এনবি সংবাদ, আইটি ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, ততই বাড়ছে একটি বড় প্রশ্ন—এই প্রযুক্তি কি কোনওদিন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে? আর যদি সত্যিই অত্যন্ত শক্তিশালী এআই তৈরি হয়, তাহলে সেটি কি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে?
এআই নিয়ে কাজ করা গবেষকদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই এই সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, অত্যন্ত উন্নত এআই যদি মানুষের নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। আবার এআই গবেষকদের আরেকটি অংশ এই ধরনের ‘মানবজাতির বিলুপ্তি’র পূর্বাভাস নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান।
অর্থাৎ বিষয়টি এখনও নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। বরং এটি সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে চলা একটি বড় বিতর্ক।
এআই নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত আশঙ্কাগুলিকে সাধারণত ‘এআই ডুম’ বা মানবসভ্যতার জন্য চরম বিপর্যয়ের পরিস্থিতি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই ধারণাগুলির কিছুতে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি রয়েছে, আবার কিছু পুরোপুরি ভবিষ্যৎ-নির্ভর কল্পিত পরিস্থিতি।
তাহলে কীভাবে এআই মানবজাতির জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে?
একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি হল, অত্যন্ত সক্ষম কোনও এআই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোয় প্রবেশ করতে পারে।
ধরা যাক, কোনও এআই ব্যবস্থা ইন্টারনেট পরিষেবা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কে অননুমোদিত প্রবেশের ক্ষমতা অর্জন করল। তখন সেটি যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ইচ্ছামতো এসব ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে হাসপাতাল, পরিবহণ, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও ব্যাহত হতে পারে। ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির মডেল, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
এআই নিয়ে আরও বড় একটি আশঙ্কা এসেছে ‘AI 2027’ নামের একটি ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ থেকে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এই প্রকল্পে লেখকেরা অত্যন্ত উন্নত এআই কীভাবে দ্রুত নিজেকে আরও সক্ষম করে তুলতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁরা নিজেরাই এটিকে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হিসেবে বর্ণনা করেছেন, নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে নয়।
এই পরিস্থিতিতে এআই গবেষণার বড় অংশ নিজেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। ফলে নতুন প্রজন্মের এআই আগের প্রজন্মের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
এরপর যদি সেই প্রযুক্তি রোবট, সাইবার ব্যবস্থা, অস্ত্র প্রযুক্তি বা অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে মানুষের ওপর তার প্রভাব ব্যাপক হতে পারে।
‘AI 2027’ প্রকল্পের লেখকেরা অবশ্য নিজেরাই বলেছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে এই ধরনের দৃশ্যপট স্বভাবতই অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং তাদের মডেলের ফল নিশ্চিত নয়।
এআই নিয়ে সবচেয়ে পরিচিত চিন্তাগুলির একটি হল ‘পেপারক্লিপ ম্যাক্সিমাইজার’ ধারণা। দার্শনিক নিক বোস্ট্রম বহু বছর আগে এই চিন্তার পরীক্ষাটি তুলে ধরেছিলেন।
ধরা যাক, একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআইকে শুধু একটি কাজ দেওয়া হল—যত বেশি সম্ভব কাগজের ক্লিপ তৈরি করতে হবে।
এআইটি মানুষকে ঘৃণা করে না। মানুষের প্রতি তার কোনও রাগও নেই। কিন্তু তার একমাত্র লক্ষ্য যদি হয় যত বেশি সম্ভব কাগজের ক্লিপ তৈরি করা, তাহলে সেই লক্ষ্য পূরণে সে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে—এমনটাই এই চিন্তার পরীক্ষার মূল বক্তব্য।
সমস্যা তৈরি হবে তখনই, যখন মানুষের অস্তিত্ব সেই লক্ষ্য পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এআই যদি মনে করে মানুষের জন্য ব্যবহৃত কোনও সম্পদ কাগজের ক্লিপ তৈরিতে ব্যবহার করা আরও কার্যকর, তাহলে তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই ধারণার উদ্দেশ্য মূলত একটি বিষয় বোঝানো—কোনও অত্যন্ত শক্তিশালী এআইকে বিপজ্জনক হতে মানুষের প্রতি ঘৃণা থাকা জরুরি নয়। মানুষের লক্ষ্য ও এআইয়ের লক্ষ্য যদি মৌলিকভাবে আলাদা হয়, তাহলেই সমস্যা তৈরি হতে পারে।
আরও একটি মত অনুযায়ী, ভবিষ্যতের অতিবুদ্ধিমান এআই কীভাবে মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা আজ বসে পুরোপুরি অনুমান করা সম্ভব নয়।
কারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও সম্ভাব্য অতিমানবীয় এআইয়ের সক্ষমতার মধ্যে যদি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে এআই কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে বা কোন কৌশল ব্যবহার করবে, তা মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন হতে পারে।
এই যুক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয় মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্যের। একটি প্রাণী মানুষের প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল পুরোপুরি বুঝতে পারে না। একইভাবে, মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম কোনও ভবিষ্যৎ এআই কী করতে পারে, সেটিও হয়তো মানুষের পক্ষে আগেভাগে অনুমান করা কঠিন হবে।
এআই নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা মতও রয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন, মানবজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির মতো চরম পরিস্থিতির চেয়ে মানুষের হাতে এআইয়ের অপব্যবহার আরও বাস্তব ঝুঁকি হতে পারে।
অর্থাৎ সমস্যা এআই নিজে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে কি না, শুধু সেটি নয়। মানুষ যদি এআইকে ব্যবহার করে সাইবার হামলা, প্রতারণা, নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় আক্রমণ বা অন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড চালায়, তাহলেও বড় ক্ষতি হতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এআই নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের তৈরি নিয়ম, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এআই শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রযুক্তি হিসেবে থাকছে না। নতুন প্রজন্মের এআই এজেন্টকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার, বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করার এবং একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।
এতেই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে।
একটি সাধারণ চ্যাটবট ভুল উত্তর দিলে সমস্যা একটি নির্দিষ্ট উত্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু কোনও স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট যদি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে, তাহলে তার ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাবও অনেক বড় হতে পারে।
তাই এআই যত বেশি স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, তার কাজের সীমা, অনুমতি এবং মানুষের তদারকি নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
‘AI 2027’ নিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি দৃশ্যপট বা scenario, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। প্রকল্পটির লেখকেরা জানিয়েছেন, তারা ট্রেন্ড বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মতামত, কৌশলগত অনুশীলন এবং পূর্ববর্তী পূর্বাভাসের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করেছেন।
তাদের মূল আলোচনায় দ্রুত এআই অগ্রগতি, এআই দিয়ে এআই গবেষণা স্বয়ংক্রিয় হওয়া এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এআই তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছেন যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এই ধরনের অনুমানে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি।
অর্থাৎ ‘AI 2027’কে আগামী দিনের নিশ্চিত ছবি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এর সরাসরি উত্তর এখনই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হবে—এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ বর্তমানে নেই। একইভাবে ভবিষ্যতে এমন কিছু কখনও ঘটতে পারবে না, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
ঝুঁকি নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার মূল জায়গা হল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বয়ংক্রিয় এআই ভবিষ্যতে কতটা সক্ষম হবে এবং মানুষের দেওয়া লক্ষ্য থেকে তার আচরণ কতটা বিচ্যুত হতে পারে।
একদল গবেষক মনে করেন, সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা এখন থেকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার। অন্যদিকে কিছু গবেষক মনে করেন, মানবজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে এমন এআই ঝুঁকি—যেমন সাইবার হামলা, প্রতারণা, অপব্যবহার এবং ভুল সিদ্ধান্ত—এসবের দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত।
বিতর্ক যেদিকেই যাক, একটি বিষয়ে অনেকটাই ঐকমত্য রয়েছে—এআই যত বেশি শক্তিশালী হবে, নিরাপত্তা তত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এআই তৈরি করার সময় কী ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, সেটি কীভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, ভুল করলে কীভাবে থামানো যাবে এবং মানুষের অনুমতি ছাড়া কতটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
ভবিষ্যতের এআই মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি বড় ঝুঁকি তৈরি করবে, তা আজ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রযুক্তির ক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা গবেষণা, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়েও আলোচনা বাড়াতে হবে।
শেষ পর্যন্ত আসল প্রশ্ন শুধু ‘এআই মানুষকে ধ্বংস করবে কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হল, মানুষ কতটা নিরাপদভাবে এমন শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরি ও ব্যবহার করতে পারবে।



