সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeআইন ও আদালতমহিলার উপর শুয়ে পড়লেই ধর্ষণের চেষ্টা নয়? তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাটনা হাই কোর্টের

মহিলার উপর শুয়ে পড়লেই ধর্ষণের চেষ্টা নয়? তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাটনা হাই কোর্টের

মামলার পর্যবেক্ষণে পাটনা হাই কোর্ট জানায়, অভিযুক্ত মহিলার উপর শুয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর মুখ চেপে ধরেছিলেন—এই অভিযোগগুলি গুরুতর। কিন্তু শুধু এই আচরণগুলিই ধর্ষণের চেষ্টা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

ধর্ষণের চেষ্টা সংক্রান্ত একটি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল পাটনা হাই কোর্ট। আদালতের বক্তব্য, কোনও মহিলার উপর শুয়ে পড়া কিংবা তাঁর মুখ চেপে ধরা—এই আচরণগুলি আপত্তিকর ও অপরাধমূলক হলেও, শুধু এগুলির ভিত্তিতে ধর্ষণের চেষ্টা প্রমাণিত হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে ঘটনার অন্যান্য পরিস্থিতি এবং প্রাসঙ্গিক প্রমাণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

২০১০ সালের একটি পুরনো ঘটনার প্রেক্ষিতে এই পর্যবেক্ষণ করেছে আদালত। ওই মামলায় নিম্ন আদালত অভিযুক্তকে ধর্ষণের চেষ্টার দায়ে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। সেই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করেন অভিযুক্ত। মামলাটি পর্যালোচনা করে পাটনা হাই কোর্ট তাঁর সাজা কমিয়ে দেন। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ঘিরে ধর্ষণের চেষ্টা এবং অন্যান্য যৌন অপরাধের মধ্যে আইনি পার্থক্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা নাগাদ নিজের বাড়িতে ঘুমোচ্ছিলেন এক বিধবা মহিলা। অভিযোগ, সেই সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে ঢুকে ঘরের আলো নিভিয়ে দেন। এরপর মহিলার উপর চড়াও হয়ে তাঁর গায়ের উপর শুয়ে পড়েন এবং মুখ চেপে ধরার চেষ্টা করেন।

তবে মুখ চেপে ধরার আগেই মহিলা চিৎকার করে ওঠেন। তাঁর চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং তাঁকে উদ্ধার করেন। এরপর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ দায়ের করেন ওই মহিলা।

মামলাটি আদালতে ওঠার পর অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া চলে। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই নিম্ন আদালত অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে। ধর্ষণের চেষ্টার অপরাধে তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি, অন্যের বাড়িতে বেআইনিভাবে প্রবেশের অপরাধে ছ’মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

নিম্ন আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে সাজাকে চ্যালেঞ্জ করে পাটনা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন অভিযুক্ত। তাঁর দাবি ছিল, তিনি ধর্ষণের চেষ্টা করেননি। অভিযোগকারিণীর বয়ান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাশাপাশি, ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই বলেও দাবি করেন অভিযুক্ত।

এরপর মামলার নথি, অভিযোগের বিবরণ এবং উপলব্ধ প্রমাণ খতিয়ে দেখে উচ্চ আদালত। বিচারকদের সামনে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, অভিযুক্তের আচরণকে আইন অনুযায়ী ধর্ষণের চেষ্টা হিসেবে গণ্য করা যায় কি না।

আদালতকে বিবেচনা করতে হয়, ঘটনাটি ধর্ষণের চেষ্টার পর্যায়ে পড়ে, নাকি তা শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে আক্রমণ কিংবা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের মতো অন্য কোনও অপরাধের আওতায় আসে।

মামলার পর্যবেক্ষণে পাটনা হাই কোর্ট জানায়, অভিযুক্ত মহিলার উপর শুয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর মুখ চেপে ধরেছিলেন—এই অভিযোগগুলি গুরুতর। কিন্তু শুধু এই আচরণগুলিই ধর্ষণের চেষ্টা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত নিজের বা অভিযোগকারিণীর পোশাক খুলেছিলেন কিংবা যৌনসঙ্গমের চেষ্টা করেছিলেন, এমন কোনও প্রমাণ মামলায় পাওয়া যায়নি। সেই কারণে উপলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে এমন অর্থে দেখা ঠিক হবে না যে, কোনও মহিলার উপর শারীরিকভাবে চড়াও হওয়া বা তাঁর মুখ চেপে ধরা অপরাধ নয়। বরং নির্দিষ্ট মামলায় অভিযুক্তের উদ্দেশ্য, আচরণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধের প্রকৃতি নির্ধারণ করতে হয়। কোনও ঘটনা ধর্ষণের চেষ্টা হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট আইনের শর্ত এবং মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণের উপর।

মামলার নথি ও প্রমাণ পর্যালোচনার পর অভিযুক্তের সাজা কমিয়ে দেয় পাটনা হাই কোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জেলে ইতিমধ্যে যত দিন কাটিয়েছেন, সেই সময়কেই তাঁর সাজা হিসেবে গণ্য করা হবে।

অর্থাৎ, ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে নিম্ন আদালতের দেওয়া চার বছরের কারাদণ্ড আর বহাল থাকল না। তবে এই রায়কে সব ধরনের শারীরিক আক্রমণের ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। প্রতিটি মামলার ঘটনা, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতেই আদালত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

ধর্ষণের চেষ্টা এবং শ্লীলতাহানি বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের মতো অপরাধের মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে। কোনও ব্যক্তির আচরণ কতটা গুরুতর, তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং অপরাধ সংঘটনের দিকে তিনি কতটা এগিয়েছিলেন—এ ধরনের বিষয় মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কোনও অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আচরণ বিবেচনা না করে ঘটনার সামগ্রিক পরিস্থিতি, অভিযোগকারীর বক্তব্য, সাক্ষীদের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, কোনও শারীরিক আক্রমণকে গুরুত্বহীন বলে ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নির্ধারণ করাই বিচারপ্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য।

পাটনা হাই কোর্টের এই মামলাতেও মূল বিবেচ্য বিষয় ছিল, উপলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না। আদালতের পর্যবেক্ষণ সেই নির্দিষ্ট প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই।

সারকথা: ২০১০ সালের ঘটনার মামলায় ধর্ষণের চেষ্টা প্রমাণের জন্য উপলব্ধ প্রমাণ যথেষ্ট কি না, তা খতিয়ে দেখে অভিযুক্তের সাজা কমিয়েছে পাটনা হাই কোর্ট। মহিলার উপর শুয়ে পড়া বা মুখ চেপে ধরার মতো আচরণ গুরুতর হলেও, সেগুলির ভিত্তিতে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করতে মামলার সামগ্রিক পরিস্থিতি ও আইনি শর্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে আদালত।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ