এনবি সংবাদ, অনলাইন : বাইবেলে বর্ণিত নোহর নৌকার কাহিনি পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত প্রাচীন ধর্মীয় আখ্যান। ভয়াবহ বন্যায় যখন পৃথিবীর বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে গিয়েছিল বলে সেই কাহিনিতে বর্ণনা রয়েছে, তখন নোহ নৌকা তৈরি করে জীবজগতের বিভিন্ন প্রাণীকে রক্ষা করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। বহু শতাব্দী ধরে সেই নৌকার কথিত অবস্থান নিয়েও নানা দাবি সামনে এসেছে।
তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি পাহাড়কে ঘিরে নোহর নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। সেই কথিত স্থান থেকে খুব দূরে নয়, এবার একটি প্রাচীন হ্রদের তলায় পাওয়া গিয়েছে রহস্যময় এক স্থাপনার সন্ধান। প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রাথমিক ধারণা, এর বয়স প্রায় **১১ হাজার ৭০০ বছর**।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে জলের প্রায় ৭৫ ফুট নিচে একটি গোলাকার নির্মাণের সন্ধান পাওয়া গেছে। ইট বা পাথরের তৈরি এই কাঠামোটি একাধিক স্তরে গঠিত। বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে এর অস্বাভাবিক গোলাকার নকশা এবং নির্মাণের ধরন।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, কাঠামোটির দেওয়াল তিনটি ধাপে তৈরি হয়েছিল। এত প্রাচীন সময়ের একটি স্থাপনা এত পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হওয়ায় গবেষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে এটিকে সরাসরি একটি সম্পূর্ণ প্রাচীন শহর হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, জলের নিচে পাওয়া এই কাঠামোটি হয়তো বৃহত্তর কোনও বসতির অংশ হতে পারে।
জলের নিচে পাওয়া একটি মাত্র কাঠামো থেকেই যে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ শহর ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে নির্মাণের আকার, বিন্যাস এবং বয়স গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
যদি আশপাশের এলাকায় একই সময়ের আরও স্থাপনা, রাস্তা, বসতবাড়ি বা মানুষের ব্যবহৃত সামগ্রীর সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে ওই অঞ্চলে প্রাচীন বসতির অস্তিত্ব সম্পর্কে আরও শক্তিশালী ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এ ধরনের আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রায় ১১,৭০০ বছর আগের সময়টি মানবসভ্যতার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। তখন মানুষ ধীরে ধীরে শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি স্থায়ী বসতি এবং কৃষিনির্ভর জীবনযাপনের দিকে এগোচ্ছিল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি হল, এত পুরনো একটি নির্মাণ কীভাবে হ্রদের জলের নিচে চলে গেল?
এর সম্ভাব্য কারণ জানতে ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে জলস্তরের পরিবর্তন, ভূমিকম্প, ভূমির উচ্চতার পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশের রূপান্তরের মতো বিভিন্ন কারণ কোনও প্রাচীন বসতিকে ধীরে ধীরে জলের নিচে নিয়ে যেতে পারে।
হ্রদের বর্তমান জলস্তর যদি অতীতে অনেক কম হয়ে থাকে, তাহলে সেই সময় এলাকাটি স্থলভাগের অংশ ছিল কি না, সেটিও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে প্রাচীন মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
নোহর নৌকার কথিত অবস্থান এবং জলের নিচে পাওয়া প্রাচীন স্থাপনার মধ্যে সরাসরি কোনও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন প্রমাণ এখনও নেই।
নোহর নৌকার কাহিনি মূলত ধর্মীয় গ্রন্থ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তুরস্কের একটি নির্দিষ্ট পাহাড়কে নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে অনেকে মনে করলেও, আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে নোহর নৌকা হিসেবে কোনও নির্দিষ্ট কাঠামোকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা হয়নি।
তাই নতুন আবিষ্কারকে নোহর নৌকার প্রমাণ হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। হ্রদের নিচে পাওয়া কাঠামোটির বয়স এবং অবস্থান আকর্ষণীয় হলেও, এর সঙ্গে বাইবেলের বন্যা বা নোহর নৌকার সম্পর্ক প্রমাণ করতে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত নোহর নৌকার গল্প নয়, বরং এর সম্ভাব্য বয়স।
প্রায় ১১,৭০০ বছর আগে পৃথিবীর জলবায়ুতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছিল। শেষ বরফযুগের পর মানুষ নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে ধীরে ধীরে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠছিল এবং কৃষির প্রাথমিক বিকাশ ঘটছিল।
সেই সময় কোনও স্থানে পরিকল্পিতভাবে নির্মিত গোলাকার স্থাপনা থাকলে সেটি ওই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক সংগঠন, নির্মাণ প্রযুক্তি এবং পরিবেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
দেওয়াল তৈরির পদ্ধতি, ব্যবহৃত উপকরণ এবং কাঠামোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানতে পারবেন এটি কী কাজে ব্যবহৃত হত। এটি বসবাসের জায়গা, ধর্মীয় বা সামাজিক কোনও স্থাপনা, নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল—তা এখনও পরিষ্কার নয়।
জলের নিচে থাকা প্রত্নস্থল নিয়ে গবেষণা করা সহজ নয়। কারণ সরাসরি খননকাজ চালানো কঠিন এবং কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রথমে পুরো এলাকার মানচিত্র তৈরি করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহ করে বয়স ও উপাদান পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এই অনুসন্ধান থেকে যদি আরও কাঠামো, মাটির পাত্র, পাথরের সরঞ্জাম বা মানুষের বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়, তাহলে আবিষ্কারটির গুরুত্ব আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের জন্য তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জলের নিচে থাকা ওই গোলাকার নির্মাণটি আসলে কী এবং তার আশপাশে আরও কী ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে।
নোহর নৌকার সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ না থাকলেও প্রায় ১১,৭০০ বছরের পুরনো একটি সম্ভাব্য স্থাপনার সন্ধান নিঃসন্দেহে প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
একদিকে রয়েছে নোহর নৌকার বহু পুরনো কাহিনি, অন্যদিকে রয়েছে জলের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা এক রহস্যময় কাঠামো। এই দুইয়ের মধ্যে কোনও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
তবে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান আরও এগোলে হয়তো জানা যাবে, হাজার হাজার বছর আগে ওই এলাকায় কারা বসবাস করত, কীভাবে তারা ঘরবাড়ি বা স্থাপনা তৈরি করত এবং পরবর্তীকালে কীভাবে সেই বসতি জলের নিচে হারিয়ে গেল।
জলের ৭৫ ফুট নিচে লুকিয়ে থাকা এই প্রাচীন স্থাপনা তাই শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার নয়; এটি মানবসভ্যতার এক অজানা অধ্যায়ের দরজা খুলে দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।
—সংবাদ সংস্থার সাহায্য নিয়ে লেখা



