এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : আজকের দিনে মিশরের পশ্চিমাঞ্চল মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল মরুভূমি। চারদিকে বালি, পাথর আর শুষ্ক পরিবেশ। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে এই একই অঞ্চলকে একেবারেই অন্যরকম মনে হবে। প্রায় ৭ কোটি বছর আগে এখানেই ছিল বিশাল এক প্রাচীন সমুদ্র। সেই সমুদ্রের জলে ঘুরে বেড়াত ভয়ংকর সামুদ্রিক সরীসৃপ মোসাসর।
সম্প্রতি মিশরের পশ্চিম মরুভূমি থেকে পাওয়া একটি জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের সেই হারিয়ে যাওয়া সামুদ্রিক জগতের নতুন ছবি দেখিয়েছে। জীবাশ্মটি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মোসাসরের একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন। এই প্রাণীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তার অস্বাভাবিক লম্বা ও সরু চোয়াল।
এই চোয়ালের গঠনই গবেষকদের ভাবাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কারণ, অন্য অনেক মোসাসরের তুলনায় এই প্রাণীর শারীরিক গঠন ছিল আলাদা। ফলে তার শিকারের কৌশলও সম্ভবত ছিল অন্যরকম।
বর্তমান মিশরের পশ্চিম মরুভূমি সাহারা মরুভূমিরই অংশ। এই অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক জায়গা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কোটি কোটি বছর আগে এখানে এমন পরিবেশ ছিল না।
ক্রেটেসিয়াস যুগের শেষ দিকে, প্রায় ৭ কোটি বছর আগে, উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্রের জলের নিচে ছিল। সেই সময়ের উষ্ণ সমুদ্র ছিল নানা ধরনের সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল। ছোট মাছ থেকে শুরু করে বিশাল আকারের শিকারি সরীসৃপ—সব মিলিয়ে সেখানে তৈরি হয়েছিল এক সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র।
সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সমুদ্র সরে যায়, বদলে যায় ভূমির চরিত্র। একসময় যে জায়গায় ঢেউ খেলত সমুদ্রের জল, সেখানেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় শুষ্ক মরুভূমি।
তবে প্রকৃতি তার পুরনো ইতিহাস পুরোপুরি মুছে দেয়নি। পাথরের স্তর এবং মাটির গভীরে রয়ে গেছে সেই প্রাচীন সমুদ্রের অসংখ্য চিহ্ন। নতুন আবিষ্কৃত মোসাসরের জীবাশ্মও সেই হারিয়ে যাওয়া জগতের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
মোসাসর ছিল ক্রেটেসিয়াস যুগের অন্যতম পরিচিত সামুদ্রিক শিকারি। দেখতে সরীসৃপের মতো হলেও এরা স্থলচর ডাইনোসর ছিল না। সমুদ্রেই তারা জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটাত।
বিভিন্ন প্রজাতির মোসাসরের আকার ও শারীরিক গঠনে পার্থক্য ছিল। কেউ ছিল বিশালাকার, কেউ তুলনামূলকভাবে ছোট। তাদের শক্তিশালী চোয়াল ও দাঁত তাদের শিকার ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
সেই সময় সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে মোসাসররা ছিল গুরুত্বপূর্ণ শিকারি। মাছ, অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের শিকার তারা খেত।
তবে মিশরের মরুভূমি থেকে পাওয়া নতুন প্রজাতিটি এই পরিচিত ছবিতে কিছুটা ভিন্নতা যোগ করছে।
নতুন প্রজাতির মোসাসরের জীবাশ্মে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তার চোয়াল। গবেষকদের মতে, একই পরিবারের অন্য অনেক সদস্যের তুলনায় এই প্রাণীর চোয়াল ছিল বেশ লম্বা এবং সরু।
সাধারণভাবে শক্তিশালী শিকারি প্রাণীর চোয়াল দেখলে মনে হতে পারে, সেটি বড় ও শক্তিশালী শিকারকে কামড়ে ধরার জন্য তৈরি। কিন্তু এই নতুন মোসাসরের চোয়ালের গঠন অন্য সম্ভাবনার কথা বলছে।
লম্বা ও সরু চোয়াল দ্রুত গতিতে সামনে বা পাশে নাড়ানো সহজ হতে পারে। ফলে ছোট এবং দ্রুত সাঁতার কাটা মাছকে আচমকা ধরে ফেলার ক্ষেত্রে এই ধরনের গঠন সুবিধা দিতে পারে।
অর্থাৎ এই মোসাসর হয়তো সবসময় শক্তি প্রয়োগ করে বড় শিকার ধরত না। বরং গতি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং সঠিক মুহূর্তে আক্রমণ করাই তার শিকার ধরার প্রধান কৌশল ছিল।
গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, এই নতুন প্রজাতির মোসাসর সম্ভবত এমন শিকার বেছে নিত যাদের ধরতে দ্রুততা প্রয়োজন।
ধরা যাক, একটি ছোট মাছ খুব দ্রুত সাঁতার কেটে পালিয়ে যাচ্ছে। বিশাল ও ভারী চোয়াল দিয়ে তাকে ধরার চেয়ে লম্বা, সরু চোয়াল দ্রুত সামনে নিয়ে গিয়ে আঘাত করা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। আধুনিক জলজ প্রাণীদের মধ্যেও এমন শারীরিক অভিযোজন দেখা যায়, যেখানে নির্দিষ্ট ধরনের খাবার সংগ্রহের জন্য শরীরের গঠন বিশেষভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
তবে এটি এখনও গবেষকদের ব্যাখ্যা ও সম্ভাব্য শিকার কৌশল। জীবাশ্ম থেকে একটি প্রাণীর আচরণ পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। তাই চোয়ালের গঠন থেকে তার জীবনযাপন সম্পর্কে আরও তথ্য খুঁজে বের করতে ভবিষ্যতে গবেষণা প্রয়োজন।
এই আবিষ্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, একই মোসাসর পরিবারের মধ্যেও পরিবেশ ও খাদ্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছিল।
সব মোসাসর যে একইভাবে শিকার করত, এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিভিন্ন প্রজাতি হয়তো সমুদ্রের আলাদা অংশে বাস করত এবং ভিন্ন ধরনের খাবারের ওপর নির্ভর করত।
কোনও প্রজাতি হয়তো বড় শিকার ধরার জন্য শক্তিশালী চোয়াল ব্যবহার করত। অন্য কোনও প্রজাতি ছোট ও দ্রুতগতির প্রাণী ধরার জন্য তৈরি করেছিল সরু চোয়াল।
নতুন জীবাশ্মটি তাই শুধু একটি অজানা প্রাণীর পরিচয় দিচ্ছে না। এটি ক্রেটেসিয়াস যুগের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র কতটা বৈচিত্র্যময় ছিল, সেই বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
আজকের মরুভূমি দেখে সহজে বোঝার উপায় নেই যে এই জায়গার অতীতে বিশাল সমুদ্র ছিল। কিন্তু পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এমন বহু পরিবর্তনের সাক্ষী।
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মহাদেশের অবস্থান বদলেছে, সমুদ্রের বিস্তার পরিবর্তিত হয়েছে এবং ভূখণ্ডের উচ্চতা ও আকৃতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলেই একটি সামুদ্রিক অঞ্চল পরবর্তীকালে স্থলভাগে পরিণত হতে পারে।
তারপর আরও দীর্ঘ সময়ে সেই স্থলভাগ বদলে গিয়ে মরুভূমির রূপ নেয়।
তাই মিশরের পশ্চিম মরুভূমিতে পাওয়া সামুদ্রিক জীবাশ্মকে শুধু একটি প্রাণীর হাড় বা চোয়ালের অংশ হিসেবে দেখা যায় না। এগুলি আসলে পৃথিবীর পরিবেশ কীভাবে কোটি কোটি বছরে বদলে গেছে, তার প্রাকৃতিক নথি।
নতুন মোসাসরের জীবাশ্ম যেন সময়ের গভীরতা থেকে উঠে আসা একটি বার্তা। যে জায়গায় আজ মানুষ বালির মধ্যে পথ খোঁজে, সেখানেই একসময় সমুদ্রের জলে শিকার করত ভয়ংকর সামুদ্রিক সরীসৃপ।
প্রায় ৭ কোটি বছর আগের সেই প্রাণী আজ আর পৃথিবীতে নেই। তার সমুদ্রও নেই। কিন্তু পাথরের স্তরে সংরক্ষিত জীবাশ্ম তার অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করছে।
এই ধরনের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের শুধু নতুন প্রাণীর নাম বা বৈশিষ্ট্য জানতে সাহায্য করে না। এর মাধ্যমে বোঝা যায় প্রাচীন প্রাণীরা কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল, কী খেত এবং তাদের বাসস্থান কেমন ছিল।
সবচেয়ে বড় কথা, মিশরের মরুভূমির বালির নিচে লুকিয়ে থাকা এই জীবাশ্ম আবারও মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর বর্তমান চেহারা চিরস্থায়ী নয়। আজকের মরুভূমি একসময় সমুদ্র হতে পারে, আর সেই সমুদ্রের শিকারি প্রাণী কোটি কোটি বছর পরে মানুষের সামনে ফিরে আসতে পারে একটি জীবাশ্মের মাধ্যমে।



