এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ডাইনোসর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে কোটি কোটি বছর আগে। কিন্তু সেই প্রাচীন সময়ের এক উভচর প্রাণী এখনও টিকে রয়েছে হিমালয়ের কোলে। দেখতে অনেকটা টিকটিকির মতো হলেও এটি আসলে সালাম্যান্ডার। স্থানীয়ভাবে কেউ বলেন ‘পানি টিকটিকি’, আবার কোথাও পরিচিত ‘পানি কুকুর’ নামে। গবেষকদের কাছে এই বিরল প্রাণী ‘হিমালয়ান সালাম্যান্ডার’ বা ‘হিমালয়ান নিউট’ নামে পরিচিত।
এই প্রাণীকে ঘিরেই এবার বড় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে। বিরল হিমালয়ান সালাম্যান্ডারকে বিলুপ্তির আশঙ্কা থেকে রক্ষা করতে কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে গড়ে উঠতে চলেছে বিশ্বের প্রথম ‘হিমালয়ান সালাম্যান্ডার স্যাংচুয়ারি’ বা সংরক্ষণকেন্দ্র।
রাজ্য বনদপ্তর, সেন্ট্রাল জু অথরিটি এবং কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প এগোচ্ছে। বনদপ্তর সূত্রে খবর, প্রস্তাবের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হিমালয়ান সালাম্যান্ডারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার প্রাচীন ইতিহাস। গবেষকদের মতে, সালাম্যান্ডারদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীতে বহু কোটি বছর ধরে টিকে রয়েছে। প্রায় ১৬ কোটি বছর আগের জুরাসিক যুগের প্রাণীদের সঙ্গে এই গোষ্ঠীর দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের যোগ রয়েছে।
তখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দাপিয়ে বেড়াত ডাইনোসর। জলবায়ু ও পরিবেশে বারবার পরিবর্তন এসেছে। পৃথিবীতে এসেছে বহু নতুন প্রাণী, আবার বহু প্রজাতি বিলুপ্তও হয়েছে। কিন্তু সালাম্যান্ডারদের কিছু গোষ্ঠী সেই দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে রয়েছে।
এই কারণেই এই প্রাণীকে গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ‘লিভিং ফসিল’ বা ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ শব্দটি অবশ্য আক্ষরিক অর্থে এমন নয় যে প্রাণীটি কোটি কোটি বছর ধরে একেবারেই অপরিবর্তিত রয়েছে। বরং প্রাচীন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার কারণেই এই ধরনের প্রাণীকে জনপ্রিয়ভাবে ‘লিভিং ফসিল’ বলা হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে কাউডাটা বা সালাম্যান্ডার-জাতীয় উভচরদের মধ্যে এই প্রাণী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয়ের দার্জিলিং ও কার্শিয়াং পাহাড়ের নির্দিষ্ট জলাভূমি ও জলাশয় এলাকায় এদের দেখা যায়।
প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এই প্রাণীর শরীরের রং সাধারণত কালচে-বাদামি। পিঠে রয়েছে দানাদার ও উঁচু রেখার মতো বৈশিষ্ট্য। চেহারায় সরীসৃপের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকলেও এটি আসলে উভচর প্রাণী।
পাহাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই এই অদ্ভুত প্রাণীটির সঙ্গে পরিচিত। স্থানীয় নাম ‘পানি টিকটিকি’ বা ‘পানি কুকুর’ তার জলনির্ভর জীবনযাপনেরই ইঙ্গিত দেয়।
একসময় দার্জিলিং ও কার্শিয়াং পাহাড়ের শতাধিক জায়গায় হিমালয়ান সালাম্যান্ডারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত বলে বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাদের বাসস্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে।
এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। পাহাড়ি এলাকায় নগরায়ন বাড়ছে। নতুন রাস্তা, বাড়িঘর ও পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ, জমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশে হস্তক্ষেপও বেড়েছে।
এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সালাম্যান্ডারের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রে। কারণ এই প্রাণী অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। সামান্য জলদূষণ বা বাসস্থানের পরিবর্তনও তাদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
হিমালয়ান সালাম্যান্ডারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে পরিবেশের ‘ইন্ডিকেটর’ বা সূচক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করেন।
সহজভাবে বললে, কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় এই প্রাণীর উপস্থিতি থাকলে সেটি সেই এলাকার পরিবেশের স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে জলাশয় ও জলাভূমির পানির মান ভালো থাকার সঙ্গে এই প্রাণীর উপস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে।
কার্শিয়াং বন বিভাগের ডিএফও দেবেশ পাণ্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, সালাম্যান্ডার অত্যন্ত সংবেদনশীল। যেখানে এরা স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারে, সেখানে পানির গুণমান এবং বাস্তুতন্ত্র তুলনামূলকভাবে ভালো থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তাই সালাম্যান্ডার সংরক্ষণ মানে শুধু একটি বিরল প্রাণীকে বাঁচানো নয়। একই সঙ্গে পাহাড়ি জলাশয়, জলাভূমি এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকেও রক্ষা করা।
এই উভচর প্রাণীর জীবনযাপন পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। জলমগ্ন বা স্যাঁতসেঁতে নিচু জমিতে এদের চলাচল দেখা যায়। মাটিতে গর্ত তৈরির মতো আচরণও তাদের পরিবেশগত ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত বলে বনদপ্তরের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ধরনের প্রাকৃতিক কার্যকলাপ মাটির গঠন ও পানির চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে। বৃষ্টির জল মাটির ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেলে ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণের ক্ষেত্রেও তা সহায়ক হতে পারে।
তবে এই প্রাণীর পরিবেশগত ভূমিকা নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে পাহাড়ি জলাধার এবং ভূগর্ভস্থ জলের ওপর তাদের প্রভাব কতটা, তা বিস্তারিতভাবে বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ জরুরি।
হিমালয়ান সালাম্যান্ডারের বাসস্থান কোনও একটি বিশাল জঙ্গলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট জলাশয় ও জলাভূমিকে ঘিরে এদের আবাস ছড়িয়ে রয়েছে।
এই কারণেই বনদপ্তর স্যাংচুয়ারির জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করেছে। সেগুলি হল কার্শিয়াংয়ের **নামথিং পোখরি, পোখরিয়াটার এবং পঞ্চ পোখরি**।
এই জায়গাগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যপূর্ণ হেরিটেজ সাইট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমানে কিছু এলাকা জেলা প্রশাসনের অধীনে রয়েছে। সেগুলি বন বিভাগের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ হলে সংরক্ষণকেন্দ্র ঘোষণার পথে প্রকল্পটি আরও এগোবে।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে পঞ্চ পোখরি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। গভীর জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি ছোট প্রাকৃতিক জলাশয়। এই জলাশয়গুলির চারপাশের পরিবেশ সালাম্যান্ডারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে পোখরিয়াটার রয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে। নামথিং পোখরি ও তার সংলগ্ন এলাকার জন্য ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে প্রায় ১৫ একর এলাকাকে কঠোর আইনি সংরক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সালাম্যান্ডারের প্রকৃত আবাসস্থল ছোট ছোট এলাকায় ছড়িয়ে থাকায় শুধু একটি নির্দিষ্ট জায়গা সংরক্ষণ করলেই কাজ শেষ হবে না। আশপাশের জলাশয় এবং সংলগ্ন পরিবেশকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
হিমালয়ান সালাম্যান্ডারের কিছু প্রজননক্ষেত্র চা-বাগানের সীমানার কাছেও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে মার্গারেট’স হোপ টি এস্টেটের কথা উঠে এসেছে।
বনদপ্তর ও চা-বাগান কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা করে এসব জলাশয়ের চারপাশে নির্দিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হল, প্রজননক্ষেত্রে মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো এবং জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা।
কারণ সালাম্যান্ডারের মতো সংবেদনশীল প্রাণীর ক্ষেত্রে একটি ছোট জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেলেও স্থানীয়ভাবে তাদের সংখ্যা কমে যেতে পারে।
হিমালয়ান সালাম্যান্ডার স্যাংচুয়ারি তৈরি হলে সংরক্ষণকাজ আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। নিয়মিত নজরদারি, আবাসস্থল সংরক্ষণ, জলাশয়ের মান পরীক্ষা, প্রজননক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার সুযোগ বাড়বে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক থেকে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে বলে বনদপ্তর আশা করছে। সেই অর্থ সংরক্ষণ পরিকাঠামো ও সংবেদনশীল পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র রক্ষার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একটি বিরল উভচর প্রাণীকে রক্ষা করার পাশাপাশি তার সঙ্গে যুক্ত পুরো পরিবেশব্যবস্থাকেও সুরক্ষিত করা সম্ভব হতে পারে।
হিমালয়ের পাহাড়ে আজও টিকে থাকা এই ছোট্ট উভচর প্রাণী আমাদের পৃথিবীর সুদীর্ঘ প্রাকৃতিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত স্মারক। কোটি কোটি বছরের পরিবর্তনের পরেও তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে, প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কিছু প্রাণী কত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।
কিন্তু সেই টিকে থাকা এখন মানুষের কর্মকাণ্ডের চাপে প্রশ্নের মুখে। পাহাড়ে নগরায়ন, পর্যটন, দূষণ এবং জলাশয়ের পরিবর্তন যদি চলতেই থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এই প্রাণীকে তার স্বাভাবিক পরিবেশে দেখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তাই কার্শিয়াংয়ে প্রস্তাবিত হিমালয়ান সালাম্যান্ডার স্যাংচুয়ারি শুধু একটি সংরক্ষণকেন্দ্র নয়। এটি হতে পারে পাহাড়ি জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য এবং একটি প্রাচীন উভচর প্রজাতিকে একসঙ্গে রক্ষা করার বড় উদ্যোগ। জুরাসিক যুগের স্মৃতি বহন করা এই অদ্ভুত প্রাণী আগামী প্রজন্মের কাছেও বেঁচে থাকবে কি না, তার উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে আজকের সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ওপর।



