এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : সমুদ্রের গভীরতা যত বাড়ে, ততই যেন সামনে আসে পৃথিবীর অজানা এক জগত। সূর্যের আলো যেখানে পৌঁছায় না, চারপাশে যেখানে ঘন অন্ধকার, সেখানেই বসবাস করে নানা অদ্ভুত প্রাণী। সম্প্রতি সেই গভীর সমুদ্রেই এমন একটি দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে, যা দেখে বিস্মিত গবেষকেরাও।
প্রায় ২ হাজার মিটার গভীরে একটি বিশাল সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরের উপর ছোট একটি সন্ধিপদ প্রাণীকে চেপে বসে থাকতে দেখা গেছে। প্রাণীটি যেন নিজের পায়ে হাঁটছে না, বরং বিশাল সামুদ্রিক মাকড়সাটিকে ‘চলন্ত বাহন’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ঘটনাটি একবারের জন্য ঘটেনি। একই ধরনের দৃশ্য একাধিক সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরে দেখা যাওয়ায় গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে থাকতে পারে নির্দিষ্ট কোনও আচরণ।
ঘটনাটি ধরা পড়েছে চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রান্তসীমার গভীর সমুদ্রে। সমুদ্রতল পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষকেরা ব্যবহার করছিলেন রোবোটিক সাবমার্সিবল ‘সুবাস্তিয়ান’। এই ধরনের যন্ত্রের সাহায্যে মানুষ যেখানে সরাসরি পৌঁছাতে পারে না, সেখানকার প্রাণী ও পরিবেশের ছবি এবং ভিডিও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
গভীর সমুদ্রের সেই পর্যবেক্ষণের সময় ক্যামেরায় ধরা পড়ে অদ্ভুত দৃশ্যটি। বিশাল আকারের একটি সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরে শক্ত করে ধরে রয়েছে ছোট আকারের এক সন্ধিপদ প্রাণী। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, ছোট প্রাণীটি যেন বড় মাকড়সাটির শরীরে চড়ে কোথাও যাচ্ছে।
প্রথমে গবেষকেরা ঘটনাটিকে নিছক কাকতালীয় সংস্পর্শ বলেই ধরে নিতে পারতেন। কিন্তু পরে আরও কয়েকটি সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরেও একই ধরনের ছোট প্রাণীকে দেখা যায়। তখনই বিষয়টি গবেষকদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট সন্ধিপদ প্রাণীগুলি সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরের নির্দিষ্ট অংশ আঁকড়ে ধরে থাকে। বিশেষ করে মাকড়সার পাল্প এবং ডিম বহনকারী উপাঙ্গের কাছে তাদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।
এই পর্যবেক্ষণ থেকেই বিজ্ঞানীদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, ছোট প্রাণীগুলি কি ইচ্ছা করেই সামুদ্রিক মাকড়সার শরীর ব্যবহার করছে?
যদি এমনটাই হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। হয়তো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য বড় প্রাণীটিকে ব্যবহার করছে ছোট প্রাণীটি। আবার এমনও হতে পারে, সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরে থাকলে খাবারের উৎসের কাছাকাছি পৌঁছানো সহজ হয়।
আরও একটি সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষকেরা। বড় প্রাণীর শরীরের সঙ্গে থাকলে ছোট প্রাণীটি হয়তো কিছু শিকারির নজর এড়াতে পারে। অর্থাৎ সামুদ্রিক মাকড়সা একই সঙ্গে তার কাছে ‘যানবাহন’ এবং সম্ভাব্য আশ্রয় হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষকেরা এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না ছোট প্রাণীটি কেন সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরে চেপে থাকে। তবে ঘটনাটি যদি নিয়মিত আচরণের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সমুদ্রের প্রায় ২ হাজার মিটার গভীরতায় পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। সেখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না। পানির চাপ অত্যন্ত বেশি এবং খাবারের উৎসও সহজে পাওয়া যায় না। ফলে ছোট প্রাণীদের জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় খাবার খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কোনও বড় প্রাণীর শরীরকে ‘চলন্ত ট্যাক্সি’র মতো ব্যবহার করা শক্তি সাশ্রয়ের একটি উপায় হতে পারে। ছোট প্রাণীটিকে যদি নিজে সাঁতার কেটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে না হয়, তাহলে তার শক্তি বেঁচে যায়। সেই শক্তি অন্য কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।
অবশ্য এটি এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়। গবেষকেরা কেবল সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলি খতিয়ে দেখছেন।
ছোট প্রাণীটির এই আচরণের সঙ্গে খাবারের সম্পর্কও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গভীর সমুদ্রে খাবার পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন। সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে মৃত জীব ও জৈব পদার্থ নিচে নেমে এসে গভীর সমুদ্রের অনেক প্রাণীর খাদ্যের উৎস তৈরি করে। কোথায় খাবার পাওয়া যাবে, তা সবসময় অনুমান করা সহজ নয়।
যদি সামুদ্রিক মাকড়সা এমন কোনও এলাকায় নিয়মিত চলাচল করে যেখানে ছোট প্রাণীটির প্রয়োজনীয় খাবার পাওয়া যায়, তাহলে তার শরীরে চেপে দূরত্ব পাড়ি দেওয়া সুবিধাজনক হতে পারে।
তবে ছোট প্রাণীটি ঠিক কী খায় এবং সামুদ্রিক মাকড়সার সঙ্গে তার সম্পর্ক খাদ্যনির্ভর কি না, তা জানতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
গভীর সমুদ্রের পরিবেশে ছোট প্রাণীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল বেঁচে থাকা। সেখানে বড় প্রাণীর শরীরকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়।
ছোট প্রাণীটি যদি সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরের সঙ্গে মিশে থাকে, তাহলে কোনও শিকারির কাছে তাকে আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। বিশাল মাকড়সার শরীরের আড়ালে থাকলে ছোট প্রাণীটি সাময়িক সুরক্ষাও পেতে পারে।
তবে এখানেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। সামুদ্রিক মাকড়সাটি কি এই ছোট প্রাণীর উপস্থিতি মেনে নেয়? নাকি সে বিষয়টি বুঝতেই পারে না? দুই প্রাণীর মধ্যে কোনও পারস্পরিক সুবিধা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও এখনও পরিষ্কার নয়।
সামুদ্রিক মাকড়সার শরীরে অন্য প্রাণীকে থাকতে দেখা গেলেই সেটিকে সরাসরি পরজীবী সম্পর্ক বলা যায় না। কোনও প্রাণী অন্য প্রাণীর শরীর ব্যবহার করছে মানেই যে সে তার ক্ষতি করছে, এমন নয়।
প্রাণীদের মধ্যে এমন অনেক সম্পর্ক দেখা যায় যেখানে একটি প্রাণী অন্যটির শরীরকে আশ্রয় বা চলাচলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে দুই পক্ষই সুবিধা পেতে পারে। কোথাও একজন সুবিধা পেলেও অন্য প্রাণীর বিশেষ ক্ষতি হয় না।
এই ঘটনাটি ঠিক কোন ধরনের সম্পর্কের উদাহরণ, তা বোঝার জন্য ছোট প্রাণীটির আচরণ, সামুদ্রিক মাকড়সার প্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলির একটি হল, গবেষকেরা একই ধরনের ঘটনা একাধিক সামুদ্রিক মাকড়সার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেছেন।
একটি প্রাণীর শরীরে হঠাৎ অন্য প্রাণী এসে বসলে সেটিকে দুর্ঘটনা বা কাকতালীয় ঘটনা বলে ধরে নেওয়া সহজ। কিন্তু একাধিক প্রাণীর ক্ষেত্রে একই আচরণ দেখা গেলে গবেষণার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
তাই বিজ্ঞানীরা এখন জানতে চাইছেন, গভীর সমুদ্রের আরও কত প্রাণী এমনভাবে বড় প্রাণীকে ব্যবহার করে? এটি কি নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রে এমন আচরণ আরও সাধারণ?
চিলির জাতীয় প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের আচরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। গবেষণাটি ‘ইকোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গভীর সমুদ্র এখনও পৃথিবীর সবচেয়ে কম পরিচিত বাস্তুতন্ত্রগুলির একটি। সমুদ্রের বিশাল অংশে মানুষ সরাসরি পৌঁছাতে পারে না। আধুনিক রোবোটিক সাবমার্সিবল ও ক্যামেরার সাহায্যে ধীরে ধীরে সেই অন্ধকার জগতের প্রাণীদের আচরণ সামনে আসছে।
সামুদ্রিক মাকড়সার গায়ে চেপে ছোট প্রাণীর চলাচলের এই দৃশ্য তাই শুধু অদ্ভুত একটি ঘটনা নয়। এটি দেখাচ্ছে, বেঁচে থাকার জন্য গভীর সমুদ্রের প্রাণীরা কী ধরনের কৌশল ব্যবহার করতে পারে, তার এখনও কত কিছু আমাদের অজানা।
হয়তো সত্যিই সেই অন্ধকার জগতে বড় প্রাণীর শরীর হয়ে উঠছে ছোট প্রাণীর ‘চলন্ত ট্যাক্সি’। আবার এর পেছনে থাকতে পারে খাবার, আশ্রয় বা অন্য কোনও জটিল পরিবেশগত সম্পর্ক। আপাতত রহস্যের উত্তর খুঁজতেই গবেষকদের আরও গভীরে যেতে হবে।



