রুপক মূখার্জী, এনবি সংবাদ, কোলকাতা থেকে : সাইকেল মানেই সাধারণত লোহা, অ্যালুমিনিয়াম কিংবা অন্য কোনো ধাতুর তৈরি কাঠামো। কিন্তু সেই পরিচিত ধারণাতেই এবার নতুনত্ব আনতে চলেছে ভারতের অসম। সেখানে বাঁশ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব সাইকেল। অভিনব এই উদ্যোগ সামনে আসার পর থেকেই তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ভারতের মতো দেশে সাইকেল শুধু শরীরচর্চার মাধ্যম নয়, লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। বিশেষ করে গ্রাম ও ছোট শহরগুলিতে স্কুল, বাজার কিংবা কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য এখনও বহু মানুষ সাইকেল ব্যবহার করেন। সেই সাইকেল তৈরিতে যদি স্থানীয় ও পুনর্নবীকরণযোগ্য উপাদান ব্যবহার করা যায়, তাহলে পরিবহণের পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অসমে সেই ভাবনা থেকেই বাঁশের সাইকেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অসমে বাঁশের প্রাচুর্য রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের বাঁশ সহজেই পাওয়া যায় এবং তার মধ্যে কিছু প্রজাতি যথেষ্ট শক্ত ও টেকসই। এতদিন বাঁশ দিয়ে ঘরবাড়ির বিভিন্ন সামগ্রী, আসবাব, হস্তশিল্পসহ নানা জিনিস তৈরি হলেও এবার সেটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে সাইকেলের কাঠামো তৈরিতে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নতুন ধরনের একটি সাইকেল তৈরি করা নয়। বাঁশের মতো স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব যান তৈরির সম্ভাবনাও দেখানো।
প্রচলিত সাইকেলের তুলনায় বাঁশের কাঠামো দেখতে যেমন আলাদা হবে, তেমনই এর উৎপাদন পদ্ধতিতেও স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাঁশকে পৃথিবীর দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদগুলোর অন্যতম হিসেবে ধরা হয়। অনেক প্রজাতির বাঁশ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বারবার উৎপাদন করা সম্ভব।
অসমে দীর্ঘদিন ধরেই বাঁশ স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ফলে সাইকেলের মতো একটি দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্য তৈরিতে বাঁশ ব্যবহার করলে স্থানীয় সম্পদের নতুন ব্যবহার তৈরি হতে পারে।
এর আরেকটি দিক হলো পরিবেশবান্ধব পরিবহণের ধারণা। সাইকেল নিজেই জ্বালানিবিহীন যান। তার সঙ্গে যদি কাঠামো তৈরিতেও তুলনামূলকভাবে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা যায়, তাহলে পুরো উদ্যোগটি সবুজ পরিবহণের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে বাঁশের সাইকেলকে পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন, রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ, রং, ধাতব যন্ত্রাংশ, পরিবহণ এবং ব্যবহারের পর পুনর্ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোর ওপরও।
সাধারণ সাইকেলের ফ্রেম সাধারণত ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম বা অন্য ধাতু দিয়ে তৈরি হয়। বাঁশের সাইকেলের ক্ষেত্রে মূল কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বাঁশ ব্যবহার করা হয়।
বাঁশের প্রাকৃতিক তন্তু ও গঠন তাকে নির্দিষ্ট মাত্রায় শক্তি দিতে পারে। তবে সাইকেলের ক্ষেত্রে শুধু বাঁশ ব্যবহার করলেই হবে না। ফ্রেমের নকশা, বাঁশের মান, জোড়ার পদ্ধতি এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাইকেল চালানোর সময় ফ্রেমকে ওজন বহন করতে হয়। রাস্তার গর্ত, বাঁক, ব্রেক করা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের চাপও সামলাতে হয়। তাই বাঁশের সাইকেল সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করতে হলে যথাযথ প্রযুক্তিগত পরীক্ষা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২ অক্টোবর গুয়াহাটির ব্রহ্মপুত্র রিভারফ্রন্টে এই বাঁশের সাইকেল জনসমক্ষে প্রদর্শনের কথা রয়েছে।
এই প্রদর্শনীতে সাধারণ মানুষ নতুন ধরনের এই সাইকেল দেখার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে বাঁশকে কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে নতুন পণ্য তৈরি করা যায়, তারও একটি উদাহরণ সামনে আসবে।
বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব যানবাহন নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা বাড়ছে, তখন এমন উদ্যোগের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বর্তমান সময়ে শহরগুলিতে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পেট্রল ও ডিজেলচালিত যান থেকে নির্গত দূষণ পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করে। সেই জায়গায় সাইকেলকে পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
সাইকেলের কোনো জ্বালানি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকালে সরাসরি ধোঁয়া বা কার্বন নির্গমনের প্রশ্ন থাকে না।
এর সঙ্গে যদি স্থানীয়ভাবে পাওয়া বাঁশের মতো উপাদান ব্যবহার করা যায়, তাহলে সাইকেল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের পরিবেশবান্ধব মডেল তৈরি হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা বুঝতে হলে সাইকেলটির উৎপাদনব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ কবে থেকে এই বাঁশের সাইকেল কিনতে পারবেন?
প্রাথমিক উদ্যোগের কথা জানা গেলেও বাণিজ্যিকভাবে কবে থেকে সাইকেল উৎপাদন শুরু হবে, কোথায় তা তৈরি করা হবে কিংবা বছরে কতগুলি সাইকেল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে—এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য পরিষ্কার নয়।
একইভাবে সাইকেলের সম্ভাব্য দাম কত হতে পারে, তা-ও জানা যায়নি।
ফলে আপাতত এটিকে একটি নতুন উদ্যোগ ও প্রদর্শনী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে গেলে তবেই বোঝা যাবে সাধারণ মানুষের কাছে কতটা সহজে পৌঁছতে পারে।
বাঁশের সাইকেল জনপ্রিয় হলে এর সঙ্গে যুক্ত আরও কিছু ক্ষেত্রের বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাঁশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, ফ্রেম তৈরি, জোড়া লাগানো, পালিশ, রং এবং অন্যান্য অংশ সংযোজন—প্রতিটি ধাপে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে বাঁশ উৎপাদনকারী এলাকার ছোট উদ্যোক্তা ও কারিগররা যদি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সেজন্য প্রয়োজন হবে প্রশিক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারের স্থায়ী চাহিদা।
ভারতে এখনও বিপুল মানুষ সাইকেল ব্যবহার করেন। শহরে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াত থেকে গ্রামে দৈনন্দিন কাজ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাইকেলের ব্যবহার রয়েছে।
তাই বাঁশের সাইকেল যদি নিরাপদ, টেকসই এবং সাশ্রয়ী হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর বাজার তৈরির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে নতুন কোনো যান বাজারে সফল হতে হলে শুধু পরিবেশবান্ধব হওয়াই যথেষ্ট নয়। তার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে হতে হবে, দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যেতে হবে এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধাও থাকতে হবে।
অসমের বাঁশের সাইকেল আপাতত একটি অভিনব উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। আগামী দিনে এটি বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে একাধিক বিষয়ের ওপর।
সাইকেলটি কতটা নিরাপদ, কত বছর টিকে থাকবে, এর দাম কত হবে এবং সাধারণ মানুষ এটি কেনার সুযোগ পাবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে মিলবে।
তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির চিন্তা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
অসমের বাঁশের সাইকেল সেই সম্ভাবনারই একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। পরীক্ষামূলক বা প্রদর্শনী পর্যায় পেরিয়ে এটি যদি একদিন সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বাজারে আসে, তাহলে ভারতের সবুজ পরিবহণ ব্যবস্থায় এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।



