সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeএক্সক্লুসিভ৬৩ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ থেকে রেডিও সিগনাল, এলিয়েনের বার্তা নাকি প্রাকৃতিক ঘটনা?

৬৩ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ থেকে রেডিও সিগনাল, এলিয়েনের বার্তা নাকি প্রাকৃতিক ঘটনা?

বেটা পিকটোরিস বি একটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ। আকারের দিক থেকে এটি বৃহস্পতির থেকেও অনেক বড়। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রহটি তার নক্ষত্র বেটা পিকটোরিসকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ভিনগ্রহী বা এলিয়েন নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। মহাকাশের কোথাও পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে। এবার সৌরমণ্ডলের বাইরের একটি গ্রহ থেকে শনাক্ত হয়েছে রেডিও সিগনাল। আর সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনা—তবে কি ভিনগ্রহের কোনও প্রাণী পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে?

তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এই রেডিও সিগনাল কোনও এলিয়েন সভ্যতা পাঠিয়েছে। বরং এর পিছনে রয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি মহাজাগতিক প্রক্রিয়া।

যে গ্রহটি থেকে রেডিও সিগনাল শনাক্ত হয়েছে, তার নাম বেটা পিকটোরিস বি (Beta Pictoris b)। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ, সেখান থেকে আলো বা কোনও রেডিও তরঙ্গ পৃথিবীতে পৌঁছাতেই প্রায় ৬৩ বছর সময় লাগে।

বেটা পিকটোরিস বি একটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ। আকারের দিক থেকে এটি বৃহস্পতির থেকেও অনেক বড়। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রহটি তার নক্ষত্র বেটা পিকটোরিসকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে।

এই গ্রহটি বিজ্ঞানীদের কাছে অবশ্য নতুন নয়। বহু বছর আগেই বেটা পিকটোরিস বি সম্পর্কে জানা গিয়েছিল। কিন্তু এর থেকে আসা ক্ষীণ রেডিও বিকিরণ নিয়ে এত দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট ছিল না।

মহাকাশে কোনও নির্দিষ্ট উৎস থেকে আসা অত্যন্ত দুর্বল রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করা সহজ নয়। বিশেষ করে কোনও গ্রহ এবং তার নক্ষত্র পাশাপাশি থাকলে কোন উৎস থেকে সেই সিগনাল আসছে, তা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানীরা এর আগে বেটা পিকটোরিস সিস্টেম থেকে রেডিও বিকিরণের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিকিরণ সরাসরি গ্রহটির থেকেই আসছে, নাকি তার নক্ষত্র থেকে উৎপন্ন হচ্ছে—তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছিল না।

এই রহস্যের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার MeerKAT রেডিও টেলিস্কোপ। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই রেডিও টেলিস্কোপের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা সিগনালের উৎস আরও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ পান।

পর্যবেক্ষণের পর গবেষকদের কাছে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হয়—রেডিও বিকিরণের উৎস বেটা পিকটোরিস বি গ্রহটিই।

সৌরমণ্ডলের গ্রহগুলির মধ্যে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের মতো গ্যাসীয় গ্রহ থেকে রেডিও বিকিরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আগেই জানেন। কিন্তু সৌরমণ্ডলের বাইরে থাকা একটি গ্রহ থেকে রেডিও নির্গমন শনাক্ত করা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।

কারণ এর মাধ্যমে দূরবর্তী গ্রহগুলির চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

একটি গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র তার চারপাশের মহাকাশীয় পরিবেশের সঙ্গে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে, সেটিও রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে বোঝার সুযোগ রয়েছে। ফলে বেটা পিকটোরিস বি থেকে পাওয়া এই সিগনাল শুধুমাত্র একটি বিচিত্র মহাজাগতিক ঘটনা নয়, গ্রহটির প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

এই প্রশ্নটাই স্বাভাবিকভাবে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করেছে। কারণ রেডিও সিগনাল মানেই কি কোনও বুদ্ধিমান প্রাণীর পাঠানো বার্তা?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন কোনও প্রমাণ এখনও নেই।

রেডিও তরঙ্গ মহাবিশ্বে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণেই তৈরি হতে পারে। কোনও গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র, তার নক্ষত্র থেকে আসা কণার প্রবাহ এবং গ্রহের বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সেই কণার মিথস্ক্রিয়ার ফলে রেডিও বিকিরণ তৈরি হতে পারে।

বেটা পিকটোরিস বি-এর ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা এমনই একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার কথা বলছেন।

পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে আমরা যে অরোরা বা মেরুজ্যোতি দেখতে পাই, তার সঙ্গে বেটা পিকটোরিস বি-এর রেডিও নির্গমনের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

পৃথিবীতে সূর্য থেকে আসা চার্জযুক্ত কণা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলে বায়ুমণ্ডলের কণাগুলি শক্তি পায়। সেই শক্তি আলো হিসেবে বেরিয়ে আসে। তখন আকাশে তৈরি হয় অপূর্ব মেরুজ্যোতি।

একই ধরনের প্রক্রিয়া অন্য গ্রহেও ঘটতে পারে। কোনও গ্রহের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র থাকলে তার নক্ষত্র থেকে আসা চার্জযুক্ত কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে রেডিও তরঙ্গও উৎপন্ন হতে পারে।

বেটা পিকটোরিস বি থেকে শনাক্ত হওয়া রেডিও সিগনালের ক্ষেত্রেও এমন একটি প্রক্রিয়াই কাজ করছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

একেবারেই নয়। বরং এই ধরনের আবিষ্কার পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধানের গবেষণাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

তবে কোনও গ্রহ থেকে প্রাকৃতিক রেডিও সিগনাল পাওয়া এবং কোনও বুদ্ধিমান সভ্যতার পাঠানো বার্তা পাওয়া—এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। বিজ্ঞানীরা যখন ভিনগ্রহী সভ্যতার সম্ভাব্য সংকেত খোঁজেন, তখন সাধারণত এমন সিগনাল খোঁজা হয় যার মধ্যে অস্বাভাবিক বা কৃত্রিম কোনও বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

বেটা পিকটোরিস বি-এর ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত সেই ধরনের কৃত্রিম সংকেতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, এই আবিষ্কারকে ‘এলিয়েনের সঙ্গে যোগাযোগ’ হিসেবে দেখার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দূরবর্তী এক্সোপ্ল্যানেটের চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মহাকাশীয় পরিবেশ সম্পর্কে গবেষণার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।

বেটা পিকটোরিস বি আমাদের সৌরমণ্ডল থেকে বহু দূরে। এত দূরের একটি গ্রহের চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া বিজ্ঞানীদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এই ধরনের গ্রহ থেকে আসা সংকেত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন, অন্য নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্রহগুলির চৌম্বক ক্ষেত্র কতটা শক্তিশালী। সেই তথ্য আবার গ্রহটির অভ্যন্তরীণ গঠন, বায়ুমণ্ডল এবং তার নক্ষত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই গবেষণা দেখিয়ে দিচ্ছে যে মহাকাশের বহু দূরে থাকা ছোট বা মাঝারি আকারের গ্রহ সম্পর্কেও পৃথিবী থেকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ ক্রমশ বাড়ছে।

তাই বেটা পিকটোরিস বি থেকে পাওয়া রেডিও সিগনালকে এলিয়েনের বার্তা হিসেবে দেখার আগে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যাই গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত সেই ব্যাখ্যা বলছে, এটি কোনও ভিনগ্রহী সভ্যতার পাঠানো বার্তা নয়; বরং একটি প্রাকৃতিক মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার ফল।

তবুও প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে—পৃথিবীর বাইরে সত্যিই কি প্রাণ আছে? সেই উত্তর এখনও অজানা। আর সেই উত্তর খুঁজতেই মহাকাশের আরও গভীরে নজর রাখছেন বিজ্ঞানীরা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ