ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় চাপে পড়েছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি ভূখণ্ডে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর সামনে এসেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মক্কা, জেদ্দা ও তাইফ এলাকায়ও সাময়িক সতর্কতা জারি করতে হয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষকে। মক্কার আকাশসীমার কাছে একটি ড্রোন প্রতিহত করার দাবিও করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা সহযোগিতার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা CENTCOM-এর মাধ্যমে সৌদি আরব ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সহযোগিতা চেয়েছে। তবে এই সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্য সরকারি ঘোষণা সীমিত এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে সহযোগিতার ধরন সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।
এই খবরকে কেন্দ্র করেই লেখিকা তসলিমা নাসরিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নির্ভরতা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল ভাবনা ছিল, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংকটের সময়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইয়েমেনের হুথি বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে। হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। তাদের কয়েকটি হামলায় সামরিক স্থাপনা, বিমানঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করার কথা বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলও উদ্বেগের কেন্দ্রে চলে এসেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর মক্কা, জেদ্দা ও তাইফ এলাকায় সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সৌদি সিভিল ডিফেন্স পরে জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়েছে।
এর পরদিন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। সৌদি কর্মকর্তারা মক্কার নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনাটির দায় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
মক্কা মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শহর। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলিম হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য সেখানে যান। ফলে শহরটির আকাশসীমা বা আশপাশে সামরিক হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
সাম্প্রতিক সতর্কতাটি তাই বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। সংবাদ সংস্থা AFP জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর মক্কা এলাকায় এমন সতর্কতা এই প্রথম জারি করা হয়েছিল।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি অনুযায়ী, মক্কার দিকে এগিয়ে আসা ড্রোনটি শহরের নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ধ্বংস করা হয়। তবে হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে সৌদি আরবের সম্ভাব্য ইসরায়েলি সহায়তা চাওয়ার খবরকে ঘিরে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম Israel Hayom এবং Jerusalem Post-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে CENTCOM-এর মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে। সেখানে হুথি হামলা মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত স্থাপনা রক্ষায় গোয়েন্দা তথ্য। ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন প্রতিরোধের অভিজ্ঞতাও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। ‘ইসরায়েল সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে নামছে’—এমন নিশ্চিত তথ্য এবং ‘গোয়েন্দা বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে’—এই দুই বিষয় এক নয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে মূলত দ্বিতীয় ধরনের যোগাযোগের কথাই উঠে এসেছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে সরাসরি মার্কিন হামলার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। পরিবর্তে গোয়েন্দা ও টার্গেটিং সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে সৌদি আরবকে একই সময়ে একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সামলাতে হচ্ছে। একদিকে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে ‘মুসলিম ন্যাটো’ কথাটি মূলত রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় ব্যবহৃত একটি বর্ণনা। ন্যাটোর মতো একটি একক সামরিক জোট হিসেবে এটিকে সরাসরি বিবেচনা করা ঠিক নয়।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিকভাবে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। AP-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদির সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে থাকা তুরস্ক ও পাকিস্তান এখনো সামরিকভাবে সক্রিয় হয়নি এবং চুক্তিটিও তখনও কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তসলিমা নাসরিন সৌদি আরবের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গা ছিল—সংকটের সময়ে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও রাডার ব্যবস্থার গুরুত্ব বেশি।
তাঁর মন্তব্যে ‘ড্রোন’ ও ‘রাডার’-এর উদাহরণ ব্যবহার করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যকে মূলত সৌদি আরবের রাজনৈতিক অবস্থান ও বাস্তব নিরাপত্তা প্রয়োজনের মধ্যে একটি বৈপরীত্য তুলে ধরার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
তবে তসলিমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্দিষ্ট পোস্টটির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য মূল উৎস এই অনুসন্ধানে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি। তাই তাঁর উদ্ধৃত কথাগুলোকে তাঁর নামে প্রচারিত বক্তব্য হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিতভাবে যাচাই করা সরাসরি উদ্ধৃতি হিসেবে নয়।
সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশগুলোর সম্পর্ক সবসময় শুধু ধর্ম, মতাদর্শ বা ঐতিহাসিক বিরোধের ওপর নির্ভর করে না। নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্বার্থও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে।
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এর একটি জটিল উদাহরণ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিরোধ থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। একইভাবে সৌদি আরবের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্কও বিভিন্ন সময় নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
বর্তমান হুথি হামলার ঘটনাও দেখাচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু বড় সেনাবাহিনী থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। ড্রোন শনাক্তকরণ, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, হুথিদের হামলা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর জবাবে রিয়াধ কোন ধরনের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করে। পাশাপাশি মক্কা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সৌদি কর্তৃপক্ষের জন্য বড় অগ্রাধিকার।
অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহযোগিতার খবর বাস্তবে কতটা এগোয়, সেটিও নজরে থাকবে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে মূলত যোগাযোগ ও সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহায়তার কথা বলা হয়েছে। সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সৌদির হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের বর্তমান সংকটকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটি বোঝা কঠিন। এটি একই সঙ্গে আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিষয়। আর এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই তসলিমা নাসরিনের মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি করেছে।



