সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeআবহাওয়াসুপার এল নিনোর দাপট, নভেম্বর-জানুয়ারিতে বদলে যেতে পারে বিশ্বের আবহাওয়া

সুপার এল নিনোর দাপট, নভেম্বর-জানুয়ারিতে বদলে যেতে পারে বিশ্বের আবহাওয়া

তাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বক্তব্য হল—২০২৬ সালের এল নিনো আধুনিক পর্যবেক্ষণ-রেকর্ডের অন্যতম শক্তিশালী, এমনকি ঐতিহাসিক মাত্রার একটি ঘটনা হতে পারে। NOAA-র সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসও বলছে, এই এল নিনো শরৎ ও শীতে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থায় থাকতে পারে।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : এল নিনো নিয়ে এবার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদদের মধ্যে। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আবহাওয়ায় দেখা যাচ্ছে। আর আগামী কয়েক মাসে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NOAA) সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের উত্তর গোলার্ধের শরৎ ও শীতজুড়ে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের সময়কালে ঐতিহাসিক মাত্রার এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য।

এল নিনো আসলে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এই উষ্ণতা শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সমুদ্রের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে পৃথিবীর বহু অঞ্চলের বৃষ্টি, তাপমাত্রা, ঝড় এবং শুষ্কতার ধরন বদলে যেতে পারে।

২০২৬ সালের এল নিনোর ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হল এর শক্তি। NOAA জানিয়েছে, পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা ইতিমধ্যেই ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়েছে। আগস্টে Niño-3.4 অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

NOAA-র হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে এমন একটি শক্তিশালী এল নিনোর ৭৫ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে, যা ১৯৫০ সালের পরের আগের ঘটনাগুলির তুলনায় ঐতিহাসিক মাত্রায় পৌঁছতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে শক্তিশালী এল নিনো মানেই সব অঞ্চলে একই ধরনের চরম আবহাওয়া হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

‘গত ১ হাজার বছরে এমন এল নিনো হয়নি’—এই দাবি এখন বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক কিছু বিশ্লেষণে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য এল নিনোকে গত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তবে এটিকে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কারণ আধুনিক যন্ত্রনির্ভর পর্যবেক্ষণ মূলত কয়েক দশকের। তার আগের হাজার বছরের এল নিনো সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সরাসরি সমুদ্রের তাপমাত্রা মাপতে পারেননি। সেই সময়ের জলবায়ু সম্পর্কে ধারণা পেতে গাছের বলয়, প্রবাল, বরফস্তর এবং অন্যান্য প্রক্সি তথ্য ব্যবহার করতে হয়।

তাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বক্তব্য হল—২০২৬ সালের এল নিনো আধুনিক পর্যবেক্ষণ-রেকর্ডের অন্যতম শক্তিশালী, এমনকি ঐতিহাসিক মাত্রার একটি ঘটনা হতে পারে। NOAA-র সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসও বলছে, এই এল নিনো শরৎ ও শীতে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থায় থাকতে পারে।

এল নিনোর প্রভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় সামনে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এর শক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

NOAA-র সেপ্টেম্বরের RONI পূর্বাভাসে অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে মধ্যম মানের পূর্বাভাস ২.৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং নভেম্বর-জানুয়ারি সময়ে ২.৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখানো হয়েছে। পূর্বাভাসের ওপরের দিকের সম্ভাব্য মান আরও বেশি।

অর্থাৎ, আগামী কয়েক মাসে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর স্বাভাবিক প্রভাবও আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

তবে কোথায় ঠিক কী ধরনের আবহাওয়া তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় জলবায়ু, বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার উপর।

এল নিনোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর প্রভাব সব জায়গায় এক রকম নয়। কোনও অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে খরা দেখা দিতে পারে। আবার অন্য কোনও অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টি এবং বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ায় ইতিমধ্যেই এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির বিস্তীর্ণ অংশে বর্ষার আগমন পিছিয়ে যেতে পারে। প্রায় ৬১ শতাংশ এলাকায় নভেম্বরের আগে বর্ষা শুরু না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘায়িত শুষ্ক মৌসুমের সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

শুষ্ক আবহাওয়া কৃষির উপরও চাপ তৈরি করতে পারে। ধান, আখ, কোকো এবং পাম তেলের মতো ফসল উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে স্থানীয় কৃষির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এল নিনোর সঙ্গে ভারতের বর্ষার সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরেই গবেষণা চলছে। শক্তিশালী এল নিনো সাধারণত ভারতের বর্ষায় দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা দেখায়। তবে প্রতিটি এল নিনো বছরে একই পরিস্থিতি তৈরি হয় না।

২০২৬ সালেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার উপর এল নিনোর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভারতের বর্ষা এবং কৃষির উপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।

এর অর্থ এই নয় যে গোটা ভারতেই খরা হবে। বরং কোনও অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি, কোথাও আবার অস্বাভাবিক বৃষ্টি—দুই ধরনের পরিস্থিতিই তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রেও এল নিনোর প্রভাব নিয়ে আবহাওয়াবিদেরা নজর রাখছেন। এল নিনোর সময় উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অংশে শীতের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরণ বদলে যেতে পারে।

তবে ‘আমেরিকার ছয়টি রাজ্যে নিশ্চিতভাবে ভয়াবহ তুষারপাত হবে’—এমন নির্দিষ্ট দাবি বর্তমান NOAA-র তথ্য থেকে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এল নিনো আঞ্চলিক আবহাওয়ার সম্ভাবনা বদলায়, কিন্তু নির্দিষ্ট রাজ্যে কতটা তুষার পড়বে, তা আরও স্থানীয় পূর্বাভাসের উপর নির্ভর করে।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে। এল নিনো এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে এই ধরনের অস্বাভাবিক তাপমাত্রার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এবারের পরিস্থিতিকে বোঝার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন।

পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র এমন একটি উষ্ণ পৃথিবীর মধ্যে কাজ করছে, যেখানে চরম তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার ঝুঁকি আগে থেকেই বেড়েছে।

ফলে একটি শক্তিশালী এল নিনো যখন আসে, তখন তার প্রভাব উষ্ণ পৃথিবীর সঙ্গে মিলে কিছু অঞ্চলে চরম পরিস্থিতি আরও তীব্র করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোও এই বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটাই। উত্তর গোলার্ধে শীত এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। NOAA বলছে, ২০২৬ সালের শরৎ ও শীতে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি।

তবে এর মানে এই নয় যে পৃথিবীর সর্বত্র শীত অস্বাভাবিক উষ্ণ হবে বা সব জায়গায় একই ধরনের আবহাওয়া তৈরি হবে। এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে অনেকটাই আলাদা।

কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে, কোথাও আবার প্রবল বৃষ্টি। কোথাও তাপমাত্রা বাড়তে পারে, আবার কোথাও শীতের ঝড় বা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

এই কারণেই আগামী কয়েক মাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে বিশেষ নজর রাখছেন বিজ্ঞানীরা। সেপ্টেম্বরের তথ্য বলছে এল নিনো এখন শক্তিশালী হচ্ছে এবং বছরের শেষ দিকে আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকৃতির এই বিশাল জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—২০২৬-২৭ সালের এল নিনো ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীদের বিশেষ নজরে রয়েছে। সামনে নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই সময়েই বোঝা যাবে প্রশান্ত মহাসাগরের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার উপর কতটা বড় ছাপ ফেলতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ