সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসমুদ্রের গভীরে ছাতা মেলে খাবার ধরে অদ্ভুত প্রাণী, কার্বন চক্রে কী ভূমিকা?

সমুদ্রের গভীরে ছাতা মেলে খাবার ধরে অদ্ভুত প্রাণী, কার্বন চক্রে কী ভূমিকা?

সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে গভীর জলের দিকে ক্রমাগত নেমে আসে ক্ষুদ্র জৈবকণা, মৃত প্ল্যাঙ্কটনের অবশেষ, মলকণা এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ। জলের মধ্যে তুষারপাতের মতো এই কণাগুলির পতনকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘মেরিন স্নো’ বা সামুদ্রিক তুষার।

এনবি সংবাদ ডেস্ক : সমুদ্রের গভীরে এমন এক প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যার খাবার ধরার কৌশল সত্যিই বিস্ময়কর। মুখের চারপাশে থাকা স্বচ্ছ পর্দার মতো অংশটি ছাতার মতো মেলে ধরে প্রাণীটি জলের মধ্যে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র জৈবকণা সংগ্রহ করে। তার নাম Pelagothuria natatrix। এটি এক বিশেষ ধরনের সামুদ্রিক শসা বা সি কিউকাম্বার। তবে সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী পরিচিত সামুদ্রিক শসাদের মতো নয়, এই প্রাণী গভীর জলে ভেসে বেড়ায়।

গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছে পরিচালিত ডুবোযানের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, প্রায় ২৫০ থেকে ৬৫০ মিটার গভীরতায় এই প্রাণীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। আরও আকর্ষণীয় বিষয় হল, খাবার সংগ্রহের এই কৌশল সমুদ্রের কার্বন পরিবহণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কারণ, সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে নিচে নেমে আসা জৈবকণা খাওয়ার মাধ্যমে প্রাণীটি কার্বনের স্বাভাবিক যাত্রাপথে প্রভাব ফেলতে পারে।

ছোট্ট এই সামুদ্রিক প্রাণীর জীবনযাপন তাই শুধু জীববিজ্ঞানীদেরই আগ্রহের বিষয় নয়। সমুদ্র কীভাবে কার্বন ধরে রাখে এবং গভীর জলের খাদ্যজাল কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

Pelagothuria natatrix এক ধরনের পেলাজিক বা মুক্তভাবে ভেসে বেড়ানো সামুদ্রিক শসা। সাধারণ সামুদ্রিক শসাদের অনেকেই সমুদ্রের তলদেশে চলাফেরা করে এবং সেখানকার জৈব পদার্থ থেকে খাবার সংগ্রহ করে। কিন্তু এই প্রজাতির জীবনযাপনের ধরন বেশ আলাদা।

এর মুখের চারপাশে রয়েছে পাতলা, পর্দার মতো প্রসারিত একটি অংশ। এই অংশটি অনেকটা খোলা ছাতা বা চোঙের মতো দেখতে। জলের মধ্যে ভেসে থাকার সময় প্রাণীটি এই পর্দা প্রসারিত করে খাবার সংগ্রহের উপযোগী একটি কাঠামো তৈরি করে।

সমুদ্রের গভীরে খাবার সব সময় বড় আকারের প্রাণী বা দৃশ্যমান শিকার হিসেবে পাওয়া যায় না। জলের মধ্যে ভেসে থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র জৈবকণা, মৃত অণুজীবের অবশেষ এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ। এই প্রাণী সেই কণাগুলিই সংগ্রহ করে খায়।

এর ফলে সমুদ্রের এমন একটি খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে প্রাণীটির যোগাযোগ তৈরি হয়, যা উপরিভাগের জীবজগৎ থেকে শুরু হয়ে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে গভীর জলের দিকে ক্রমাগত নেমে আসে ক্ষুদ্র জৈবকণা, মৃত প্ল্যাঙ্কটনের অবশেষ, মলকণা এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ। জলের মধ্যে তুষারপাতের মতো এই কণাগুলির পতনকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘মেরিন স্নো’ বা সামুদ্রিক তুষার।

নাম শুনে বরফের কথা মনে হলেও মেরিন স্নো আসলে বরফ নয়। এটি বিভিন্ন জৈব ও অজৈব কণার মিশ্রণ, যা সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামে। এই কণাগুলির মধ্যে থাকা জৈব পদার্থ গভীর সমুদ্রের বহু প্রাণীর খাদ্যের উৎস।

Pelagothuria natatrix এই খাবার সংগ্রহের জন্য তার মুখের চারপাশের পর্দার মতো অংশটি ব্যবহার করে। জলের মধ্যে ভেসে থাকার সময় এই অংশে কণা জমা হতে পারে। এরপর মুখের কাছে থাকা খাদ্য সংগ্রহের গঠন ও শুঁড়ের সাহায্যে প্রাণীটি সেই খাবার গ্রহণ করে।

এই কৌশলের সুবিধা হল, খাবারের সন্ধানে সমুদ্রের তলদেশে নামতে হয় না। জলের মধ্যে ভেসে থাকা অবস্থাতেই আশপাশের জৈবকণা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

গভীর সমুদ্রের পরিবেশে যেখানে খাবার তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেখানে এ ধরনের বিশেষ অভিযোজন প্রাণীটির বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই প্রাণীটির উপস্থিতি ও বিস্তার সম্পর্কে জানতে গবেষকেরা গভীর সমুদ্রের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করেছেন। আমেরিকার মন্টেরে বে অ্যাকোয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ব্রুস রবিসনের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকার ২৩টি ডুবোযান অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এই পর্যবেক্ষণগুলির মাধ্যমে সমুদ্রের বিভিন্ন গভীরতায় প্রাণীটির উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ২৫০ থেকে ৬৫০ মিটার গভীরতার মধ্যে Pelagothuria natatrix-এর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গভীর সমুদ্রের বহু প্রাণীর জীবনযাপন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনও সীমিত। সমুদ্রের গভীরে আলো কম, পরিবেশের চাপ বেশি এবং সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। ফলে ডুবোযান থেকে পাওয়া ছবি ও ভিডিও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একাধিক অভিযানের পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে কোনও প্রাণী কোথায় থাকে, কীভাবে চলাফেরা করে এবং কোন পরিবেশে তার উপস্থিতি বেশি, সে সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

তবে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রাণীটির উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেই সমগ্র মহাসাগরে তার বিস্তার সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। সেই জন্য আরও বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

এই গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল সমুদ্রের কার্বন চক্রের সঙ্গে প্রাণীটির সম্ভাব্য সম্পর্ক।

সমুদ্রের উপরিভাগে বসবাসকারী বহু অণুজীব ও প্ল্যাঙ্কটন সূর্যালোকের সাহায্যে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে জৈব পদার্থ তৈরি করে। এই জৈব পদার্থ খাদ্যজালের মাধ্যমে অন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। আবার মৃত জীব ও জৈবকণার একটি অংশ মেরিন স্নোর সঙ্গে সমুদ্রের গভীরে নেমে যায়।

এই প্রক্রিয়াকে সমুদ্রের জৈব কার্বন পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উপরিভাগ থেকে কার্বন গভীর জলে পৌঁছলে তার কিছু অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য সমুদ্রের গভীরে থেকে যেতে পারে। ফলে বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের মধ্যে কার্বনের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রক্রিয়াতেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

কিন্তু Pelagothuria natatrix-এর মতো প্রাণী যদি গভীর জলের মাঝপথেই এই জৈবকণা খেয়ে নেয়, তাহলে কার্বনের যাত্রাপথ বদলে যেতে পারে। কণার মধ্যে থাকা কার্বন তখন প্রাণীটির খাদ্যজালে প্রবেশ করে। পরে শ্বসন, বর্জ্য নির্গমন এবং জৈব পদার্থের পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে সেই কার্বন আবার অন্য প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে।

অর্থাৎ, উপরিভাগ থেকে নেমে আসা সমস্ত কার্বন সরাসরি সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছে যায় না। মাঝপথে বিভিন্ন প্রাণী ও অণুজীব সেই পদার্থ গ্রহণ করে এবং কার্বনের চলাচলকে প্রভাবিত করে।

বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। সমুদ্র বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন গ্রহণ করে এবং তার একটি অংশ গভীর জলে সঞ্চিত থাকে। এই কারণে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের কার্বন চক্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন।

সমুদ্রের কার্বন পরিবহণের হিসাব করতে গেলে শুধু উপরিভাগের প্ল্যাঙ্কটন বা সমুদ্রের তলদেশে জমে থাকা জৈব পদার্থের পরিমাণ জানলেই হয় না। মাঝের জলস্তরে থাকা প্রাণীরা কীভাবে খাবার গ্রহণ করছে, তারও গুরুত্ব রয়েছে।

Pelagothuria natatrix-এর মতো ভাসমান সামুদ্রিক শসা এই প্রক্রিয়ার একটি অংশ হতে পারে। তারা কত পরিমাণ জৈবকণা খায়, সেই কার্বনের কতটা তাদের শরীরে থাকে এবং পরে কীভাবে তা পরিবেশে ফিরে যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

তবে এই প্রাণী সমুদ্রের কার্বন সঞ্চয় কতটা বাড়ায় বা কমায়, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কার্বনের একটি অংশ গভীর সমুদ্রে পৌঁছনোর আগে খেয়ে ফেললেই যে সেটি আর কখনও সেখানে পৌঁছবে না, এমন নয়। প্রাণীর বর্জ্য, মৃতদেহ কিংবা খাদ্যজালের অন্য ধাপের মাধ্যমে সেই কার্বন আবার গভীর জলে যেতে পারে।

তাই কার্বন চক্রে এই প্রাণীর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করতে আরও পরিমাপ ও গবেষণা প্রয়োজন।

সমুদ্রের গভীর জলকে অনেক সময় অন্ধকার ও খাদ্যস্বল্প পরিবেশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু উপরিভাগ থেকে ক্রমাগত নেমে আসা জৈবকণা এই পরিবেশের বহু প্রাণীর জীবনধারণে সাহায্য করে।

মেরিন স্নো গভীর সমুদ্রের খাদ্যজালের সঙ্গে উপরিভাগের জীবজগতের সংযোগ তৈরি করে। ক্ষুদ্র জৈবকণা খেয়ে বিভিন্ন প্রাণী শক্তি সংগ্রহ করে। পরে সেই প্রাণীদের খেয়ে অন্য প্রাণীরা খাদ্য পায়। এভাবেই একটি জটিল খাদ্যজাল গড়ে ওঠে।

Pelagothuria natatrix-এর মতো প্রাণী এই ব্যবস্থায় কী ভূমিকা পালন করে, তা বোঝা গেলে গভীর সমুদ্রের খাদ্য প্রবাহ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

এ ছাড়া এই প্রাণীর শরীরের গঠন ও খাবার সংগ্রহের কৌশল সামুদ্রিক জীবের অভিযোজন সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে। সমুদ্রের গভীরে সীমিত খাদ্যসম্পদ ব্যবহার করে কীভাবে বিভিন্ন প্রাণী টিকে থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও এই ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।

সমুদ্রের ২৫০ থেকে ৬৫০ মিটার গভীরে ভেসে বেড়ানো এই অদ্ভুত সামুদ্রিক শসা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতিতে খাবার সংগ্রহের কৌশল কতটা বিচিত্র হতে পারে। মুখের চারপাশের ছাতার মতো পর্দা ব্যবহার করে জৈবকণা সংগ্রহের পদ্ধতি শুধু প্রাণীটির জীবনধারণের কৌশল নয়, সমুদ্রের গভীর খাদ্যজালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও।

গ্যালাপাগোসের কাছে ডুবোযানের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে নেমে আসা কার্বনের কতটা এই প্রাণীদের মাধ্যমে খাদ্যজালে প্রবেশ করে? সেই কার্বনের কতটা গভীর সমুদ্রে সঞ্চিত থাকে? আর কতটাই বা আবার পরিবেশে ফিরে যায়?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সমুদ্রের কার্বন চক্র বোঝার জন্য শুধু বিশাল তিমি, মাছ কিংবা প্ল্যাঙ্কটনের দিকে তাকালেই চলবে না। গভীর জলে ভেসে বেড়ানো ছোট ছোট প্রাণীর জীবনযাপনও পৃথিবীর বৃহত্তর পরিবেশব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ