এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : সেপ্টেম্বর প্রায় শেষ। বর্ষাও ধীরে ধীরে বিদায়ের পথে। শরতের হালকা আমেজ অনুভূত হওয়ার কথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কোথাও কোথাও ইতিমধ্যেই বর্ষার দাপট কমে শুকনো আবহাওয়া বাড়ছে। এমন সময়ে ভারতের একটি পরিচিত শহরে পারদ উঠে গেল ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। মরুভূমির প্রখর গরমে যেন ফের গ্রীষ্মের চেহারা নিয়েছে শহর।
শহরটির নাম জয়সলমীর। রাজস্থানের এই শহর এমনিতেই প্রচণ্ড গরমের জন্য পরিচিত। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষদিকে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রির গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে নজর কেড়েছে।
এপ্রিল বা মে মাসে জয়সলমীরে ৪১ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা খুব একটা অস্বাভাবিক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ প্রান্তে এসে এমন তাপমাত্রা নিঃসন্দেহে আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে উত্তর গোলার্ধে ঋতু পরিবর্তনের সময় শুরু হয়। গ্রীষ্ম ধীরে ধীরে বিদায় নেয়, শরৎ আসে। দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে সূর্যের আপাত অবস্থান সরে যাওয়ার সঙ্গে উত্তর গোলার্ধে সূর্যরশ্মির তীব্রতাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
এই সময়ে ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে বর্ষার প্রভাবও ক্রমশ কমে আসার কথা। আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করলে রাতের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে পারে। কিন্তু তার বদলে যদি কোনও অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সেটি আবহবিদদের নজরে পড়ে।
জয়সলমীরের ক্ষেত্রেও সেই কারণেই সেপ্টেম্বরের শেষের এই তাপমাত্রা বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
ভারতে বর্ষা বিদায়ের প্রক্রিয়া সাধারণত ধাপে ধাপে এগোয়। একটি নির্দিষ্ট দিনে দেশের সব জায়গা থেকে বর্ষা সরে যায় না। রাজস্থানসহ উত্তর-পশ্চিম ভারতের কিছু অংশ থেকে বর্ষা প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে দেশের অন্য এলাকাতেও তার প্রভাব কমে।
ফলে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যখন বর্ষা এখনও দেশের বিভিন্ন অংশে সক্রিয়, তখন রাজস্থানের জয়সলমীরে ৪১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা ওঠা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
কারণ বর্ষার আর্দ্রতা ও মেঘের প্রভাব অনেক সময় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। সেই প্রভাব কমে গেলে এবং আকাশ পরিষ্কার থাকলে দিনের বেলায় মাটির তাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
জয়সলমীরের ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মরু অঞ্চলের শহর হওয়ায় সেখানে দিনের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শেষদিকে অস্বাভাবিক উষ্ণতার খবর শুধু রাজস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মেঘালয়, বিহার, সিকিম, কর্ণাটকের কিছু অংশ, মারাঠওয়াড়া এবং বিদর্ভ।
বর্ষার শেষপর্বে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আবহাওয়ার চরিত্রে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যায়। কোথাও বৃষ্টি কমে যায়, কোথাও আবার স্থানীয়ভাবে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি হয়। এর মধ্যেই কিছু অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হয়ে উঠছে।
ফলে একদিকে দেশের কোথাও বর্ষার বৃষ্টি চলছে, অন্যদিকে অন্য অঞ্চলে মানুষ গরমে হাঁসফাঁস করছেন। এই বৈপরীত্যই সেপ্টেম্বরের শেষের আবহাওয়াকে আরও নজরকাড়া করে তুলেছে।
জয়সলমীরে ৪১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বর্ষা পুরোপুরি বিদায় নেওয়ার পর পরিস্থিতি কি আরও গরম হতে পারে?
এর উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। কোনও একটি দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দিয়ে পুরো শীতকাল বা আগামী কয়েক মাসের আবহাওয়া নির্ধারণ করা যায় না। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে একাধিক বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুচাপের বিন্যাস, পশ্চিমী ঝঞ্ঝা, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো-লা নিনা পরিস্থিতি।
চলতি বছর এল নিনোর প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মহলে বিশেষ নজর রয়েছে। এল নিনো সাধারণত বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে ভারতের কোনও নির্দিষ্ট শহরে কতটা গরম পড়বে, তা শুধুমাত্র এল নিনোর ওপর নির্ভর করে না।
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার একটি অস্বাভাবিক উষ্ণ পর্যায়। এর প্রভাব সরাসরি শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে এল নিনোর সঙ্গে বর্ষার দুর্বলতা এবং বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক তাপমাত্রার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। তবে প্রতিটি এল নিনো পর্বের প্রভাব একই রকম হয় না।
তাই এবারের এল নিনোর কারণে গোটা শীতকাল জুড়ে ভারতজুড়ে অস্বাভাবিক গরম থাকবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা ঠিক হবে না।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ৪১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা দেখে অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে, তাহলে কি শীত এবার দেরিতে আসবে?
এই মুহূর্তে এমন কোনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই। শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে একাধিক বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির ওপর। শরতের শেষে এবং শীতের শুরুতে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার গতিবিধি এবং আকাশের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে যদি শরৎকালের শেষপর্বেও দেশের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা বজায় থাকে, তাহলে শীতের আগমন এবং তার প্রকৃতি নিয়ে আবহবিদদের নজর আরও বাড়বে।
একটি দিনের ৪১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রাকে কেন্দ্র করে আগামী কয়েক মাসের আবহাওয়ার চূড়ান্ত ছবি আঁকা ঠিক নয়। তবে সেপ্টেম্বরের শেষদিকে এমন উচ্চ তাপমাত্রা অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য আবহাওয়াগত ঘটনা।
বিশেষ করে যখন দেশের কিছু অংশে বর্ষার প্রভাব এখনও রয়েছে এবং উত্তর ভারতের আবহাওয়ায় ধীরে ধীরে শুষ্কতার প্রভাব বাড়ার কথা, তখন এই ধরনের উষ্ণতা নজর কাড়ে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে তাপমাত্রার প্রবণতা কোন দিকে যায়, বর্ষা কত দ্রুত সম্পূর্ণ বিদায় নেয় এবং প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো পরিস্থিতি কীভাবে বদলায়—সেদিকেই নজর থাকবে।
অর্থাৎ, জয়সলমীরে সেপ্টেম্বরের শেষে ৪১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা একটি বড়সড় আবহাওয়ার নজির হলেও, এটিকে সরাসরি ‘আগামী শীতজুড়ে তীব্র গরমের পূর্বাভাস’ বলা যাবে না। তবে শরৎ শুরুর এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা আবহাওয়ার বদলে যাওয়া ছবির দিকে অবশ্যই নজর ফেরাচ্ছে।
সামনের কয়েক সপ্তাহেই বোঝা যাবে, এই উষ্ণতা সাময়িক একটি ব্যতিক্রম, নাকি ভারতের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শরৎকালেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।



