

প্রথমে হয়তো এগুলোকে সাধারণ পাথরের স্তূপ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর বোঝা যায়, এগুলোর বিন্যাসে রয়েছে পরিকল্পনা ও নির্দিষ্ট কাঠামো। এই আবিষ্কারই পরবর্তী সময়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ, ভূবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

ব্রুনিকেল গুহার মেঝেতে পাওয়া পাথরগুলো সাধারণ নদীর নুড়ি নয়। এগুলো মূলত স্ট্যালাগমাইটের ভাঙা অংশ।

স্ট্যালাগমাইট হলো এমন এক ধরনের খনিজ শিলা, যা চুনাপাথরের গুহার মেঝে থেকে ধীরে ধীরে উপরের দিকে বৃদ্ধি পায়। গুহার ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে পড়ার সময় সেই জলে থাকা খনিজ পদার্থ মেঝেতে জমতে থাকে। হাজার হাজার বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে মেঝে থেকে শঙ্কু বা স্তম্ভের মতো শিলার গঠন তৈরি হয়। সেটিই স্ট্যালাগমাইট নামে পরিচিত।

ব্রুনিকেল গুহায় প্রাচীন মানুষ এই ধরনের শিলার অংশ ভেঙে বা আলাদা করে সংগ্রহ করেছিল বলে গবেষকদের ধারণা। এরপর সেগুলো গুহার একটি নির্দিষ্ট অংশে এনে সাজানো হয়।

ফরাসি জাতীয় গবেষণা সংস্থা সিএনআরএসের হিসাব অনুযায়ী, গুহায় প্রায় ৪০০টি স্ট্যালাগমাইটের টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। এগুলো প্রায় ১১২ মিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। সব পাথর মিলিয়ে ওজন দাঁড়ায় আনুমানিক ২.২ টন।

এই বিপুল পরিমাণ পাথর সংগ্রহ, সরানো এবং নির্দিষ্ট কাঠামোয় সাজানো সহজ কাজ ছিল না। বিশেষ করে এমন একটি গুহায়, যেখানে প্রাকৃতিক আলো পৌঁছাত না এবং চলাচলও ছিল কঠিন। তাই আবিষ্কারটি প্রাচীন মানুষের পরিকল্পনা, সহযোগিতা এবং পরিবেশ ব্যবহারের ক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।

গবেষকেরা গুহার মেঝেতে মোট ছয়টি পাথরের কাঠামো শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে দুটি ছিল বৃত্তাকার। একটি আকারে বড় এবং অন্যটি তুলনামূলকভাবে ছোট।

বাকি চারটি কাঠামোর মধ্যে দুটি বড় বৃত্তের ভিতরে এবং দুটি বাইরে অবস্থান করছিল। পাথরগুলোর বিন্যাস দেখে বোঝা যায়, এগুলো কোনও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়নি। বরং কেউ পরিকল্পনা করেই এগুলো সাজিয়েছিল।

বড় পাথরের ফাঁকে ছোট পাথরের টুকরো গুঁজে দেওয়া হয়েছিল। এতে কাঠামোর ভিতরের অংশ স্থির থাকত এবং পাথরগুলো সহজে গড়িয়ে পড়ত না। কিছু পাথর আবার স্তূপের বাইরের দিকে সোজা করে দাঁড় করানো ছিল। এগুলো দেখতে অনেকটা ঠেকনার মতো, যা কাঠামোর বাইরের অংশকে সমর্থন দিচ্ছিল।

এই বিন্যাস থেকে গবেষকেরা মনে করেন, প্রাচীন নির্মাতারা পাথরের ভারসাম্য সম্পর্কে ধারণা রাখত। তারা শুধু পাথর জড়ো করেনি, বরং সেগুলোকে নির্দিষ্ট আকারে ধরে রাখার ব্যবস্থাও করেছিল।

তবে এই কাঠামোগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা বোঝার জন্য শুধু আকৃতি যথেষ্ট নয়। তাই গবেষকেরা পাথরের বয়স, পোড়া দাগ এবং গুহার পরিবেশ নিয়ে আরও বিস্তারিত পরীক্ষা চালান।

ব্রুনিকেল গুহার রহস্য সমাধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল পাথরের বয়স নির্ধারণ। কারণ কাঠামোগুলো কখন তৈরি হয়েছিল, তা জানা গেলে সেই সময়কার মানুষের পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

২০১৩ সালে ফ্রান্সের বর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জ্যাক জবারের নেতৃত্বে একটি দল গুহার পাথর পরীক্ষা করেন। গবেষণায় তাঁরা দেখতে পান, কাঠামোগুলোর বয়স আনুমানিক ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ বছর। এই হিসাবের ক্ষেত্রে প্রায় ২১০০ বছরের কমবেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৬ সালে তাঁদের গবেষণার ফলাফল ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

এই বয়স নির্ধারণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ ওই সময়ে আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্স ইউরোপে বসবাস করত বলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মানবজাতির বিবর্তনের ইতিহাস অনুযায়ী, আধুনিক মানুষের প্রাথমিক বিকাশ আফ্রিকায় ঘটেছিল এবং ইউরোপে তাদের বিস্তার অনেক পরে শুরু হয়।

ফলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, ব্রুনিকেল গুহার কাঠামোগুলো নিয়ানডারথালদের তৈরি হতে পারে।

নিয়ানডারথালরা প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর একটি শাখা, যারা ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করত। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল, তাঁরা হয়তো আধুনিক মানুষের তুলনায় কম জটিল চিন্তাশক্তির অধিকারী ছিলেন। কিন্তু ব্রুনিকেল গুহার মতো আবিষ্কার সেই সরল ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

তবে পাথরের বয়স নির্ধারণ এবং ওই সময় ইউরোপে আধুনিক মানুষের অনুপস্থিতি নিয়ানডারথালদের সম্ভাব্য নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরলেও, গুহার ভিতরে সরাসরি নিয়ানডারথালদের হাড় বা অন্য কোনও মানবদেহের অবশেষ পাওয়া যায়নি। তাই তাঁদের পরিচয় এখনও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী অনুমান, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য নয়।

গুহার প্রবেশপথ থেকে ৩৩৬ মিটার ভিতরে সূর্যের আলো পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। তাই প্রাচীন মানুষ সেখানে পাথর সাজাতে গেলে কোনও না কোনও আলোর ব্যবস্থা করতেই হয়েছিল।

গবেষকেরা পাথরের কাঠামোর মধ্যে পোড়া হাড়ের টুকরো খুঁজে পেয়েছেন। ছয়টি কাঠামোর মধ্যেই এমন পোড়া উপাদানের চিহ্ন ছিল। এছাড়া কিছু স্ট্যালাগমাইটের টুকরোয় লালচে ও কালচে দাগও দেখা যায়।

গবেষণায় ৫৭টি পাথরের টুকরোয় লালচে দাগ এবং ৬৬টি টুকরোয় কালচে দাগ শনাক্ত করা হয়েছিল। প্রথমে প্রশ্ন ওঠে, এই দাগ কি গুহার ছাদ থেকে চুঁইয়ে পড়া জলের কারণে তৈরি হয়েছিল? কিন্তু ছাদের দিকে এমন কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা সেই সম্ভাবনাকে সমর্থন করে।

ফলে আগুনের প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। গবেষকদের ধারণা, পাথরের কাঠামো তৈরির সময় সেখানে আগুন জ্বালানো হয়েছিল। সেই আগুন হয়তো গুহার ভিতরে আলো তৈরি করেছিল। তবে আগুনের উদ্দেশ্য শুধু আলো দেওয়া ছিল, নাকি অন্য কোনও কাজেও তা ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত নয়।

ব্রুনিকেল গুহার পাথরের কাঠামোর মধ্যে পোড়া হাড় পাওয়া যাওয়ায় গবেষণা আরও জটিল হয়ে ওঠে। আগুনের চিহ্ন থাকলেই যে সেখানে নিয়মিত রান্না করা হতো বা মানুষ বসবাস করত, এমনটা বলা যায় না।

পরবর্তী সময়ে গবেষকেরা রমন স্পেকট্রোমেট্রি পদ্ধতি ব্যবহার করে পাথর ও পোড়া উপাদানের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেন। রমন স্পেকট্রোমেট্রি এমন একটি বিশ্লেষণ পদ্ধতি, যেখানে লেজার আলোর সাহায্যে কোনও পদার্থের রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

এই পরীক্ষার ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হাড়ের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রিতভাবে পোড়ানো হয়েছিল। অর্থাৎ, আগুনের চিহ্নগুলো কেবল আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ফল নাও হতে পারে।

জীবাশ্মবিদ জন হকসের আলোচনায় উঠে এসেছে, কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশে আগুন ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই আগুনের উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে এখনও কোনও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।

আগুনের ব্যবহার থেকে কয়েকটি সম্ভাবনা সামনে আসে। হয়তো গুহার গভীরে কাজ করার জন্য আলো প্রয়োজন হয়েছিল। আবার আগুন কোনও আচার-অনুষ্ঠানের অংশও হতে পারে। সম্ভবত কাঠামো তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও বিশেষ কাজের সময় হাড় পোড়ানো হয়েছিল।

কিন্তু এই সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক, তা নির্ধারণের মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও হাতে নেই।

ব্রুনিকেল গুহার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রহস্য রয়েছে প্রবেশপথ নিয়ে।

১৯৯০ সালে অভিযাত্রীরা যে পথ দিয়ে গুহায় প্রবেশ করেছিলেন, সেটি ছিল অত্যন্ত সরু ও দুর্গম। সেখানে পৌঁছাতে তাঁদের হেলমেট ব্যবহার করতে হয়েছিল এবং দড়ির সাহায্যে এগোতে হয়েছিল। এমন পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ পাথর নিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করা প্রাচীন মানুষের পক্ষে কঠিন ছিল।

তাই গবেষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, প্রাচীন মানুষ কি আদৌ এই পথ দিয়ে গুহার ভিতরে প্রবেশ করেছিল? নাকি সেই সময়ে গুহায় ঢোকার অন্য কোনও পথ খোলা ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিরূপবিদ্যার গবেষক কিম জেনুইট এবং তাঁর সহযোগীরা গুহার ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস নিয়ে পরীক্ষা চালান।

তাঁদের গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, গুহাটির একটি পুরনো মূল প্রবেশপথ ছিল। সেই পথের উচ্চতা ছিল দুই মিটারেরও কম। পরে কোনও এক সময়ে ভূমিধসের কারণে প্রবেশপথটি বন্ধ হয়ে যায়।

গবেষকদের অনুমান, প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯০০ বছর আগে ভূমিধসের ফলে গুহার সেই প্রবেশপথ বন্ধ হয়েছিল। এই সময়ের হিসাবেও প্রায় ১৩০০ বছরের কমবেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদি এই অনুমান সঠিক হয়, তাহলে নিয়ানডারথালরা এমন একটি সময়ে গুহায় ঢুকেছিল, যখন প্রাচীন প্রবেশপথটি এখনও খোলা ছিল। পরবর্তী সময়ে ভূমিধস গুহামুখ বন্ধ করে দেয়। ফলে ভিতরে থাকা পাথরের কাঠামো দীর্ঘ সময় ধরে বাইরের মানুষের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকে।

এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনই হয়তো ব্রুনিকেল গুহার কাঠামোগুলোকে এত দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত রাখতে সাহায্য করেছে।

পাথরের কাঠামোর বয়স ও বিন্যাস যতই চমকপ্রদ হোক, গুহার ভিতরে মানুষের বসবাসের সরাসরি প্রমাণ খুব সীমিত।

গবেষকেরা সেখানে কোনও উল্লেখযোগ্য পাথরের সরঞ্জাম খুঁজে পাননি। নিয়ানডারথাল বা অন্য কোনও প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর হাড়ও পাওয়া যায়নি। এমনকি নিয়মিত বসবাসের সঙ্গে সম্পর্কিত আবর্জনা, খাবারের অবশেষ কিংবা অন্য কোনও ধ্বংসাবশেষও শনাক্ত করা যায়নি।

এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—গুহার ওই অংশে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বসবাস ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই।

যদি সেখানে কোনও গোষ্ঠী বসবাস করত, তাহলে সাধারণত তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম, খাদ্যের অবশেষ, আগুনের নিয়মিত চিহ্ন অথবা অন্যান্য বস্তু পাওয়া যেতে পারত। কিন্তু এখানে প্রধানত পাওয়া গেছে পরিকল্পিতভাবে সাজানো পাথরের কাঠামো এবং কিছু পোড়া দাগ।

তাই গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, মানুষ হয়তো নির্দিষ্ট কোনও উদ্দেশ্যে গুহার গভীরে গিয়েছিল। কাজ শেষ করে তারা চলে যায়। সেই কাজের সঙ্গে দৈনন্দিন বসবাসের সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনও অজানা।

ব্রুনিকেল গুহার পাথরের বৃত্ত নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ধারণাগুলোর একটি হলো, এটি হয়তো কোনও ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের স্থান ছিল।

কেন এমন ধারণা তৈরি হয়েছে? কারণ, কাঠামোগুলো তৈরি হয়েছিল গুহার অনেক গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাত না। পাথরগুলোও এলোমেলোভাবে নয়, বরং নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজানো হয়েছিল। সঙ্গে ছিল আগুন ব্যবহারের সম্ভাব্য চিহ্ন।

এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে মনে হতে পারে, এই জায়গার কোনও বিশেষ সামাজিক বা প্রতীকী গুরুত্ব ছিল।

তবে প্রত্নতত্ত্বে কোনও কাঠামোকে আচারস্থল হিসেবে চিহ্নিত করতে আরও নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। যেমন, বিশেষ ধরনের প্রতীক, পুনরাবৃত্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বিন্যাস, উৎসর্গের নিদর্শন কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনও বস্তু।

ব্রুনিকেল গুহায় এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তাই আচার-অনুষ্ঠানের তত্ত্বটি আকর্ষণীয় হলেও সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

আরেকটি ধারণা হলো, প্রাচীন মানুষ শীতের সময় গুহাটিকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করত। গুহার ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে আলো ও উষ্ণতা পাওয়া সম্ভব ছিল। পাথরের কাঠামো হয়তো কোনও কাজের জায়গা, আগুন ব্যবহারের নির্দিষ্ট এলাকা কিংবা অন্য কোনও ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু এই ধারণার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। কারণ, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাথরের কাঠামো কেন বৃত্তাকারে তৈরি করা হয়েছিল, তা-ও পরিষ্কার নয়।

কেউ কেউ মনে করেন, কাঠামোগুলো হয়তো কোনও প্রযুক্তিগত কাজের অংশ ছিল। আবার কেউ মনে করেন, এগুলো মানুষের সামাজিক আচরণ বা প্রতীকী চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে এসব ব্যাখ্যার কোনোটিই এখনও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

ব্রুনিকেল গুহার গুরুত্ব শুধু এর বয়সের কারণে নয়। এই আবিষ্কার প্রাচীন মানুষের চিন্তাশক্তি, পরিকল্পনা এবং পরিবেশ ব্যবহারের ক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।

প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার বছর আগে কোনও মানবগোষ্ঠী গুহার গভীরে গিয়ে কয়েক টন পাথর সংগ্রহ করে কাঠামো তৈরি করেছিল। তাদের এই কাজের জন্য পাথর নির্বাচন, পরিবহন, বিন্যাস এবং সম্ভবত আলোর ব্যবস্থাও করতে হয়েছিল।

এত দীর্ঘ সময় আগে মানুষ কীভাবে অন্ধকার ও দুর্গম পরিবেশে এমন কাজ সম্পন্ন করেছিল, তা নিজেই বিস্ময়কর। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর আচরণকে শুধু শিকার, খাদ্য সংগ্রহ বা আশ্রয় নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না।

তবে বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে সতর্কও। কোনও আবিষ্কার যতই রহস্যময় হোক, তার ব্যাখ্যা দিতে হলে প্রমাণের প্রয়োজন। ব্রুনিকেল গুহার ক্ষেত্রে কাঠামোর বয়স, বিন্যাস এবং আগুনের চিহ্ন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলেও, নির্মাণের উদ্দেশ্য এখনও অজানা।

আজ থেকে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার বছর আগে ব্রুনিকেল গুহার অন্ধকারে যে মানুষগুলো পাথর সাজিয়েছিল, তারা হয়তো নিজেদের কাজের উদ্দেশ্য খুব ভালোভাবেই জানত। কিন্তু সময়ের স্রোতে তাদের ভাষা, চিন্তা, বিশ্বাস এবং জীবনযাত্রার অধিকাংশ তথ্য হারিয়ে গেছে।

রয়ে গেছে শুধু পাথরের কাঠামো, কিছু পোড়া দাগ এবং গুহার নীরবতা।

গবেষকেরা এখনও জানতে চান, কেন এত দূরে গিয়ে এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। এটি কি কোনও ব্যবহারিক কাজের অংশ ছিল? কোনও সামাজিক আয়োজন? আগুন ব্যবহারের বিশেষ পদ্ধতি? নাকি এমন কোনও বিশ্বাসের প্রকাশ, যার অর্থ আজকের মানুষ আর বুঝতে পারে না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের আরও উন্নত প্রযুক্তি, নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান অথবা গুহার অবশিষ্ট চিহ্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে।

ততদিন পর্যন্ত ব্রুনিকেল গুহার রহস্যময় পাথরের বৃত্ত মানব ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক সভ্যতার বহু আগে পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষও জটিল পরিকল্পনা করতে পারত, পরিবেশকে কাজে লাগাতে পারত এবং এমন কাজ রেখে যেতে পারত, যার অর্থ বুঝতে হাজার হাজার বছর পরেও বিজ্ঞানীদের গবেষণা চালিয়ে যেতে হয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ